রাজনীতিক ষড়যন্ত্র রুখতে হবে

আপডেট: জুলাই ১৮, ২০১৭, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


রাজনীতি করা কোনো খারাপ কাজ নয়। আবার খারাপ কাজ যদি কেউ মনে করেন, তারপরও রাজনীতি বিমুখ কেউ নয়। অবশ্য কেউ যদি রাজনীতি ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের লক্ষ্যে করে, সেটা কতোটা গ্রহণযোগ্য তা-ও দেশবাসীই মূল্যায়ন করবে। জনগণই সকল শক্তির আধার। তাই সে সূত্রে বলা যায়, স্বল্প কথায় বলা যায়, স্বার্থপর-সুযোগ সন্ধানীদের রাজনীতি জনস্বার্থ বিরোধী। দেশ বিরোধী তো বটেই। আমাদের দেশে অপরাজনীতির ধারাবাহিকতা নতুন কোনো বিষয় নয়। ইংরেজ শাসনামলেও এমন দল ও নেতার সাক্ষাৎ মেলে যারা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের লক্ষ্যে রাজনীতিতে নাম লিখিয়ে এবং ভোগ-বিলাসিতায় মেতে ওঠে। আজকেও আমাদের পরিপার্শ্বজুড়ে সুলভে তাদের দেখা মেলে। কিন্তু তারা রাজনীতির নামে যে আশায় দেশ ও মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়ন বিরোধী দুষ্কর্ম করে তার জন্যে হয় তো জনগণের ভোগান্তি, দেশের উন্নয়নমূলক কাজেরও হয় বিঘœ সৃষ্টি।
তার একটি দৃষ্টান্ত এখানে দেয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না। এই যে রাজনীতিক স্বার্থ হাসিলের জন্যে কোনো দল বা নেতা সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন গড়ে, তারা কতোটা দেশের প্রতি অনুগত ও দায়বদ্ধ? পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বেছে বেছে দরিদ্র ও তরুণদের তার সঙ্গে যুক্ত হতে পরজগতের সুখ-সমৃদ্ধি আর শান্তির লোভ দেখিয়ে ধর্ম রক্ষার নামে নিরাপরাধ কিংবা ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর বোমাবাজি, অপহরণ নাটক তৈরি করে। নিজেরা লিখতে-পড়তে ভালো জানে না বলে অন্য কাউকে সুস্থ ও প্রগতির ধারার মত প্রকাশের সুযোগ না দিয়ে মুরতাদ কিংবা কাফের ঘোষণা করে দিনে-দুপুরে এবং জনারণ্যে নৃশংসভাবে খুন করাএটা অপরাজনীতিরই সুলভ চিত্র। কাউকে পরজগতে চিরস্থায়ী শান্তি ও সুখের লোভ দেখিয়ে জঙ্গি তৈরি করে সন্ত্রাসী কাজের নির্দেশ দিয়ে নিজে স্ত্রী-সন্তান-স্বজন নিয়ে ইহজগতে নিরাপদে থাকা কতোটা জনকল্যাণমূলক, সে মূল্যায়ন তাদের থাকা প্রত্যাশিত। নেই। থাকলে এই ধর্মান্ধতা কবেই নির্মূল হতো। গণবিরোধ কাজে যুক্তই হতো না। মানুষের কল্যাণের-সম্প্রীতির বিরোধিতা করে কেউ কখনো কোথাও খ্যাতি পায়নি। পরজগতে কোনো সুখ-শান্তি আর সেবাদাসীও মেলে কী না কেউ সেখান থেকে ফিরে এসে তার অভিজ্ঞতার বিবরণও দেয়নি। বরং যারা মানসিকভাবে অসুস্থ তারাই এই অপকর্মে ফিপ্ত হয় এবং নিজেরাই বিপন্ন হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী আলবদর নেতাদের পরিণতি তার নক্ষত্রসম দৃষ্টান্ত।
জঙ্গির খতিয়ানভুক্ত হয়ে, মানবতাবিরোধী অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার অর্থই ঝুঁকিপূর্ণ জীবন যাত্রা। দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যখন জঙ্গিদের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের প্রতিরোধ করে, তখন অধিকাংশ সময়ই দুই পক্ষের মধ্যে চলে সশস্ত্র প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা অসম। দুর্বল শক্তি ও মানসিকতার সঙ্গে সবলের  সশস্ত্র লড়াই। তাই মুষ্টিমেয় কয়েকজন সশস্ত্র জঙ্গি প্রশিক্ষিতদের আক্রমণে টিকতে পারে না। তারা হয় আত্মসমর্পণ করে, নয়তো সবল-প্রশিক্ষিতদের আক্রমণে নিহত-আহত হয়। অথবা অবস্থা প্রতিকূল বুঝে নিজেরা আত্মঘাতী হয়। তার ফলে জঙ্গির স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবা এমন কি আত্মীয়রা