‘রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়’ কেন হচ্ছে না?

আপডেট: মে ৮, ২০১৭, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী


আজ রবীন্দ্র জয়ন্তী। দিনব্যাপী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উৎসব পালিত হবে। দু’বছরেও শাহজাদপুরে কবির নামে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু না হওয়ায়, জনমনে দ্বিধা ও হতাশা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে এবং ভারত সরকারের আংশিক আর্থিক সহযোগিতায় রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য শাহ্জাদপুরে কবির নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে প্রায় দু’বছর আগে।
পিত্রাদেশ পেয়ে জমিদারি তদারকির কাজে ১৮৮৯ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথের যাতায়াত ছিল পূর্ববঙ্গে। পূর্ববঙ্গের তিন জমিদারিÑ কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পাবনার শাহজাদপুর এবং রাজশাহীর পতিসরে যাতায়াত করেছেন কবি নদী পথে। বোটে চড়ে পদ্মা, গড়াই, করতোয়া, ইছামতি, হুরাসাগর, নাগর, আত্রাই, বড়াল নদী আর চলনবিল তাঁর ওই যাতায়াতের পথ। জমিদারি দেখাশুনা করতে এসে তিনি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরিচিত হয়েছিলেন, এখানকার প্রকৃতি আর মানুষের সঙ্গে। যার প্রমাণ মিলে তাঁর পূর্ববঙ্গে রচিত কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ এবং স্বজনদের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিতে। এখানকার মানুষদের ভালবেসে, তাদের কল্যাণের জন্য অনেক জনহিতৈষিণামূলক কাজ করে গেছেন কবি- জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রজাদের কল্যাণের বিষয় চিন্তা করে কৃষির উন্নতি ঘটাতে, নিজ পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিতে ¯œাতক করে নিয়ে এসেছিলেন। সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ নিজ জমিদারি পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করে প্রজাদের স্বল্পসুদে, সহজ কিস্তিতে কৃষি ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে নানা কৌণিকে রবীন্দ্রনাথের অবদান বিবেচনার অপেক্ষা রাখে। অর্ধ শতাব্দী ধরে এদেশে জমিদার হিসেবে পল্লী উন্নয়নের যে ধারা তিনি গড়ে তুলেছিলেন, গ্রামীণ ব্যাংক স্থাপন করে গ্রামের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের যে প্রয়াস চালিয়েছিলেন; তা এখন সারা বিশ্বেই অনুসৃত হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের রচনা ছাড়া একাডেমিক পড়া লেখা চালানো যায় নাÑ শিশু শ্রেণি থেকে উচ্চতর উপাধি পর্যন্ত পাঠ্য রবীন্দ্রনাথ। তাঁর লেখা গান ছাড়া বাঙালির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকে অপূর্ণ। তাঁর লেখাই হয়ে উঠেছিল, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল প্রেরণা। তাই রবীন্দ্রনাথের প্রতি বাঙালি জাতির ঋণের অন্ত নেই।
বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথের ব্যাপকতার প্রভাব রয়েছে। এজন্য পাকিস্তানি শাসকেরা এদেশে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার জন্য উদ্যোগী হয়ে উঠেছিলো। রবীন্দ্রনাথ যে বাঙালির জীবনে অপরিহার্য, সেকথা স্মরণ করিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত রবীন্দ্র সঙ্গীত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণ প্রদানকালে বক্তব্যে বলেছিলেন :
…ঞধমড়ৎব যধফ ৎবভবষবপঃবফ ঃযব যড়ঢ়বং ধহফ ধংঢ়রৎধঃরড়হ ড়ভ ঃযব ইধহমধষববং  ঃযৎড়ঁময যরং ড়িৎশং ধহফ রিঃযড়ঁঃ ঞধমড়ৎব ঃযব ইবহমধষর খধহমঁধমব ধিং রহপড়সঢ়ষবঃবফ.
রবীন্দ্রনাথে কাছে এদেশের মানুষের ঋণ যদিও অপরিশোধ্য, তবু ঋণভার খানিক লাগব করার জন্য কবির স্মৃতিধন্য সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকার গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, কবির পূর্ববঙ্গের অন্যতম জমিদারি ছিল এই পরগণা (বর্তমানে সিরাজগঞ্জের শাহ্জাদপুরে)। ১২৯৭ থেকে ১৩০৪ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ইউসুফশাহী পরগণার এই জমিদারিতে রবীন্দ্রনাথ বহুবার অবস্থান করেছেন। অসাধারণ কিছু ছোটগল্প, গান, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক এবং স্বজনদের কাছে বেশ কিছু তথ্যনিষ্ঠ চিঠি লিখেছেন এখান থেকে; যা তাঁর সাহিত্যকে ভিন্ন এক মর্যাদা দান করেছে। কবির স্মৃতিধন্য এই শহরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় সুবিধা হলো, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর জমিদারিই বিশাল এলাকা জুড়ে খাস জমির বাথান রয়েছে। চমৎকার যোগাযোগ ব্যবস্থাÑ ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক দিয়ে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় যাওয়া যায় রাজধানী ঢাকা মহানগরীতে। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বঙ্গবন্ধু সেতুতে যেতে সময় লাগে মাত্র ৩০ মিনিট। নৌ-বন্দরসহ বাণিজ্য কেন্দ্র হওয়ায় শাহজাদপুরের সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক পরিম-লে এধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। দেশবাসী সরকারের সময়োচিত ওই সিদ্ধান্তকে অভিনন্দিত করেছিলো। একটি সূত্র থেকে জানা যায় যে, ভারত সরকারের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিতব্য ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রবীন্দ্র অধ্যয়ন’ বিষয়কে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হবে। পাশাপাশি থাকবে মানব বিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাশৃংখলা- দর্শন, সাহিত্য, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, ফোকলোর, ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, সঙ্গীত, নাটক, চারুকলা, নন্দন তত্ত্ব, পল্লী উন্নয়নের পাশাপাশি ফলিত বিজ্ঞান বিষয়ও স্থান পাবে।
দু’বছর হয়ে গেল, সরকারের ওই সিদ্ধান্তের কোন বাস্তবায়ন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু রবীন্দ্রভক্ত, রবীন্দ্রনুরাগীদের কাছেই নয়, দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেÑ রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় অদৌ হবে তো? নাকি কাগজে-কলমে থেকে যাবে!
লেখক : গবেষক ।  অধ্যাপক, লিবারেল আর্টস, রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নাটোর।
প্রাক্তন অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ঢ়ৎথংধরভ@ুধযড়ড়.পড়স