যৌবন ও জীবনের শেষ চিকিৎসা মিলছে ফেসবুক-ফুটপাতে

আপডেট: মে ৪, ২০২১, ১০:৩৭ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


আধুনিকতার ছোঁয়ায় ব্যক্তি জীবনে অনলাইন নির্ভশীলতা বাড়ছে। করোনাকালে পাল্লা দিয়ে পণ্য কেনাবেচার অনলাইন প্ল্যাট ফরমও তৈরি হচ্ছে। আর প্রচারণার জনপ্রিয় মাধ্যম এখন ফেসবুক। যেখানে অন্যান্য পণ্যের মতো ক্ষতিকর যৌন উদ্দীপক ওষুধ-লোভনীয়, কুরুচিপূর্ণ, অবিজ্ঞানসম্মত ও মানহীন বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। শুধু ফেসবুক নয়, যৌবনের শেষ চিকিৎসা মিলছে রাজশাহী নগরীর ফুটপাতেও। নগরীজুড়ে প্রেম, সংসার অথবা জীবনের ভাঙ্গন থেকে শুরু করে গড়ার কাজটিও করে দিচ্ছে তান্ত্রিক চিকিৎসা। আর এসব চিকিৎসার বিজ্ঞাপন লেগেছে নগরীর প্রায় প্রতিটি মোড়ে মোড়ে। কুরুচিপূর্ণ এসব প্রচারণা নিজের অজান্তেই দেখছেন শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ। আকৃষ্টও হচ্ছেন অনেকেই। একইসঙ্গে ঠকছেন। অথচ এ বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই প্রশাসনের।
কখনো রগরগা শব্দের ব্যবহার, কুরুচিপূর্ণ ছবি আবার কখনো ধর্মের দোহায় সঙ্গে মিথ্যার বেসাতিকে পুঁজি করেই এসব চিকিৎসায় সাধারণ মানুষকে বিশেষ করে টিন এজের কিশোরদের শিকার বানাচ্ছেন তারা। যৌবনের বিভিন্ন সমস্যায় তাদের চিকিৎসার প্রাধান উপজীব্য। অনলাইন কিংবা ফুটপাতের এই বিজ্ঞাপনগুলোতে যোগাযোগের জন্য দেয়া হয়েছে ফোন নম্বর। আকৃষ্ট হয়ে কেউ ফোন করলেই নানা বিভ্রান্তিমূলক কথায় মগজ ধোলায় করা হয়। যৌবন ও জীবন নিয়ে হতাশাব্যঞ্জক নানা কথার জালে বন্দি করে তাদের চিকিৎসা নিতে বাধ্য করা হয়। শেষ অস্ত্র হিসেবে চিকিৎসা না নিলে তার ক্ষতি করার হুমকিও দেয়া হয়। অনলাইনে অর্ডার করে কুরিয়ার যোগে ঘরে বসেই এই ওষুধ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। আর এভাবেই চিকিৎসা ব্যবস্থা ও যৌবনের সমস্যা সর্ম্পকে সঠিক ধারণা না থাকা মানুষদের বোকা বানিয়ে ক্ষতির মুখে ফেলছে এই প্রতারক চক্র।
অনলাইন প্ল্যাটফরমগুলো ঘুরে দেখা যায়, সেখানে বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ ছবি এবং মিথ্যা তথ্য সংবলিত বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। সেখানে অনেকেই কমেন্ট করছেন। এবং ফোন করে কুরিয়ারযোগে ওষুধ নিচ্ছেন। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি মোড়ে ও অধিকাংশ বিদ্যুতের পিলার ও দেয়ালে বিভিন্ন কবিরাজি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন লাগানো হয়েছে। জসিম বন কবিরাজ, তান্ত্রিক ও কবিরাজ মো. কাওছার হোসেন, তান্ত্রিক আবুল হোসেন কবিরাজ, তান্ত্রিক ও কবিরাজ মো. রাফি, মেছবাহ সাহেব কবিরাজসহ বিভিন্ন নামীয় কবিরাজ প্রচারণা চালাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার আগে থেকেই এমন বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে। যেটা বর্তমানে বেড়েছে। এছাড়া অনেক সময় নগরীর জনসমাগম ঘটে এমন এলাকায় লিফালেট বিতরণও করা হয়। এমনটি একটি লিফলেট গত কয়েকদিন আগে নগরীর রেলগেট এলাকায় এই প্রতিবেদককে দেন এক ব্যক্তি। যেটা কবিরাজ হাজী হাফেজ আল হামিদ চৌধুরীর আল মদিনা দাওয়াখানা। মুঠোফোনে রোগি পরিচয়ে কথা বললে তিনি জানান, তার বাসা চট্রগ্রাম। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে এভাবে ওষুধ বিক্রি করছেন। তিনি রগরগা কথা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে প্রতিবেদককে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন। ওষুধ নিতে রাজি না হওয়ায় ক্ষতি করার হুমকিও দেন।
নগরীর রেলগেট এলাকার একপথচারী সাবের আলী জানান, নগরীর অধিকাংশ মোড়গুলোতে বিভিন্ন কবিরাজি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনগুলো প্রায় দুই বছর থেকে দেখছেন তিনি। এরমধ্যে অনেকেই এসব বাজে লিফলেটগুলো ছিঁড়ে ফেলেছেন। কিন্তু আজব বিষয় হলো কিছুদিন পর নতুন করে এ বিজ্ঞাপনগুলো সাটানো হয়। আর কারা এগুলো লাগিয়ে যায় এটা দেখা যায় না।
