রাজনীতি নিষিদ্ধ করা নয়-প্রয়োজন সংস্কার

আপডেট: অক্টোবর ১৭, ২০১৯, ১:৪১ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


সম্প্রতি বুয়েট ছাত্রের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাজনীতি বন্ধ করা কোনো সমাধান হতে পারে না। এটা হচ্ছে মাথা ব্যথা হলে ব্যথা নিরাময়ের চেষ্টা না করে মাথা কেটে ফেলার সামিল। সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে এ ঘটনার জড়িত ১৯ জন শিক্ষার্থীকে। তদন্ত করে তাদের স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে। বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, বুয়েটে র‌্যাগিং বন্ধ করা হবে। শুধু তাই নয়, অতীতে যেসব অত্যাচার নির্যাতন চালানো হয়েছে তার বিচার হবে। তিনি আরো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আবরার হত্যা মামলার খরচ বুয়েট বহন করবে এবং আবরারের পরিবার চাইলে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা দাবি মানা না পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয়, সুস্থ ধারায় ফেরাতে হবে রাজনীতিকে। আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে যেমন গণতন্ত্র আছে। ছাত্র রাজনীতিতেও গণতন্ত্রের চর্চা থাকা আবশ্যক। যেখানে সকলের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার থাকবে। লেজুড়বৃত্তি করার রাজনীতি এখন দৃশ্যমান। এ লেজুড়বৃত্তি ছাত্র রাজনীতিকে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি কিংবা মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করছে। এটা রাজনীতি নয়- অপরাজনীতি। অপরাজনীতিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে রাজনীতি বন্ধ করে দেবার ফল আখেরে ভালো হবে না।
অতীতের গৌরবময় ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটা বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যায়, স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্ররাই নেতৃত্ব দিয়েছে। ছাত্র রাজনীতি নষ্ট হয়েছে মূলতঃ স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে। তবে কোনো সময়ে ঠিক এরকম অরাজকতা ছিল না। এখনকার রাজনীতিতে পরমতসহিষ্ণুতা কিংবা ধৈর্য্যরে বিষয়টি প্রায় অনুপস্থিত। ফলে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি নেই বললেই চলে। যে কোনো ইস্যুতে রাজনৈতিক নেতাদের ভেতরে মতপার্থক্য থাকাতেই পারে। তবে সে মতপার্থক্য রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করা যায়। সেজন্য পেশীশক্তির প্রয়োগ করার প্রয়োজন হয় না। সুতরাং, রাজনীতি বন্ধ করে কোনো সমাধান হবে নাÑ ছাত্র-রাজনীতিতে যে অপসংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে সেটি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নির্ভর হতে হবে। এজন্য দরকার ছাত্র নির্বাচন। নির্বাচনের মাধ্যমে যাঁরা প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে তাদের জবাবদিহিতা থাকতে হবে এবং সেটি নিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র হলগুলোতেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়েও নিয়মিত নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকা দরকার।
বুয়েটের শেরেবাংলা হলে যখন আবরার ফাহাদ নামের নিরীহ ছেলেটির উপর একটানা ৬ ঘণ্টা নির্যাতন চালানো হয় তখন তার নিরাপত্তার জন্য তাকে সাহায্য করবার জন্য হল কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা পুলিশ কেউ এগিয়ে আসেনি। মানবিকতার কী অবক্ষয়! আবরার হত্যার পর বিভিন্ন মহল থেকে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি উঠেছে। তারই ফলশ্রুতিতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলো। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয়- একে কলুষমুক্ত করতে হবে। হল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ নেতৃত্ব নির্বাচিত করে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। কেউ কেউ মনে করেন, আরবার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। কতগুলো দুর্বৃত্ত দলের নাম ভাঙ্গিয়ে সাধারণ ছাত্রদের অত্যাচার করে, নির্যাতন করে। এখানে অত্যাচারের মাত্রাটি বেশি হওয়ায় আবরারের মৃত্যু হয়েছে। এরা ছাত্রনেতা হতে পারে না, এরা অপরাধী।
বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে হলে সুস্থধারার রাজনৈতিক চর্চা প্রয়োজন। যারা ছাত্রদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ছাত্র রাজনীতি করবে। পেশীশক্তির দাপট দেখিয়ে কাউকে হয়রানির শিকার করবে না। র‌্যাগিং-এর নামে বিকৃত রুচির পরিচয় দেবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সহনশীল হওয়া উচিৎ। তারা সচেতন হবে, পরস্পরের ভেতর ভাবের আদান প্রদান করবে, চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটাবে, মেধার চর্চা করবে, রাজনীতি সচেতন হবে। এখন আমরা দুঃখের সাথে লক্ষ্য করি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মতদ্বৈততার কোনো স্থান নেই। কেউ ভিন্ন মত প্রকাশ করলে তাকে এমন শিক্ষা দেওয়া হয় যে সে আর ওই পথে যায় না কোনোদিন।
পত্রিকান্তরে কেউ কেউ এমন মত প্রকাশ করেন যে, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলে বিপদ আরো বাড়বে। রাজনীতিতে গণতন্ত্র না থাকলে জঙ্গিবাদের উত্থান হবে। ছাত্র রাজনীতিকে শুদ্ধ করতে হলে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন সে দলের ছাত্র সংগঠনের দখলে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়-এ অপরাজনীতি বন্ধ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধুমাত্র সরকারি দলই নয়, সব দলের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। পরমতসহিষ্ণুতার পরিবেশ সৃষ্টি ও তার চর্চা করতে হবে। ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করবে। সাধারণ ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় বুয়েটে বছরের পর বছর নির্যাতন চলেছে। কেউ ভয়ে মুখ খোলেনি, প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে ওঠে নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে দুর্বৃত্তায়ন নিশ্চিহ্ন করতে গণতান্ত্রিকভাবে সাধারণ ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
সুতরাং, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয়-রাজনীতিকে আবর্জনামুক্ত করা দরকার। যে অপসংস্কৃতি ছাত্র-রাজনীতিকে কলুষিত করছে সে অপসংস্কৃতি বন্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ছাত্র-রাজনীতিতে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে এনে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা রাখতে হবে। অন্যায় করলে দলমত নির্বিশেষে তার শাস্তির বিধান রাখতে হবে। ছাত্র-রাজনীতি হবে ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে। সংস্কার করা হোক ছাত্র-রাজনীতির।