যে কথা হয়নি বলা

আপডেট: জানুয়ারি ৩০, ২০২০, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
এক দিনের কথা বঙ্গবন্ধু সকালে নাস্তার টেবিলে বসে আছেন সালাম সাহেব তখনও নাস্তার টেবিলে আসেননি। সালাম সাহেব নাস্তার টেবিলে বসার পর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আপনি নাস্তা খাচ্ছেন না কেন?’ ‘নাস্তা খাব না’Ñ বঙ্গবন্ধু উত্তর দিলেন। সালাম সাহেবের প্রশ্ন, ‘কেন খাবেন না?’ আপনাকে আমাদের পার্টিতে যোগদান করতে হবে’Ñবঙ্গবন্ধুর অনুরোধ। জবাবে সালাম সাহেব বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমি আপনার দলকে আপনার নীতিকে, আপনার আদর্শকে, সর্বোপরি আপনাকে পছন্দ করি, শ্রদ্ধা করি, এবং ভালবাসি। কাজেই দলে কোন পদ দখল না করেও আপনাকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে যাব আমৃত্যু।’ এরপর বঙ্গবন্ধু আর জোরাজোরি করেন নি এবং সালাম সাহেব তার অঙ্গীকার রক্ষা করেছিলেন এবং তার কথার কোনো বরখেলাপ করেন নি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত সমর্থনই কি তাঁর জীবনের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল? ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সেই কাল রাত্রে সালাম সাহেবের দুই ছেলে, ছোট ভাই, বোনের স্বামী ও ভাগনি জামাইকে হানাদার বাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাগনি জামাই ছিলেন এমএনএ শহীদ নজমুল হক সরকার। ১৯৭২ সালে মার্চ মাসে প্রথম দিকে বঙ্গবন্ধু রাজশাহীতে পদার্পণ করেন এবং সালাম সাহেবের খোঁজ খবর নিলেন। সালাম সাহেবের পরিবারের সদস্যদের শহিদ হওয়ার কথা তিনি পূর্বেই শুনেছিলেন। তাঁর স্ত্রীকে সান্ত¦না দেয়ার জন্য তিনি সালাম ভাইয়ের বাসাতেও গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু সালাম ভাইকে আবারও অনুরোধ করলেন, আওয়ামী লীগে যোগদান করে সংসদ সদস্য হতে, এমনকি ক্যাবিনেটের সদস্য হতে। তিনি বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখান করেন এবং আবারও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আপনি আমার নেতা, আমাদের নেতা, বাংলাদেশের নেতা, এটা আমাদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। আমি বিনিময়ে কিছুই চাই না। আমি চাই আপনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুন এবং এদেশের কাণ্ডারি হয়ে, দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান।’ অ্যাডভোকেট সালামের এই যে ত্যাগ, যার বিনিময়ে আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করেছি, তা কি কোনোদিন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবে?