পড়ে মহাবিপর্য়য়ের মধ্যে। তারাও থাকে সন্দেহ তালিকার খতিয়ানভুক্ত। অথচ যে নেতা বা দল এই জঙ্গিয়ানে সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছিলো, সে থাকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। থাকে ভদ্র-ভালো মানুষের ছদ্মাবরণে। তাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনির কেউ জানে না, বোঝে না। চেনে না। নয়তো বিপুল অঙ্কের পারিতোষিক নিয়ে তাকে নিরাপত্তা দিয়ে রক্ষা করে। এটা কি কোনো আদর্শের দৃষ্টান্ত? নাকি সবটাই নিজের প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠার গণবিরোধী কার্যক্রম? ধর্ম কি নির্দেশ দিয়েছে ভিন্ন মতাবলম্বী কাউকে হত্যা করলে পরজগতে সুখ-বিলাসিতা মিলবে? নাকি ইহজগতেই সব মেলে? কোন্টা সঠিক প্রজ্ঞাবানেরাই তার সদুত্তোর দিতে পারবেন। এমন কি যারা জঙ্গি সৃষ্টি করে, করে মানবতা বিরোধী দুষ্কর্ম, তারা কিন্তু বিষয়টা জানে ও বোঝে। কিন্তু তাতে তার তো কোনো ক্ষতি হয় না। তার সন্তান-প্রিয়জন কেউ মানুষ বিরোধী অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত নেই। মওদুদীর ছেলে বাংলাদেশে এসে সে সত্যটাই বলেছিলেন। তিনি কখনো জামাতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তার পিতা যা করেছিলেন, সেটা ¯্রফে ধর্মের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের বিরোধিতা। ধর্মের অবমাননা। তাই তাদের প্রতিরোধ ও নির্মূলের দায়িত্ব দেশপ্রেমী এবং মানবতাবাদীদেরই দায়িত্ব। বাংলাদেশ মনে হয় এখন সে কাজটি করছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত রেখে সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে।
এটা একটা দিক। অপরটি অনেকেই সমাজ-রাষ্ট্রে আছেন, যারা বিদ্যায়-বুদ্ধিতে অতলস্পর্শী, তাদেরও কেউ কেউ এমন দুষ্কর্মে লিপ্তযার সঙ্গে মানুষের কোনো স্বার্থ কিংবা দেশের কল্যাণ-উন্নয়ন যুক্ত নয়। এই যে ফরহাদ মজহারের অপহরণ নাটক। বিএনপি নেতাদের হারিয়ে যাওয়া এবং অন্য দেশে গ্রেফতার হওয়াএ সব কিসের আলামত? আর এটা কি রাজনীতি? এই নাটকের পেছনে কোনো শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত অনুভূত হয় কি? যদি তা না হয়, তাহলে এদের জন্যে দেশবাসীর তো কোনো সমর্থন ও সহানুভূতি থাকার কথা নয়। থাকলে ভাবতে বাধা নেই যে, তারাও দেশময় নৈরাজ্য সৃষ্টি, সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে ওঠ্-বোস্ করাসহ মানবতাবিরোধী সকল অপরাধমূলক কাজের সমর্থক। পৃষ্ঠপোষক ও মদদদাতা। দেশে এখন এদের সংখ্যা খুব কম নয়। নির্বাচন হলে এরাই দেখবেন মোটা অঙ্কের ভোটারের দৃষ্টি কাড়বে। মানুষ সস্তায় ও ভিক্ষেয় পাওয়া চাল উপাদেয় না অনুপাদেয় সে বিবেচনা করে না। করলে ওদের তো সমর্থকই থাকার কথা নয়। আমরা সবাই দেশপ্রেমিক, কেউ কেউ তো নির্লজ্জের মতো মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও তালিকাভুক্ত হয়ে মাসে মাসে রাষ্ট্রের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তারাও সৎ এবং মানবপ্রেমিক? তাদের ওপর ভরসা করা যায়? দেশ তাদের নেতৃত্বে নিরাপদ কি? এ রকম শত শত প্রশ্নবানে দেশের সচেতন মানুষ ক্ষত-বিক্ষত। তারা এদের দুষ্কর্মে আতঙ্কিতও। কিন্তু সাহসী যে কেউ এই স্বার্থান্ধদের জনগণের সামনে পরিচয় করিয়ে দেন, করেন তাদেও কুৎসিৎ মুখোশ উন্মোচন। আর তখনই তাকে মুরতাদ-কাফের ঘোষণা করে খুনের ছক আঁকা হয়। এই সব নেতা এবং তাদের কিছু বিত্তবান সমর্থক গোপনে ও প্রকাশ্যে তাদের অর্থায়ন করে, থাকা-খাওয়ার উদ্যোগ নেয়। অনেক বুদ্ধিজীবী আছেন, যারা আবার ’ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র মতো চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যম-িত। মুক্তিযুদ্ধ পর হঠাৎ গজিয়ে ওঠা রাজনীতিক দল, শ্রেণিশত্রু খতমের পার্টি, ‘হলি ডের মতো পত্রিকা এই মদদাতাদের পুরোধা ছিলো। তাদের কেউ কেউ ভুল বুঝতে পেরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কেউ কেউ আবার ‘ওপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট’। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও সংগঠনসহ সহযোগীদের বিরোধিতা মানে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পুনর্বাসনের প্রকল্প বাস্তবায়ন। যেহেতু বায়াত্তরে ধর্মান্ধ পরাজিতরা আত্মগোপন করেছিলো, সেহেতু তাদের অনুপস্থিতিতে তাদেরই অর্থ ও অস্ত্র নিয়ে দেশময় নৈরাজ্য সৃষ্টি, পাটের গুদামে আগুন, রেল লাইন উপড়ে ফেলা, গ্রামের কৃষককে ‘শ্রেণিশত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের হত্যা করাএ সবই আজকে দেশবিরোধী দুষ্কর্ম হিসেবেই প্রতীয়মান। আর তাদের সৃষ্ট অপরাজনীতির পথ ধরে আজকের সশস্ত্র জঙ্গির ভয়াবহ আত্মপ্রকাশ। এদের জন্যেই প্রফেসর হুমায়ুন আজাদকে, প্রকৌশলী দিপন, ড. অভিজিৎ রায় প্রমুখকে এ নৃশংসভাবে খুন হন। প্রগতিশীল যে কোনো কর্মকা-কে ধর্মবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রকাশ্যে নয়, গোপনে অপপ্রচারে এবং সশস্ত্র আক্রমণের আয়োজন করে। যাকে তাকে ‘অমুসলিম’ হিসেবে ঘোষণা দেয়ার দাবি জানায়। বিধর্মীর খতিয়ানভুক্ত করে। যেমন পহেলা বৈশাখের কিংবা বাঙালির যে কোনো অসাম্প্রদায়িক চেনতার কর্মসূচিকে তারা ধর্মের বিধি-নিষেধ পরিপন্থি হিসেবে ফতোয়া দিয়ে জনমনকে বিভ্রান্ত করে। সৃষ্টি করে আতঙ্ক। সামাজিক বিভাজন এবং নৈরাজ্য। এটাও দেশ বিরোধী, মানুষ বিরোধী জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতিক দলের নেতা-নেত্রীদেরই ক্ষমতার স্বপ্ন দেখার মতো একটি অবাস্তব উদাহরণ। পৃথিবীর কোনো দেশের উৎপীড়কেরা শেষ পর্যন্ত সাফল্য পায়নি। বরং ক্রমান্বয়ে জনবিচ্ছিন্ন হতে হতে তাদের অন্ধকারে আশ্রয় নিতে হয়েছে। দেখুন ফ্রাঙ্কো-হিটলার-মুসোলিনির পরিণতি। পর্যালোচনা করুন নিজামী-সাঈদী আর অপরাপর যুদ্ধাপরাধীদের অন্তিম অবস্থা। অথচ তারা ইচ্ছে করলেই মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মানবতার সেবায় জীবন উৎসর্গ করতে পারতেন। জনগণকে বঞ্চিত-লাঞ্ছিত করে নিজের ভোগ-বিলাসিতার স্বপ্ন, লোভ সংবরণ করতে ওরা জানে না। অহমিকা আর নিজেকে সমাজের শ্রেষ্ঠ ভাবতেই তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আর এটাই তাদের পরাজয় ও বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। ফরহাদ মজহারের অপহরণ নাটকের উৎকর্ষতাও এখানে নিহিত। তার মেধা ও বুদ্ধি যদি মানুষের কল্যাণের পক্ষে ব্যয় হতো, তিনি নন্দিত হতেন। তা যে হচ্ছেন না, তার দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে দেশময়। এদের দুষ্কর্ম-বিভ্রান্তি থেকে জাতিকে মুক্ত করতে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে সরকারের সকল অর্জন, সকল শুভ উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হবে। যেমন হচ্ছে হেফাজতিদের সঙ্গে আঁতাতের বিপরীতে। সামনের বছর নির্বাচন। এই নির্বাচনে দেশবিরোধী অপ-রাজনীতিকে পরাজিত করে রাষ্ট্র পরিচালনায় ও বিরোধী দলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তির জয়ের প্রত্যাশায় রয়েছে সমগ্র জাতির। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নেতা-কর্মী ও দলগুলোকেও জনসাধারণের এই আকাক্সক্ষাকে অনুধাবন এবং আত্মস্থ আর সম্মান জানাতে হবে নিজেদের কাজের আলোকে।