যে কথা হয়নি বলা

আপডেট: জানুয়ারি ২৭, ২০২০, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একজন ব্যক্তি, একটি প্রতিষ্ঠান এবং একটি মহীরুহ। একটি বটগাছের অসংখ্য শাখা-প্রশাখা থাকে, ডাল-পালা থাকে, আর থাকে গাছ ভর্তি পাতা। হাজার পাতার একটি পাতা সম্পর্কে লিখতে গেলে পাতার পাতা লিখেও শেষ করা যাবেনা। তাঁর জীবনের খুঁটিনাটি এমন সব ঘটনা ঘটেছে, যার আমি কিছুই জানিনা। আমার বয়স ৮৮ বছর হলেও আমি তাঁর জীবন সম্পর্কে হয়তোবা কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিশাল ক্ষেত্রের একশত ভাগের ১০ ভাগও হবেনা। তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থ থেকে যা জানতে পেরেছি তাতে মনে হয়েছে তাঁর জীবন একটি আইসবার্গ বা হিমশৈলের মতোÑ যার একভাগ থাকে পানির উপর যা দৃশ্যমান হয়, আর ১০ ভাগই থাকে পানির নিচে যা দৃশ্যমান হয়না। একেকটা আইসবার্গ বা বরফের যে পাহাড় আমরা দেখতে পাই তা মাত্র ১১ ভাগের একভাগ- বাকি ১০ ভাগই থাকে পানির নিচে। কাজেই একটি হিমশৈল যে কত বড় হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। এই হিমশৈলের আঘাত লেগে টাইটেনিক জাহাজ ভেঙ্গে খান খান হয়ে গিয়েছিলো। তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থটি পড়ে নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা অনুধাবন করতে পারছি। নানা দিক থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘটনাবহুল জীবনটায় একটা হিমশৈলের মতো বিরাট। তার কতটুকুইবা আমরা জানি। তাঁর সম্পর্কে আমাদের অনেক কিছু জানার বাকি রয়েছে। এর জন্য গবেষণার প্রয়োজন আছে।
তাঁকে নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। আমার অগ্রজ প্রতিম ড. মজহারুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশাতেই লিখে ফেললেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ শিরোনামে একটি বৃহদাকার বই। তাঁকে বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবুও আমার মনে হয়েছে, এখনও আরো কিছু লেখা অবশিষ্ট রয়েছে। আমি একজন বৃদ্ধ, তবে উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু এমন একজন ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আমার লেখার সাধ থাকলেও সাধ্য নেই। তবে তাঁর রচিত অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থটি আমার বালিশের নিচেই থাকে। সময় পেলেই পড়ি। এতো সহজ ভাষা ও খুঁটিনাটি তিনি লিখেছেন ভাবলে আশ্চর্য লাগে। কোথায় ছিলেন, কী করলেন, কার বাসায় খেলেন, কী করে গা ঢাকা দিয়ে গোয়েন্দাদের নজরদারির ভেতরও চলাফেরা করলেন, এসব পড়তে ও জানতে কার না ভালো লাগে। তিনি বেশ লম্বা, তবে গায়ে গতরে হাল্কা ছিলেন, ফলে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো, তা সে বন্ধুই হোক বা শত্রুই হোক। আমার ভালোলাগা অসংখ্য কবিতার মধ্যে একটি কবিতা আজো স্মরণে আছে ‘কাজে বড় যিনি’ ছোটতে খুব বেশি বেশি পড়তাম তার কয়েকটি চরণ এখানে উল্লিখিত হলো-
“ আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে,
মুখে হাসি বুকে বল তেজে ভরা মন
মানুষ হইতে হবে এই যার পণ।”
এই কবিতাটি মনে এলেই বঙ্গবন্ধুর কথা মনে পড়ে যায়। কাজের ছেলেই বটে। যা হোক, আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে তাঁর সম্পর্কে যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও ধারণা অর্জন করেছি তারই কিছুটা এখানে লেখার মাধ্যমে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি মাত্র।
