রমজানের শেষ জুমা

আপডেট: মে ৭, ২০২১, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ:


সপ্তাহের অন্য দিনের তুলনায় জুময়ার দিনের আলাদা গুরুত্ব আছে। আর তা যদি হয় রমজান মাসের জুময়া তাহলে তার মর্তবা তো আরও বেশী। জুমাতুল বিদার গুরুত্বটা এখানেই যে, রমজান চলে গেলে এমন গুরুত্বপূর্ণ জুময়া তো আর মিলবে না। জুমাতুল বিদা মানে শেষ জুময়া। পরিভাষায় রমজানের শেষ জুময়াকে জুমাতুল বিদা বলা হয়। ইসলামে জুমাতুল বিদা নামে আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কোন জুময়া নাই। তবে যে বা যারাই রমজানের শেষ জুময়াকে জুমাতুল বিদা নাম দিয়ে আলাদা করেছেন, তারা নিশ্চয় এর একটা গুরুত্ব বুঝাতে চেয়েছেন। আমাদের সে গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। এর মধ্যেই জুমাতুল বিদার বাস্তবতা নিহিত।
আজ জুমাতুল বিদা। জুমাতুল বিদার বাস্তবতা হচ্ছে নিজেকে আত্মজিজ্ঞাসার আয়নার সামনে দাড় করানো। জুমাতুল বিদা আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে, রমজান বিদায়ের পথে। রমজান চলে যাচ্ছে। সপ্তাহের এমন গুরুত্বপূর্ণ দিন এ রমজানে আজই শেষ। সুতরাং জুমাতুল বিদায় নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে হবে, পবিত্র মাহে রমজান যে উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে, তা কি অর্জন হয়েছে? তাকওয়ার শিক্ষা কি অর্জন হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে তাহলে রমজান এখনো বাকী আছে। এর মধ্যে অবশ্যই সেই শিক্ষা অর্জন করতে হবে।
রমজান এসেছে গুনাহ মাফের জন্য। জুমাতুল বিদায় নিজেকে বিবেকের কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করতে হবে, তোমার কি গুনাহ মাফ হয়েছে? যদি মাফ না হয়ে থাকে, তাহলে রমজান এখনও বাকী আছে। সে সুযোগ এখনও বিদ্যমান। নিজেকে মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে হাজির করে জীবনের সকল গুনাহ ক্ষমা করিয়ে নিতে হবে। রমজান পাওয়া সত্ত্বেও যদি গুনাহ মাফ না হয় তাহলে তো হতভাগা হয়ে যাব। হাদীসে তাই বলা হয়েছে। যেমন একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বরে বয়ান করার জন্য উঠছিলেন। তিনি যখন প্রথম ধাপে পা দিলেন, তখন বললেন, আমীন! অনুরূপ দ্বিতীয় ধাপে পা রাখার সময়ও বললেন, আমীন! তৃতীয় ধাপেও বললেন, আমীন! এমনটা কখনও হয়নি। সাহাবায়ে কেরাম বয়ান শেষে এর কারণ জানতে চাইলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি যখন প্রথম ধাপে পা রাখলাম তখন জিবরাইল আ. আমার কাছে এসে বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে পবিত্র রমজান মাস পেল অথচ তার গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না। আমি বললাম, আমীন! অর্থাৎ আল্লাহ তাই করুন। দ্বিতীয় ধাপে পা রাখার সময় জিবরাইল আ. বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যার সামনে আপনার নাম আলোচিত হওয়া সত্ত্বেও সে আপনার উপর দরূদ পাঠাল না। আমি বললাম, আমীন! যখন তৃতীয় ধাপে পা রাখলাম, তখন তিনি বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যার মাতা-পিতা উভয়ে কিংবা একজন বৃদ্ধাবস্থায় পৌঁছল অথচ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারল না অর্থাৎ তাদের খুশী করে জান্নাত হাসিল করতে পারল না। আমি বললাম, আমীন!
রমজানে কুরআন কতটুকু পড়া হয়েছে তা জুমাতুল বিদায় একটু ভেবে নেয়া দরকার। কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে না পারলে তা পূরণ করা দরকার। দান-সদকা যা করার দরকার ছিল, তা করা হয়েছে কিনা সেটাও ভাবতে হবে। জাকাত-ফিতরা আদায় করা হয়েছে কিনা তা হিসাব করে দেখতে হবে।
মোট কথা জুমাতুল বিদার কাজ হলো একটু পিছন ফিরে দেখা। যা করার দরকার ছিল, তা করা হয়েছে কিনা, কতটুকু ঘাটতি আছে এসব কিছু হিসাব-নিকাশ করার দিন জুমাতুল বিদা। নিজেকে নাড়া দিয়ে জাগিয়ে তোলার দিন জুমাতুল বিদা। যাতে করে রমজানের যে কয়েক দিন বাকি থাকে, সে সময়ে লক্ষ্য পূরনে যেন বেশ তৎপর হওয়া যায়। রমজান শেষ হওয়ার আগেই যেন কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করা যায়, সেই মানসিকতা, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তৈরী করার দিন জুমাতুল বিদা।
জুমাতুল বিদা বলতে যদি এ আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মোপলব্ধি হয়, তাহলে তার দ্বারা শিক্ষা নিতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলে জুমাতুল বিদার স্বার্থকতা অর্জন হবে।
লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট জামে মসজিদ, রাজশাহী