অপরদিকে, গত দুই মাস আগে নঁওগার ১৫ বছর বয়সী কিশোর অনলাইনে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখে মোটা হওয়ার ওষুধ অর্ডার করে। ঘরে বসেই কোন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়ায় কয়েকদিন সেই ওষুধ সেবন করে। পরবর্তীতে সে বুঝতে পারে সে ধোকার শিকার হয়েছে।
আর এভাবেই নগরীর মোড়ে ও অনলাইনে এমন কুরুচিপূর্ণ প্রচারণার ফাঁদে পড়ে আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির মুখে পড়ছে কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। রাজশাহীতে প্রকাশ্যেই এই প্রতারকরা ব্যবসা চালিয়ে গেলেও প্রশাসনিক কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন চোর চুরি করলে একজনের ক্ষতি করে থাকে। কিন্তু এরা প্রকাশ্যে প্রচারণা চালিয়ে গোপনে মানুষের ক্ষতি করছে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করে মানুষ একদিকে অর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন জটিলতারও শিকার হচ্ছেন। সুতরাং এ বিষয়ে অবশ্যই প্রশাসনকে তৎপর হতে হবে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুল আলম বাদশা জানান, এদেশে চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে মানুষের অনেক ভ্রান্ত ধারণা আছে। অশিক্ষিত মানুষের সংখ্যাও কম নয়। একারণে এখনো অনেকেই কবিরাজি হাতুড়ে চিকিৎসায় বিশ^াস করছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফুটপাত থেকে ওষুধ কিনে খাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের এসব সরলতাকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির অসাধু মানুষ ফায়দা লুটছে। তবে এখনই এর বিরুদ্ধে প্রশাসনকে তৎপর হতে হবে। সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।
তিনি আরো জানান, এদের থেকে অপচিকিৎসা ছাড়া কখনোই সুচিকিৎসা আশা করা যায় না। চারিদিকে ভেজালের মধ্যে এইসব মোটা হওয়া ও মানহীন যৌন উদ্দীপক ওষুধগুলো সেবন করে ব্যক্তি মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে। সুতরাং এখানে ওষুধ প্রশাসনসহ যারা দায়িত্বে আছেন তাদের সক্রিয় হতে হবে।
এ বিষয়ে রাজশাহী ওষুধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক মাখনুম তাবাসসুম জানান, যৌনতাকে কেন্দ্র করে অনলাইনে কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা চালিয়ে যারা ওষুধ বিক্রি করে তাদের নিয়ে রাজশাহীতে কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হয় না। এটা ঢাকা থেকে দেখা হয়। রাস্তাঘাটে, হাটে বাজারে আগে কবিরাজি চিকিৎসাসহ যে ওষুধ বিক্রি করা হতো সেটা এখন আর তেমন নেই। আর নগরীর মধ্যে যে প্রচারণার কথা বলছেন এ বিষয়ে তার জানা নেই। কেউ অভিযোগ করলে তারা ব্যবস্থা নেবেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী পুলিশ কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক জানান, এ বিষয়টি ওষুধ প্রশাসন দেখাশোনা করে। তাদের কোনো কার্যক্রম নেই। তবে তারা কিছুদিন আগে একটি নকল ওষুধ তৈরি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়। সেখানে নকল ওষুধ জব্দসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। আর এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল বলেন, আপনি বিষয়টি তো আমার নলেজে দিয়েছেন। আপনার কথার সত্যতা আগে আমাকে যাচাই করতে হবে। আর এখন পর্যন্ত কোনো ভুক্তভোগী আমাকে বলে নাই তারা অনলাইন বিজ্ঞাপনে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ঠিক আছে যদি এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে সে মামলা করতে পারে, আমাদের কাছে অভিযোগ করতে পারে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