যা হোক, ঢাকা পৌঁছে বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজ বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন। প্রেসিডেন্ট হলেন, প্রধানমন্ত্রী হলেন কিন্তু তাঁর প্রাণপ্রিয় বাসাটি কোনোদিনই ছাড়তে পারেন নি। বিশেষ করে বেগম মুজিব বহু কষ্ট করে নিজ দায়িত্বে এই বাড়িটি তৈরি করিয়েছিলেন। সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে, যখন দেখি জাতির জনকের একটি মাত্র বাড়ি। অথচ ইচ্ছে করলে তিনি ঢাকার অসংখ্য পরিত্যক্ত বাড়ির একাধিক বাড়ি নিতে পারতেন এবং কিনতেও পারতেন। কিন্তু না তিনি কোনো কিছুই নেননি। তিনি বলতেন, বাড়ি পরিত্যক্ত হোক আর যাই হোক, এ সবই তো জনগণের সম্পদ। এগুলোতে ভাগ বসানোর আমার কোনো ক্ষমতা নেই, ইচ্ছেও নেই। তিনি ছিলেন, এরকমই খাঁটি মানুষ, সৎ, চরিত্রবান ও আদর্শবাদী। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, আহম কামারুজ্জামান, এরা প্রত্যেকেই ছিলেন খাঁটি সোনা ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ। তাজউদ্দিন ভাই ছিলেন, আমার হলমেট। ফলে খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখার আমার সুযোগ হয়েছে। অন্যদিকে অগ্রজ প্রতিম কামারুজ্জামান আমার একই জেলার মানুষ। তিনিও প্রথম দিকে ধানমন্ডির ৩ নম্বর রোডের একটি বাড়িতে ছিলেন। আমি সেই বাড়িতে গেছি। তাঁকে বলা হয়েছিল, ‘স্যার, আপনি এই বাড়িটা রেখে দিতে পারেন কিংবা কিনেও নিতে পারেন।’ তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘অন্য কারও দীর্ঘশ্বাসের বাড়ি আমি নিতে চাই না। এসবই জনগণের সম্পত্তি ও এগুলোতে হাত দেয়ার আমাদের কোনো অধিকার নেই।’ আমাদের এই জাতীয় নেতারা আমাদের কেবল দিয়েই গেছেন, এমন কী জীবন পর্যন্ত। বিনিময়ে কিছুই চাননি বা সুযোগ থাকলেও কিছু গ্রহণ করেন নি। তাঁরা ত্যাগের বিনিময়ে মহিমান্বিত।
ঢাকাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়িঘর কিছুই ছিলনা। একদিন তাঁর শুভাকাক্সক্ষী বিশিষ্ট সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞা বললেন, ‘মুজিবুর, তোমারতো ঢাকাতে কিছুই নেই, রাজনীতি করবা কিভাবে? ছেলেমেয়েদের আর কতদিন গ্রামে ফেলে রাখবে। ঢাকায় মাথা গোঁজার একটা জায়গা দরকার।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘মানিক ভাই, আমার ওসব চিন্তা করার কোনো সময় নেই। আপনি যা হয় করেন।’ শেখ রেহেনার একটি দৈনিকে প্রকাশিত ‘স্মৃতি কথা’ থেকে জানা যায়, মানিক মিঞা, বেগম মুজিবের সঙ্গে আলাপ করে তৎকালীন ডিআইটি (Dhaka Improvement Trust) এ একটি আবেদন দাখিল করেন। তার সঙ্গে টাকাও জমা দিতে হয়েছিল। মানিক মিঞা সব কিছু ম্যানেজ করেছিলেন। জায়গা একটা পাওয়া গেল, কিন্তু বাড়ি করার টাকা কোত্থেকে আসবে? যাক কোনো রকমে ধার দেনা করে বাড়ির কাজ আরম্ভ হলো। তবে শেষ করতে বেশ সময় লেগেছিল। বাড়ি নির্মাণের দেখা শোনার কাজ সব বেগম মুজিবই করেছিলেন। শেখ রেহেনা লিখেছেন, ‘মা বাড়ি নির্মাণের সময় নিজেও পরিশ্রম করেছেন। তিনি জানতেন দেয়ালে পানি দিলে সেটা শক্ত হয়। সন্ধ্যার সময় মিস্ত্রীরা চলে গেলে বেগম মুজিব নিজ হাতে দেয়ালে পানি দিতেন।’ অদ্ভুত এক নারী। বত্রিশ নম্বর এই বাড়িটা তাঁর এমনিই প্রিয় ছিল। এর প্রতিটি বালি-কণার সঙ্গে মিশে আছে মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন নেসার শ্বাস-প্রশ্বাস, চিন্তা-চেতনা। বেগম মুজিব একটি আদর্শ নারীর প্রতিকৃতি। তিনি ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত। পাকিস্তানের ২৩ বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু প্রায় এগারো বছরই ছিলেন জেল হাজতে। কখনও আত্মগোপনে, কখনও জামিনে, কখনও গ্রামে-গঞ্জে বা শহরে এইভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র। বেগম মুজিবই পাঁচ সন্তানের সংসার সামাল দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা তাঁর সান্নিধ্য খুব কমই পেয়েছেন। বেগম মুজিব এতো কিছু ত্যাগ স্বীকার না করলে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কোটি কোটি মানুষের মুক্তির জন্য, অন্যায় অবিচার থেকে অবহেলিত বঞ্চিত মানুষকে রক্ষা করার জন্য এতো সময় পেতেন কোথায়? বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূলমন্ত্র কৃষক শ্রমিকদের কল্যাণ এবং আজীবন তাদের সঙ্গে থাকা। বাকশাল করতে গিয়ে তিনি দারুণভাবে সমালোচিত হয়েছিলেন। কিন্তু বাকশাল এর মধ্যেও সেই কৃষক-শ্রমিক শব্দ দুটো ছিল। ‘বাকশাল’ অর্থই হচ্ছে, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। তিনি ভালোভাবেই জানতেন যে কোনো কৃষি প্রধান উন্নয়নশীল দেশে কৃষক শ্রমিকই সে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। এমন কী এখনও জননেত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ যে দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানেও কৃষক শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তার সঙ্গে রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি।
জননেত্রী শেখ হাসিনা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের এই ঐতিহাসিক বাড়িটা জাদুঘরে রূপান্তরিত করে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। যেহেতু এই বাড়িটা তাঁদের নিজস্ব সম্পদ কাজেই এখানে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না বা নাক গলাতে পারবে না। এই বাড়িটার প্রতিটি বালি কণার সঙ্গে মিসে আছে বঙ্গবন্ধু পরিবারের স্মৃতি, হাসি-কান্না, সুখ দুঃখের ইতিহাস, জীবন দর্শন ও মর্মবেদনা। এটি টিকে থাকবে যুগ যুগ ধরে অক্ষয়, অব্যয় ও চিরস্মরণীয় হয়ে।
পরিশেষে বলতে চাই, বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ। তিনি মুখে যা বলেন কাজও তাই করেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন, এর মধ্যে দু নম্বরী কিছু নেই। কোনো ভেজাল নেই, ধাপ্পাবাজি নেই, কোনো কূটচাল নেই, কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। যা কিছু করেছেন জনগণের মঙ্গলের জন্যই করেছেন। তিনি যে ত্যাগ করেছেন তা সম্পূর্ণই নিচতলার মানুষের জন্য। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন কিন্তু তিনি অতি সাধারণ জীবন যাপন করছেন। তাঁর জীবনে বিলাসিতার কোনো ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়নি। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী, স্নেহশীল পিতা, জনদরদি এবং মানবতাবাদী নেতা। বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে বলা যায়, ‘ÔAn example of perfect womanhood. তাঁর মধ্যে আদর্শ নারীত্বের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু এতো কিছু করেছেন তার মূলে রয়েছে বেগম মুজিবের সাহায্য সহযোগিতা, উৎসাহ, প্রেরণা ও ত্যাগ। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক নারীর কথা জানা যায়- যারা ছিলেন লোভী, স্বার্থপর। স্বামীর পদমর্যাদার সুযোগ নিয়ে অনেক সম্পদের অধিকারী হয়েছেন। অনেক নারী আবার নিজের পদের সুবিধার অপব্যবহার করেছেন, যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড। বেগম মুজিব ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী এক নারী। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেছেন, ‘তুমি যাও মানুষের মঙ্গলের জন্য সব কিছু করো। সংসার সামাল দেব আমি।’ কত উদার মনের নারী। বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনা দেশকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সোনার মানুষ কোথায়? সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষের কোনো বিকল্প নেই। আমরা চাই দুর্নীতিমুক্ত, দারিদ্রমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক এক বাংলাদেশ, যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকলেই সমান অধিকার নিয়ে সুখে শান্তিতে বাস করতে পারবে।
লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা