রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক নন্দিত জীবনের উৎসারিত আলো ছাব: ইন্টাননেট বাইশে শ্রাবণ স্মরণীয়

আপডেট: আগস্ট ৬, ২০২২, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


‘বলাকা’ কাব্যের উনিশ সংখ্যক কবিতায় ১২২১ বঙ্গাব্দের ২৯ শে পৌষের স্নিগ্ধ সকালে সুরুলে বসে রবীন্দ্রনাথ অনাদি-অনন্ত কালের আপ্তবাক্য উচ্চারণ করে বলেছিলেন: ‘ভালোবাসিয়াছি এই জগতের আলো/ জীবনেরে তাই বাসি ভালো। তবুও মরিতে হবে, এও সত্য জানি’, অথচ যৌবনের তাপদগ্ধ দিনে ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যের সূচনা কবিতা ‘প্রাণ’ এ, উচ্চারণ করেছিলেন, ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে’, এ ছিলো জীবনের ঋতু পরিবর্তনের এক নির্বাধ উচ্ছ্বাস। কাব্যখানি প্রকাশের (১৮৮৬) প্রায় অর্ধশতাব্দীরও পরে শান্তিনিকেতনে বসে ৭-১২-৩৯ তারিখে ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যের মুখবন্ধ রচনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন: ‘কড়ি ও কোমলে’ যৌবনের রসোচ্ছ্বাসের সংগে আর একটি প্রবল প্রবর্তনা প্রথম আমার কাব্যকে অধিকার করেছে, সে জীবনের পথে মৃত্যুর আবির্ভাব, … এই মৃত্যুর নিবিড় উপলব্ধি আমার কাব্যের এমন একটি বিশেষ ধারা, নানা বাণীতে যার প্রকাশ।’ এ কারণে মৃত্যু-ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ কখনো কখনো থমকে দাঁড়ালেও, সেখান থেকে আবার নবজীবনের বীজ উপ্ত হয়েছে। নতুন করে জীবনকে উপভোগের ডালি সাজিয়েছেন তিনি।
মৃত্যুটাই সত্য, জীবন ছায়ামাত্র। তাইতো তিনি রহস্যাবৃত জীবনের পর্দা উন্মোচন করতে গিয়ে বলেন, ‘মরণ বলে আমি তোমার জীবনতরী বাই।’
রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর অকপট বিশ্বস্ততা অনুভব করেছিলেন জীবনের সেই কিশোর বেলায় ‘ভাণু-সিংহ ঠাকুরের পদাবলিতে’ (১৮৮৪) ‘মরণরে তুহুঁ মম শ্যাম সম্মান’ বলে প্রশস্তি করে। ও দিকে মরমি কবি ওমর খৈয়াম মৃত্যুকে পরম প্রিয় বলে বন্দনা করেছিলেন।
জীবন ও জগৎ প্রেমী রবীন্দ্রনাথ ‘বেঁচে থাকা সেই যেন এক রোগ’ ভেবেছেন ‘পলাতকা’ কাব্যের ‘মুক্তি’ কবিতায়। এ যেন কালের যাত্রার ধ্বনির অভিজ্ঞতা। অনুজপ্রতিম অতুলপ্রসাদের অকাল বিদায়ের কথা স্মরণ করে তিনি ‘পরিশেষ’ কাব্যে উচ্চারণ করেছেন, ‘দীর্ঘ আয়ু দীর্ঘ অভিশাপ।’ আসলে জীবন মধুর হিসেবে প্রতিভাত হয় ভোগের একটা চূড়ান্ত সময়ে। এরও আবার ক্রমহ্রাসমানতা আছে, তখন বেঁচে থাকাকে শ্রেয় ভাবেনা অনেকে।
রবীন্দ্রনাথ আশি বছরের জীবন পরিধিতে সুখ অপেক্ষা দুখের মুখোমুখি হয়েছেন বেশি। তাই নিয়ে তিনি হাহুতাশ করেন নি। তাঁর কণ্ঠে শোনা যাক:
‘কী পাইনি তারি হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি।…
মাঝে মাঝে ছিঁড়েছিলো তার, তাই নিয়ে কেবা করে হাহাকার’
তাইতো দেখা যায়, জীবনের একটি পর্ব, (গীতাঞ্জলি, গীতালি, গীতিমান্য, স্মরণ এর যুগ) যাকে প্রমথনাথ বিশী রবীন্দ্রপ্রতিভার নির্বাসনের যুগ বলে অভিহিত করেছেন। আমরা সে বিচারে না গিয়ে বলবো, নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য রবীন্দ্রনাথের মানস কর্ষণের ফসল লাভ একালেই দৃশ্যমান।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু চেতনার অভিপ্রায় জীবন বিমুখতা নয়, নবনব রূপে জীবন সুধারস পানের পেয়ালা সাজানো। তাঁর জীবনের শেষ পর্বের রচনাগুলো আবেগপ্রধান নয়, অনেকটা নতুন করে পারিপাশির্^ক এবং বিশ্বজোড়া মানবতার অপমানকে চোখ মেলে পর্যবেক্ষণ করতে চাওয়া এবং ‘নাগিনীদের বিষাক্ত নিশ্বাস’ আমলে এনে ‘বিদায় নেবার আগে দানবের সাথে সংগ্রামের তরে’ ঘরে ঘরে প্রস্তুতি নেয়াদের শুভাশিস জানালো। যাবার আগে জীবনের জয় ঘোষণা করতে গিয়ে মুখোশধারীদের সম্পর্কে স্বয়ং সতর্ক হয়েছেন এবং মানবম-লীকে সচেতন করে দিয়ে গেছেন। তাই বলে ‘মরার আগে দুবেলা মরতে’ চাননি।
শেক্সপীয়র মনে করতেন কাপুরুষরা মরার আগে বহুবার মরে। রবীন্দ্রনাথও প্রেমের ভাবনায় বিভোর হয়ে একদা বলেছিলেন, ‘মন দেয়া নেয়া অনেক করেছি, মরেছি হাজার মরণে’। বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান অন্যভাবে তার পুনরাবৃত্তি করে গিয়ে লিখেছিলেন ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে।’ রবীন্দ্রনাথ যাবার আগে মৃত্যু সন্ত্রস্ত না হয়ে বলেছেন “যতবার ভয়ের মুখোশ তার করেছি বিশ্বাস/ততবার অনর্থ হয়েছে পরাজয়।’ (১৪ সংখ্যক কবিতা, ‘শেষ লেখা’। জোড়াসাঁকো ২৯ শে জুলাই, ১৯৪১।) রবীন্দ্রনাথ নতুন করে পরাজিত হতে চাননি। তবে অবয়বিক ক্ষীয়মাণতা অস্বীকার করবেন কীভাবে! কারো পক্ষে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকা অবশ্যই অকল্পনীয়, কিন্তু জীবন দর্শনের পথরেখা তো হারিয়ে যায়না। সেই আনন্দময় জীবনাচরণ ছিলো তাঁর আরাধ্য। রবীন্দ্রনাথ ধর্ম কিংবা রাজনীতিকে প্রভাবক হিসেবে অবলম্বন করে লোকপ্রিয় হতে চাননি। মানবধর্মের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতির যথার্থ মূল্য দিতে চেয়েছেন। এ কারণে তিনি বিশেষ কোনো ধর্ম বা মতবাদের প্রতিনিধি সাজেন নি। ‘আত্মশক্তি’ গ্রন্থে নাতিদীর্ঘ হলেও এতদসম্পর্কিত বিশদ বর্ণনা আছে। তিনি নিজেকে ‘হিন্দু’ হিসেবে পরিচিত করতে চেয়েছেন, হিন্দুস্তানি অর্থাৎ ভারতীয় নাগরিকত্বের ভিত্তিতে, ধর্মের মানদন্ডে নয়, আমৃত্যু মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে। তাই বিদ্যাসাগরের প্রতি ছিলো তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধ। মানুষ যদি দানবীয় আচরণ দিয়ে মানবসত্তার অপমান করে তবে তার পরিচয় মানুষ থাকে না। পাশবিকতাকে তিনি মনে প্রাণে ঘৃণা করতেন। পাশ্চাত্য মনীষার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ অটুট থাকলেও, তাদের শোষকের লোভাতুর দৃষ্টি তাঁকে মুখর হতে বাধ্য করেছে। যাবার আগে ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখ তাই তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’ (সভ্যতার সংকট) যে মানুষ আকাশ কিংবা গুহাচারী নয়।
সে বিশ্বাস রেখেই তিনি অনন্ত নিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের সংশয়বোধ ছিলো না তা নয়, তবে সকল মানুষের সুকুমার বিশ্বাসের প্রতি সম্মান রাখতে চেয়েছেন তিনি। এখানেই তাঁর বিশেষত্ব। এপথেই তাঁকে স্মরণ করলে তাঁর প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হবে, কোনো প্রকার সাম্প্রদায়িকতার দৃষ্টিতে নয়।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