১৯৪০ সালে লাহোর রেজুলিউশন পাশ হওয়ার পর শেখ মুজিব ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদান করেন। ১৯৪২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৩ সালে যোগদান করেন বেঙ্গল মুসলিম লীগে। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র-সংসদের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৪৭ সাল মুজিব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ইসলামিয়া কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। সেই সময় সায়েদুর রহমান সাহেব ছিলেন ইসলামিয়া কলেজের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক এবং বেকার হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট। এই হোস্টেলেই শেখ মুজিব থাকতেন। পরবর্তীকালে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান দীর্ঘদিন যাবত জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষের পদে নিয়োজিত ছিলেন। অধ্যক্ষ সায়েদুর রহমান শেখ মুজিব সম্পর্কে তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছিলেন ঢাকা থেকে প্রকাশিত “যায় যায় দিন” সাপ্তাহিক পত্রিকায়। সেখানে তিনি শতাব্দীর স্মৃতি শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে লিখতেন। আমি তার লেখাটা কোনোদিনই মিস করতাম না। সেটি পড়তে খুবই ভালো লাগতো। তিনি লিখতেন-
“শেখ মুজিব ছিলো অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন এবং অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে সে ছিল বরাবরই সোচ্চার। সে ছিলো অসাম্প্রদায়িক এবং অবিভক্ত বাংলার পক্ষে। ১৯৪৬ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরেও শেখ মুজিব কোনোদিনই হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর কোনো বিরূপ মনোভাব পোষণ করেনি। সে বলতো, যারা দাঙ্গা হাঙ্গামা করে, মানুষ হত্যা করে তারা অমানুষ। একটা উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী একাজ করেছে। তারা ক্ষমার অযোগ্য। সে ছিলো এমনি বুদ্ধিমান ও উদার মনের মানুষ। মুজিবের শরীর স্বাস্থ্য ভালো ছিলো, খেতেও পারতো। আমি তাকে বলতাম, ‘ডাল ভাত বেশি করে খাও, তরকারি বেশি দিতে পারবো না।” সে চলনে বলনে ছিলো বেশ স্মার্ট, হাঁটতো বুক ফুলিয়ে আর কথা বলতো ঠ্যাস ঠ্যাস করে। তার সঙ্গে কে কথা বলবে। যে ছিলো অসীম সাহসী। কোনদিন কোন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়নি।”
১৯৪০ এর দশকে ছিলো রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং ঘটনাবহুল। ১৯৪৩ সালে বাংলা নজিরবিহীন দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়। ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ঘটে, যার ফলে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে অকালে মৃত্যুবরণ করতে হয়। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগ অধিকাংশ আসনেই জয়লাভ করে যার ফলে পাকিস্তান দাবির পথ সুগম হয়। ভারত ভেঙ্গে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে, যদিও অবিভক্ত বাংলার পক্ষে যুক্তিতর্ক বেশ জোরালো ছিলো।
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রহিত হলেও এই বৃহত্তর বাংলার ধারণাটা বাংলার মানুষের অন্তর থেকে একেবারে মুছে যায়নি। ১৯৪৭ সালের র্ফেরুয়ারি মাসে হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎবসু ও কিরণ শংকর রায়ের নেতৃত্বে স্বাধীন ও বৃহত্তর বাংলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসাম নিয়ে একটি স্বাধীন বৃহত্তর বাংলা গঠিত হবে এবং সে দেশের জনগণই নির্বাচনের মাধ্যমে এর ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে যে, তারা ভারতের সঙ্গে যোগদান করবে, না পাকিস্তানের সঙ্গে, কিংবা স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে। সোহরাওয়ার্দী এই পরিকল্পনাটি জিন্নাহর কাছে এবং শরৎবসু মহাত্মা গান্ধীর কাছে পেশ করেন এবং এই পরিকল্পনা নাকি মি. গান্ধী ও জিন্নাহ উভয়ের কাছ থেকেই অনুমোদন পাওয়া যায়। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং বাংলার হিন্দু নেতাদের বিরোধিতার ফলে গান্ধীজি মত পরিবর্তন করেন। ফলে সবকিছুই ভেস্তে যায়। এই বৃহত্তর বাংলা গঠন সম্পর্কে শেখ মুজব তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেনÑ
“ব্রিটিশ সরকার বলে দিয়েছে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একমত না হলে তারা নতুন কোন ফর্মুলা মানতে পারবেন না। শরৎবাবু কংগ্রেসের নেতাদের সাথে দেখা করতে যেয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছিলেন। কারণ সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল তাঁকে বলেছিলেন, “শরৎবাবু পাগলামি ছাড়েন, কলকাতা আমাদের চাই।” মহাত্মা গান্ধী ও পণ্ডিত নেহেরু কোন কিছুই না বলে শরৎবাবুকে সরদার প্যাটেলের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আর মি. প্যাটেল শরৎবাবুকে খুব কঠিন কথা বলে বিদায় দিয়েছিলেন। কলকাতা ফিরে এসে শরৎবসু খবরের কাগজে বিবৃতির মাধ্যমে একথা বলেছিলেন এবং জিন্নাহ যে রাজি হয়েছিলেন এ কথা স্বীকার করেছিলেন।”
বাংলার হিন্দু নেতারা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে গেলেন, কিন্তু বঙ্গীয় আইন সভায় উভয় পরিষদের অধিবেশন পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম সদস্যরা অবিভক্ত বাংলার পক্ষে ভোট দিলেন, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সদস্যরা বঙ্গ বিভাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। এইভাবে বৃহত্তর স্বাধীন বাংলার ধারণাকে চিরতরে বনবাসে পাঠানো হলো। আশ্চর্যের বিষয়, ১৯০৬ সালে বাংলাকে বিভক্তির ব্যাপারে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা, শিক্ষিত সমাজ, কবি, সাহিত্যিক সকলেই ঘোর আপত্তি জানিয়েছিলেন। ফলে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায়। অথচ প্রায় ৩৭ বছর পর এই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরাই বঙ্গভঙ্গ উৎসাহিত করলেন এবং বঙ্গভঙ্গের এই সিদ্ধান্তকে সানন্দে মেনে নিলেন। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি এবং মানুষের মনোভাবের কী পরিবর্তন হতে পারে এটি তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
ভারত বিভাগের সময় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের ভূমিকা কি ছিল এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু লিখেছেনÑ
“এই সময় লর্ড মাউন্টব্যাটেন তলে তলে কংগ্রেসকে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল তিনি ভারত ও পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল একই সাথে থাকবেন। জিন্নাহ রাজি হলেন না, নিজেই পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল হয়ে বসলেন। মাউন্ট ব্যাটেন সম্পর্কে বোধ হয় তাঁর ধারণা ভালো ছিলোনা। মাউন্ট ব্যাটেন ক্ষেপে গিয়ে পাকিস্তানের সর্বনাশ করার চেষ্টা করলেন। যদিও র‌্যাড ক্লিফকে ভার দেওয়া হলো, সীমানা নির্ধারণ করতে। তথাপি তিনি নিজেই গোপনে কংগ্রেসের সাথে পরামর্শ করে একটা ম্যাপরেখা তৈরি করেছিলেন বলে অনেকের ধারণা। জিন্নাহ গর্ভনর জেনারেল হোক এটা আমরা যুবকরা মোটেও চাই নাই। তিনি প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হবেন, পরে প্রেসিডেন্ট হবেন এটাই আমরা আশা করেছিলাম। লর্ড মাউন্টব্যাটেন পাকিস্তানের বড়লাট থাকলে এতোখানি অন্যায় করতে পারতেন কিনা সন্দেহ ছিলো। এটা আমার ব্যক্তিগত মত। জিন্নাহ অনেক বুদ্ধিমান ছিলেন আমাদের চেয়ে, কি উদ্দেশ্যে নিজেই গর্ভনর হয়েছিলেন তা তিনিই জানতেন’।” (পৃষ্ঠা-৭৪-৭৫)
যা হোক, বড়ই দুর্ভাগ্য বৃহত্তর ও স্বাধীন বাংলার পরিকল্পনার জন্য সোহরাওয়ার্দীকে পাকিস্তানের শত্রু বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছিলো। এই প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে লিখেছিলেন (যা ১৯৬৪ সালের মার্চ মাসে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছিলো)
“তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি খণ্ডিত পাকিস্তানে খণ্ডিত বাংলার কুফল উপলদ্ধি করিতে পারিয়াছিলেন। তার ফলে উদ্ভব হইয়াছিলো বৃহত্তর বাংলার সোহরাওয়ার্দী-বসু চুক্তি (সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসুর নামানুসারে)। এই পরিকল্পনার প্রতি কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আর্শীবাদ ছিল, কিন্তু বল্লভ ভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে পরিচালিত চরমপন্থি কংগ্রেস মহল এবং মি. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ন্যায় সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিবর্গ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে দেয় নাই। আমি নিশ্চিত যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হইলে তাহা কতই ভালো হইতো, জনগণ আজ তা উপলব্ধি করিতে পারিতেছে। সর্বোপরি বাংলা, আসাম এবং বিহার, উড়িষ্যার বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চলগুলোকে লইয়া উহা সম্পদের দিক দিয়ে বিশ্বের মধ্যে অন্যতম ধনী সম্পদশালী রাষ্ট্র হইতো।”
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট থেকে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সৃষ্টি হলে, পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন খাজা নাজিমুদ্দিন আর প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সাংগঠনিক কমিটির দু জন প্রধান সদস্য হলেন নুরুল আমীন ও ইউসুফ আলী চৌধুরী মোহন মিঞা। লাহোর প্রস্তাবের উপস্থাপক শের-এ-বাংলা একে ফজলুল হক, আর পাকিস্তান প্রস্তাবের উপস্থাপক হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে রয়ে গেলেন। এমনকি মুসলিম লীগের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদেও তাঁদের রাখা হলোনা। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান খান, শামসুল হক, মিসেস আনোয়ারা খাতুন, কামরুদ্দীন আহমদ সমবায়ে গঠিত এক প্রতিনিধি দল মাওলানা আকরাম খাঁর সঙ্গে দেখা করেও মুসলিম লীগের সদস্য হওয়ার রশিদ বই পর্যন্ত সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন। এমনকি আতাউর রহমান ও আনোয়ারা খাতুন করাচি গিয়ে মুসলিম লীগ সংগঠক চৌধুরী খালেকুজ্জামানের সাথে দেখা করেও কোনো ফল হয়নি। এইভাবে কেন্দ্রীয় লীগ নেতারা সংগঠনটিকে তাঁদের পকেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে ফেলেন। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক কর্মীরা বিকল্প সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করেন এবং তারই ফলে সৃষ্টি হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গঠিত হয় পূর্ববাংলা আওয়ামী মুসলিম লীগ। ঢাকায় রোজ গার্ডেনে এক রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে এই দল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক ও শেখ মুজিবুর রহমান হন যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন বাঙালি স্বার্থ রক্ষার অকুতোভয় এক সৈনিক।
১৯৫২ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে। ফজলুল হক মুসলিম হলের আমি আবাসিক ছাত্র ছিলাম। আমার রুম ছিলো পশ্চিম দিকে দ্বিতীয় তলায় ডব্লিউ-৮ নম্বর। সেই সময় হলে ছিলেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মো. জিল্লুর রহমান (পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন), তাজউদ্দিন আহমদ, এমাজউদ্দিন, এমকে আনোয়ার, গোলাম আরিফ টিপু ও অন্যরা। আমরা একরুমে চারজন থাকতাম। অন্যরা পড়তেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও কমার্স। অর্থনীতি পড়তেন আফসার আহমদ সিদ্দিকী। তিনি ছিলেন রাজনীতি সচেতন। দুর্ভাগ্য, তিনি দীর্ঘজীবন পাননি। তিনি ছিলেন বিএনপির অফিস সেক্রেটারি। আমাদের হলে প্রায় আসতেন ভাষা সংগ্রামী গাজীউল হক, সাংবাদিক হাসান হাফিজুর রহমান, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, কাজী ফজলুর রহমান ও অন্যরা। তখন ছাত্র রাজনীতি ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন।
(চলবে)
লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।