রাউধা হত্যা মামলা : কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আলামত গোপনের অভিযোগ || সহপাঠী সিরাতের পাসপোর্ট জব্দ, রাউধার লাশ তোলা হবে আজ

আপডেট: এপ্রিল ২০, ২০১৭, ১:২৭ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক



পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের ছাত্রী মালদ্বীপের নাগরিক  রাউধা আতিফের লাশ আজ বৃহস্পতিবার কবর থেকে তোলা হবে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ডা. রক্তিম চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে রাউধা আথিফের বাবা মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় রাজশাহী ইসলামি ব্যাংক মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আলামত গোপনের অভিযোগ করেছেন।
বুধবার বিকালে রাজশাহী সিআইডির কার্যালয়ে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে রাউধার বাবা মোহাম্মদ আথিফ এ অভিযোগ করেন বলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আসমাউল হক জানান।
তিনি বলেন, তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রাউধার বাবা মামলার বাদি আথিফের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে রাউধা খুন হওয়ার সন্দেহের বিষয় উল্লেখ করেছেন তিনি।
“তাছাড়া সাক্ষ্যে তিনি মারা যাওয়ার এক সপ্তহ আগে সহপাঠী সিরাত পারভীন মাহমুদ ঘুমের ট্যাবলেট মিশিয়ে রাউধাকে জুস খেতে দিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে ও পরের দিনের সিসিটিভির ফুটেজ কলেজ কর্তৃপক্ষ দেখালেও ওই রাতের ফুটেজ গায়েব করে দেয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি।”
রাউধার লাশ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে ছিল এবং দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে লাশ নামানো হয়েছে বলে কলেজ কর্তৃপক্ষ জানালেও এর কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি বলে আথিফ তার সাক্ষ্যে জানিয়েছেন বলে সিআইডির এ কর্মকর্তা জানান।
সাক্ষ্যের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, “কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, রাউধাকে ঝুলতে দেখে সিরাত পারভীন একাই তার রুমে প্রবেশ করে লাশ নামিয়েছেন। এর পর পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
“মৃত্যুর আগে রাত ১১টার দিকে সিরাত পারভীনকে নিয়ে রাউধা ওই হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিল, কিন্তু কলেজ বলছে রাউধা একাই চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিল।”
এছাড়াও গলায় যে দাগ রয়েছে সেটি আত্মহত্যার নয় বলে দাবি করেছেন রাউধার চিকিৎসক বাবা আথিফ।
গত ২৯ মার্চ হোস্টেলের ওই কক্ষ থেকে রাউধার লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ জানিয়েছিল, সিলিং ফ্যানের সঙ্গে কাপড় বেঁধে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ২০ বছর বয়সী ওই তরুণী।
অন্যদিকে, রাউধা হত্যা মামলার আসামি তার কাশ্মিরি সহপাঠীর পাসপোর্ট জব্দ করেছে সিআইডি পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজশাহী সিআইডির পরিদর্শক আসমাউল হক বুধবার জানান, গত ১৫ এপ্রিল মামলার একমাত্র আসামি তার সহপাঠী সিরাত পারভীন মাহমুদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। একইসাথে সিরাতকে কলেজ না ছাড়তে নির্দেশ দেয়া হয়েছেÑ জানান তিনি।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ডা. রক্তিম চৌধুরী জানান, লাশ তোলার সময় তাকে উপস্থিত থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) সুব্রত পাল। বুধবার দুপুরেই তিনি এ সংক্রান্ত কাগজপত্র হাতে পেয়েছেন। তিনি বৃহস্পতিবার সকালে লাশ তোলার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ডা. চৌধুরী জানিয়েছেন, লাশ তোলার সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকেও উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। তিনিই লাশ তোলার সব আয়োজন করছেন। তবে রাউধার লাশের কোথায় ময়নাতদন্ত করা হবে তা জানাতে পারেননি তিনি।
গত ২৯ মার্চ রাজশাহীর নওদাপাড়ায় ইসলামী মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী হোস্টেল থেকে রাউধার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রাউধা এ কলেজের এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। রাউধা ছিলেন মালদ্বীপের একজন উঠতি মডেল। মাত্র একুশ বছরের রাউধার ছিল আন্তর্জাতিক খ্যাতি।
রাউধার লাশ উদ্ধারের দিন কলেজ কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানিয়েছিল, তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এ ঘটনায় ওই দিনই কলেজ কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে নগরীর শাহমখদুম থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে। এরপর রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গে রাউধার লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। ময়নাতদন্তে তিন সদস্যর একটি মেডিক্যাল বোর্ডও গঠন করা হয়েছিল।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাউধা আত্মহত্যা করেছেন। পরে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে রাউধাকে রাজশাহী নগরীর হেতেমখাঁ কবরস্থানে দাফন করা হয়। এরপর মালদ্বীপের দুই পুলিশ কর্মকর্তা রাজশাহীতে এসে ঘটনা তদন্ত করেন। দেশে ফিরে গিয়ে তারা জানান, রাউধাকে হত্যার কোনো প্রমাণ তারা পাননি।
রাউধার মৃত্যুর ঘটনায় কলেজের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সে কমিটিও তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, রাউধা আত্মহত্যা করেছেন। তবে গত ১০ এপ্রিল রাউধার বাবা ডা. মোহাম্মদ আতিফ রাজশাহীর আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর থেকে তিনি রাজশাহীতেই অবস্থান করছেন। হত্যা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, রাউধাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এ মামলায় রাউধার সহপাঠী সিরাত পারভীন মাহমুদকে (২১) একমাত্র আসামি করা হয়েছে। সিরাতের বাড়ি ভারতের কাশ্মীরে। সিরাতের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
সিআইডি বলছে, কেবল হত্যার প্রমাণ মিললেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। তবে তাকে নজরদারির ভেতরে রাখা হয়েছে।
রাউধার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলাটি তদন্ত করছিলেন শাহমখদুম থানার পরিদর্শক আনোয়ার আলী তুহীন। আর অপমৃত্যুর মামলাটি তদন্ত করছিলেন রাজশাহী মহানগর ডিবি পুলিশের পরিদর্শক রাশিদুল ইসলাম। রাউধার মৃত্যুর কারণ উৎঘাটনে তার কক্ষ থেকে জব্দ করা ল্যাপটপ ও মোবাইলের ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সেগুলো সিআইডির পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছেন রাশিদুল ইসলাম।
সে প্রতিবেদন এখনও ঢাকা থেকে আসেনি। এরই মধ্যে গত ১৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে দুই মামলায় সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। সিআইডির পরিদর্শক আসমাউল হক মামলা দুটি তদন্তের দায়িত্ব পান। দায়িত্ব পেয়েই তিনি রাউধার লাশের পুনরায় ময়নাতদন্তের উদ্যোগ নেন।
রাউধার লাশ কবর থেকে তুলতে সিআইডির এই কর্মকর্তা গত রোববার আদালতে আবেদন করেন। এরপর গত মঙ্গলবার লাশ তোলার জন্য আদালতের অনুমতি মেলে।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ, রাইজিংবিডি