রমজানে ইবাদতের অনুকূল পরিবেশ

আপডেট: জুন ১১, ২০১৭, ১:২৩ পূর্বাহ্ণ

ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ


আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুসলিম উম্মাহর রমজান মাস দিয়েছেন বিশেষ নেয়ামত হিসেবে। আল্লাহ হচ্ছেন মাবুদ। তাঁর সামনে বান্দার বন্দেগি করার এক বিশাল সুযোগ করে দিয়েছেন এ মাসে। ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য হাসিল করার সুযোগ দানে তিনি রমজানকে ইবাদতের জন্য অনুকুল পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছেন। যেমন মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু শয়তান- যে সদাসর্বদা মানুষকে ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে- তাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ মাসে বন্দি করে রাখেন। যাতে করে সে এ মাসে বান্দাকে কোনরূপ ওসওয়াসা দিতে না পারে। বান্দার ইবাদতে কোনরূপ বিঘ্নতা সৃষ্টি করতে না পারে। আবার বান্দাও যেন ইবাদত করতে না পারার দায়-দায়িত্ব শয়তানের ঘাড়ে চাপিয়ে না দিতে পারে। বলতে না পারে শয়তানের জন্য সে ইবাদত করতে পারেনি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অজুহাতের এমন সুযোগের দ্বার বন্ধ করে দিয়েছেন।
শয়তানকে বন্দি করার পরও রমজান মাসে বেশ কিছু অন্যায়-অপকর্ম হতে দেখা যায়। এটা কেন? এমন হওয়ার কারণ- কোন লৌহাকে যদি দীর্ঘ এগারো ঘণ্টা প্রচণ্ড উত্তপ্ত তাপে পোড়ানো হয়, তাহলে দেখা যাবে পানি দেয়ার পরও তা দীর্ঘক্ষণ গরম থাকে। সহজে ঠাণ্ডা হয় না। বিষয়টা ঠিক এমনই। দীর্ঘ এগার মাস শয়তান আমাদের নফসের উপর যে পাপ কর্মের স্টিম রোলার চালায় রমজানের রহমতে তা বন্ধ হলেও তার প্রভাব হালকা হলেও থেকে যায়। যার কারণে স্বভাবতই দেখা যায়, রমজান মাসে অন্য মাসের তুলনায় পাপকর্ম অনেক কম হয়।
মূলত শয়তান দুই ধরনের। একটা হচ্ছে জিন সম্প্রদায়ের, অপরটি হচ্ছে মানব সম্প্রদায় থেকে। আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসে জিন সম্প্রদায়ের শয়তানকে বন্দি করেন। মানবরূপী শয়তানকে বন্দি করেন না। ফলে এ শ্রেণির শয়তান তার অপকর্ম ঠিকই চালিয়ে যায়।
রমজানে বান্দার জন্য ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করতে গিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ মাসে একটি নফল আদায় করলে অন্য মাসের একটি ফরজ আদায়ের সমান সওয়াব প্রদানের ঘোষণা করেছেন এবং একটি ফরজ আদায় করলে অন্য মাসের সত্তরটি ফরজের সমান সওয়াব প্রদানের ঘোষণা করেছেন। যাতে করে বান্দা ইবাদতে উৎসাহ পায় এবং আগ্রহের সাথে বেশি বেশি ইবাদত করে।
রমজান মাসে জাহান্নামের সকল দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং জান্নাতের সকল দরজা খুলে দেয়া হয়। এটাও রমজানে ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করতে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
আল্ল¬াহ তায়ালা ইবাদতের মাস হিসেবে রমজান দান করেছেন, ইবাদতের জন্য সুন্দর পরিবেশও সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বান্দার উচিত আগ্রহের সাথে বেশি বেশি ইবাদত করা। হযরত উবাদা ইবনে সামেত রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা নবী করিম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের কিছু পূর্বে ইরশাদ করলেন, রমজান মাস আগত প্রায়, যা অত্যন্ত রহমত ও বরকতের মাস। আল্লাহ তায়ালা এই মাসে তোমাদের প্রতি স্বীয় দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন এবং খাস অনুগ্রহ তোমাদের উপর বর্ষণ করেন, ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দেন, দোয়া কবুল করেন এবং ইবাদতের প্রতি তোমাদের আগ্রহ দেখতে থাকেন আর ফেরেশতাদের নিকট গর্ব করেন। সুতরাং তোমরা আলাহ তায়ালাকে নিজেদের সৎকর্ম দেখাও। ওই ব্যক্তি সত্যি হতভাগা যে এই মাসেও রহমত থেকে বঞ্চিত রইল।
আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি করেছেন আল্লাহরই ইবাদত করার জন্য। ফেরেশতারা সর্বদা আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে মশগুল রয়েছেন। কিন্তু তাদের এই ইবাদত সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। কেননা ফেরেশতারা যে ইবাদতে লিপ্ত রয়েছেন, তা তাদের স্বভাবজাত। তাদের দ্বারা ইবাদতের বিপরীত কোন কাজ প্রকাশ পাওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। তাদের ইবাদতবিহীন থাকার কোন ক্ষমতাই তাদের নেই। এটি তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোনো বিষয় নয়। আল্লাহ তায়ালা তাদের মাঝে গুনাহ করার ক্ষমতাই খর্ব করে দিয়েছেন। তাদের ক্ষুধা তৃষ্ণা লাগে না। তাদের মাঝে নফসের কোন কুপ্রবৃত্তিও জাগরিত হয় না। এমনকি তাদের অন্তরে গুনাহ করার সামান্যতম আগ্রহও জাগরিত হয় না। আর এ কারণে আল্লাহ তায়ালা তাদের ইবাদতের বিপরীত কোন সওয়াব প্রতিদান রাখেন নাই। ফেরেশতারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার না করলে এটি তাদের কোন শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়। কেননা ক্ষুধা-পিপাসা কী জিনিস তা তারা জানেন না। এগুলোর কোন প্রয়োজনও তাদের নেই। এ কারণে তারা পানাহার পরিত্যাগ করলে এর বিনিময়ে তারা প্রতিদান পাবেন না। এ ক্ষেত্রে মানবজাতির ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের ক্ষুধা তাড়া করবে, তারা পিপাসায় কাতর হবে, তাদের মধ্যে নফসের কুপ্রবৃত্তি জাগরিত হবে, গুনাহ করার মনোবাসনা তাদের অন্তরে বারবার জাগরিত হতে থাকবে। গুনাহর এই প্রবঞ্চনা অন্তরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা আল্লাহকে স্মরণ করবে। আল্লাহর ভয় তাদের অন্তরকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে দিবে। বান্দাহর এই ইবাদতই আল্লাহর দরবারে বেশ মূল্যবান। এর প্রতিদান ও বদলা দেয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা এত বিশাল জান্নাত বানিয়ে রেখেছেন।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এমন পরিবেশে ইবাদত করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দিন।
লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট জামে মসজিদ, রাজশাহী