রবীন্দ চর্চার সর্বত্রগামিতা

আপডেট: আগস্ট ৬, ২০২০, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির


করোনাভাইরাসে জগৎ-জোড়া লাখো মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুকবলিত হবার প্রতি গভীর সমবেদনা রেখে আমরা রবীন্দ্রপ্রয়াণ দিবসে ‘রবীন্দ্রচর্চার সর্বত্রগামিতা’ বিষয়ে সবিনয়ে দুচারটি কথা বলতে চাই।
বাংলাদেশের প্রধান রবীন্দ্র-অনুধ্যায়ী ভাষাসৈনিক, সমাজসচেতন আহমদ রফিক অভিযোগ করেছেন (৬.৮.২০১৯, কালের কণ্ঠ) রবীন্দ্র তিরোধানের পৌনে একশো বছর অতিক্রান্তের পরও সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে তিনি অজ্ঞাতই রয়ে গেলেন। তাঁর এই উষ্মা একেবারে অনভিপ্রেত নয়। তিনি ছাড়া অনেকেই এই অনুযোগ করে থাকেন। রবীন্দ্রনাথও একবার রসিকতা করে বলেছিলেন: ‘কালিদাস তো নামেই আছেন, আমি আছি বেঁচে।’ বাংলা প্রবচনে বলা হয়ে থাকে: ‘নাভির সুখে নিদ্রা, চিত্তের সুখে গান।’ এ দুয়ের সংযোগ হলে সাহিত্যেরস তথা জীবন রসের প্রতি ‘মানুষ আকৃষ্ট হয়। তাই পরিশীলিত চেতনার মানুষ ছাড়া অনেকেই কাব্য-সাহিত্যের রসাস্বাদনে এগিয়ে আসে না। রবীন্দ্রনাথ এর সাথে সহমত পোষণ করে ‘মধ্যবর্তিনী’ গল্পের সূচনায় বলেছিলেন : ‘নিবারণের সংসার নিতান্তই সচরাচর রকমের, তাহাতে কাব্যরসের কোনো নামগন্ধ ছিলনা।’ প্রসঙ্গত ভেবে দেখা দরকার, মানব-সমাজের ক্রমবিকাশে মানুষ কিভাবে বোধের ক্ষেত্রে বহুধাবিভক্ত হয়ে গেছে। ধর্ম বলি আর ক্ষমতা বলি সর্বত্র মানুষের চেতনা এককেন্দ্রিক নয়। অথচ সুখ-দুখ, আনন্দ-বেদনার অনুভবে পার্থক্য নেই। লেখাবাহুল্য, কবিদের অনুভূতি প্রকাশের প্রধান উৎস হৃদয়বৃত্তি। এই বিষয়টিকে ধর্ম কিংবা মতবাদের খোলসে রূপায়িত করলে তার সর্বজনগ্রাহ্যতা হ্রাস পায়। রবীন্দ্রনাথ ‘বহুমানবের প্রেম দিয়ে ঢাকা,/ বহুদিবসের সুখে দুখে আঁকা,/ লক্ষযুগের সংগীত মাখা/ সুন্দর ধরাতলে… ‘আনন্দলোক বিরচন করার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করে গেছেন, সুতরাং সেখানে বিতর্কের অবকাশ না থাকার কথা। অথচ হয়ে গেছে, মানসিক ও আর্থ-সামাজিক বিভক্তির ফলে। তা সে বাংলাদেশ হোক কিংবা পশ্চিমবঙ্গ।
সাতচল্লিশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূলে ছিলো সাম্প্রদায়িকতা। এর পেছনে অন্যান্য নানা কারণও ছিলো। সমগ্র বঙ্গভূমিতে হিন্দু-মুসলমানের সংখ্যা সমপরিমাণের কাছাকাছি থাকলেও মুসলমানদের মধ্যে সমকালীন শিক্ষার প্রসার বেশি হয়নি। যে শিক্ষা মানুষকে সাম্প্রদায়িকতা থেকে যুক্ত করে মানবমুখিতার প্রতি আকৃষ্ট করে, তার অভাব ছিলো। বিশশতকের প্রথমদিক থেকে বাঙালি মুসলিম সমাজ জাগতিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়। তখনকার শিক্ষায় মতবাদী বিষয়ের অতিরঞ্জন কম ছিলো। পাঠকগণ কবিদের ধর্মীয় মতবাদ দিয়ে বেশি চিহ্নিত করতেন না। করলে ‘অনলপ্রবাহ’ দীর্ঘায়ু হতো। জীবনের সুখ-দুখ, আনন্দ-বেদনা, রূপ-রসের বিষয়গুলো প্রাধান্য পেত না। লেখাবাহুল্য, মানবমনের চিরন্তন আনুভূতিক সত্যকে কবির লেখায় কতটুকু পাওয়া গেল, তার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি ছিলো। দেশভাগের পর পৃথক তাহজিব-তমুদুনের নামে পাকিস্তানি ভাবধারা প্রবলভাবে প্রবিষ্ট হতে থাকে। একজন বড়োমাপের কবি ‘পাকিস্তানের অভাব কি’ কবিতা লিখে সমন্বিত সংস্কৃতিতে বিভাজনের চেষ্টা চালায়। বলতে গেলে তখন থেকে ধর্মের ভিত্তিতে কবিকে গ্রহণ-বর্জনের পালা শুরু হয়। একদা নজরুল শক্তহাতে তা প্রতিহত করার উদ্যোগ নিলেও, কালব্যাধির ফলে সে চেতনা বাধাগ্রস্ত হয়।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও এ দেশীয় কিছু মূঢ় তাবেদার মানুষের মনে সাম্প্রদায়িতার বীজ প্রবিষ্ট করে রবীন্দ্র অপসারণের প্রচেষ্টা চালায়। পাঠক জীবন বিমুখ হতে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি পুরোপুরি আমাদের নাগালে নেই। তবে ওখানকার পাঠ্যতালিকায় বাংলা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা-গদ্য অনেকাংশ জুড়ে আছে। তুলনায় আমরা পিছিয়ে আছি। স্বীকার্য, যে-কোনো দেশের, সে যে ভাষারই হোক কবিকে বুঝতে হলে জীবন কেন্দ্রিক পাঠের বিষয়ের পরিধি বাড়াতে হবে এবং অনুভবের পরিসরকে বিচার করতে হবে মুক্তমন দিয়ে। দুঃখের বিষয় আমাদের সাক্ষরতার হার বেড়েছে সেই সঙ্গে মানবিক বোধের ব্যাপকতা সংকুচিত হয়েছে। পাকিস্তানি স্বার্থরক্ষার এদেশীয় দালালরা বিদ্বজনদের রবীন্দ্রসংগীত রচনার পরামর্শ দিয়েছেন। এখানেই শেষ নয়, সম্প্রচারযন্ত্রে তা প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্তানিচক্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে রবীন্দ্রসাহিত্য পাঠ কোন্ প্রক্রিয়ায় রুদ্ধ করা যায় তার পরামর্শ চেয়ে ফরমান জারি করেছে। তাদের সে মূঢ়তার জবাব দিয়েছে মুক্তিপাগল জনতা। বঙ্গবন্ধু সে অচলায়তন ভেঙে রবীন্দ্রনাথের একটি গান জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দিয়েছেন। ’৭৫ এর জাতীয় ট্রাজেডির পর আবার রবীন্দ্রবিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বিদগ্ধ পণ্ডিত খান সারওয়ার মুরশিদ জনৈক সেনাশাসকের রবীন্দ্র বিদ্বেষের কথায় বলেছিলেন, তিনি নাকি রবীন্দ্রসংগীতের ঘোর বিরোধী। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই মনোভাব পাকিস্তানি দুরভিসন্ধির নামান্তর। না, এসব গ্রহণ বর্জনের পালা শেষ হবার কথা নয়। শিক্ষিত মানুষ যতদিন সাম্প্রদায়িক স্বার্থপরতা বজায় রাখবে, আর সাধারণ মানুষের ক্ষুণ্নিবৃত্তির সমাধান না হবে ততদিন সাহিত্য-শিল্পকলার শাশ্বত মানবিক রূপ সার্বজনীন হবে না।
একটু পেছনে ফিরে দেখি। ভারতের আদি কবি বাল্মীকি দশরথপুত্র রামচন্দ্রের মতো অসাধারণ চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। সাধারণ মানুষ তাঁর (বাল্মীকি) নাম কতজনে জানে? অথচ রামচন্দ্র সাধারণ মানুষের কাছে অবতার স্বরূপ। এমনকি আজকের দিনেও মৌলবাদী রাজনীতির শক্তিশালী কলকাঠি। সাধারণ মানুষের আবেগধর্মিতা এবং খাঁটি-মেকির প্রতি অনুরাগের কথা বলতে গিয়ে উনিশ শতকে জনৈক উর্দুকবি বলেছিলেন; ‘নাবিকো জো চাহে খোদাকার দেখায়ে, ইমামুকা রুতবা নাবি পার বাঢ়ায়ে।’ কালের ধারা এমনটি হয়। আমরা আপসোস করছি, রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছুলোনা বলে। রবীন্দ্রনাথ বিষয়টি বুঝতেন। তাই সমকালের ঈর্ষাপরায়ণ ছদ্মবেশী সমালোচনার জবাবে জীবনাবসানের সাড়ে সাতমাস আগে (২১-১-১৯৪১ সালে), ‘জন্মদিনে’ কাব্যের দশম সংখ্যক কবিতায় সবিনয়ে বলেছিলেন:
‘তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা/ আমার সুরের অপূর্ণতা।/ আমার কবিতা, জানি আমি,/ গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।’ বাণীটি অমোঘ নয়। হোমার, বাল্মীকি, কৃষ্ণদৈপায়ন, গ্যেটে কালিদাস, ইমরুল কায়েস, তরাফা, ফেরদৌসী, ওমর খৈয়াম প্রমুখের লেখা জীবনান্বেষী মানুষের মনে সাহিত্যরস সঞ্চার করে চলেছে। রবীন্দ্রনাথ ও তেমনটি থাকবেন। অগ্রবর্তী কবিগণ সাধারণ্যে বিস্তারলাভ করেন নি, রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে বিচিত্র মতবাদ কণ্টকিত দেশে তেমন পরিণতির সম্ভাবনা। তবে আমাদের বিশ্বাস, বাংলাভাষার সাথে তিনিও সাহিত্যরস জোগান দিয়ে যাবেন কালান্তর ধরে। তাছাড়া সাহিত্য পাঠের বিষয়টা হলো পরিশীলিত মুক্তমনের। মুক্তমন জীবন ধারণের উপকরণের সহজলভ্যতা যখন পরিশীলিত ভাবনায় উজ্জীবিত হবে তখন রবীন্দ্রনাথ তথা সাহিত্য-শিল্প সর্বত্রগামী হয়ে উঠবে। হয়তো হবে না। রবীন্দ্রনাথ এসত্য বুঝতেন তাই উচ্চারণ করতে বাধ্য হয়েছেন ‘পত্রপুট’ কাব্যের তৃতীয় সংখ্যক কবিতায় পৃথিবীকে (তথা পৃথিবীর মানুষকে) বলেছেন: ‘আজ আমি কোনো মোহ নিয়ে আসিনি তোমার সম্মুখে, এতদিন যে দিনরাত্রির মালা গেঁথেছি বসে বসে/ তার জন্য অমরতার দাবি করব না তোমার দ্বারে!’
আবার বিদায় নেবার আগে ‘সেঁজুতি’ কাব্যের ‘জন্মদিন’ কবিতায় নিরাসক্ত উচ্চারণ করলেন:
‘কীর্তি যা সে গেঁথেছিলো হয় যদি হোক মিছে,/ না যদি রয় নাই রহিল নামÑএই মাটিতে রইল তাহার বিস্মিত প্রণাম।’ রবীন্দ্রনাথের স্বকণ্ঠ উচ্চারিত ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত এতসব কথা স্মরণে রেখে রবীন্দ্রচর্চার সর্বত্রগামিতা বিষয়ের বিতর্কের অবসান হওয়া বাঞ্ছনীয়।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