রাজশাহীতে উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতন

আপডেট: জানুয়ারি ২৪, ২০১৭, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ

সালীমা সারোয়ার


১৫ নভেম্বর ২০১৬ : মঙ্গলবার, পড়ন্ত বিকাল বেলা। রাজশাহী মহানগরীর মতিহার থানার শাহাপুর পশ্চিমপাড়া এলাকার মুক্তার আলীর বাড়িতে শোকের মাতম। কারণ তার ৭ম শ্রেণি পড়–য়া মেয়ে উম্মে মারিয়া সম্পা (১৩) নিজ ঘরে সহপাঠি বর্ণা খাতুন (১৩)সহ আত্মহত্যা করেছে। দীর্ঘ দিন ধরে তাদেরকে স্থানীয় দু’যুবক যৌন হয়রানি করলেও পরিবার বা সমাজ কোন ব্যবস্থা নেয় নি। ওই দিন প্রাইভেট শেষে বাড়ি ফেরার পথে তারা আবারও যৌন হয়রানির শিকার হয়। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও বিচারহীনতার অভিমানে দু’জনেই বাড়িতে ফিরে ঘরের তীরের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।
এভাবেই সারা দেশের ন্যায় রাজশাহী জেলায় নিরাপদ পরিবেশ, আইনের কার্যকারিতা ও ক্ষমতায়ন- এ তিনের অভাবে প্রতি বছর নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা বেড়েই চলেছেÑ যা এ অঞ্চলের সার্বিক অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তাই আমরা মনে করি যে, এ অঞ্চলের টেকসই ইতিবাচকতার জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে নারী ও শিশুর প্রতি হওয়া সকল প্রকার নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। কেননা, নারী ও শিশুর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে এ অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
এ অঞ্চলের নারী ও শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংগঠন এ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডি’র জরিপ অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় ২০১৬ সালে ২৭৫ জন নারী ও ২৩০ জন শিশু বিভিন্ন প্রকার নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়। যা ২০১৫ সালের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ গত বছর এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২০১ জন নারী ও ২৪৮ জন শিশু। এসব ঘটনার সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, ২০১৬ সালে মহানগরীতে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটেছে এবং সংগঠিত ঘটনাগুলোর মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ, যৌতুকের জন্য মারপিট, যৌন হয়রানি ইত্যাদির আধিক্য বেশি। জেলায় এ বছর ২৭৫টি নারী নির্যাতনের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মহানগরীর চারটি থানায় সংগঠিত হয়েছে ৯৫টি। মহানগরীর বাইরের নয়টি থানায় সংঘটিত হয়েছে ১৮০টি নির্যাতনের ঘটনা। এর মধ্যে বাগমারায় ২০টি, বাঘায় ২২টি, মোহনপুরে ৩৪টি, পুঠিয়ায় ১৪টি, চারঘাটে ১৬টি, গোদাগাড়ীতে ২২টি, পবায় ১৪টি, দুর্গাপুরে ২৪টি এবং তানোরে ১৪টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যে হত্যা ১৪টি, হত্যার চেষ্টা ২৩টি, রহস্যজনক মৃত্যু ৮টি, ধর্ষণ ১৩টি, ধর্ষণের চেষ্টা ৭টি, পাচার ৫টি, অপহরণ ১টি, আত্মহত্যা ৪১টি, আত্মহত্যার চেষ্টা ১৬টি, যৌন হয়রানী ৩২টি এবং অন্যান্য ১১৫টি (যেমন-মারপিট) ঘটনা ঘটেছে। আর, একই সময় শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ২৩০টি। এর মধ্যে মহানগরীতে সংগঠিত হয়েছে ৬২টি এবং মহানগরীর বাইরের নয়টি থানায় সংঘটিত হয়েছে ১৬৮টি। এদের মধ্যে বাগমারায় ২০টি, বাঘায় ২৩টি, মোহনপুরে ২১টি, পুঠিয়ায় ১২টি, চারঘাটে ০৬টি, গোদাগাড়ীতে ৩১টি, পবায় ১৬টি, দুর্গাপুরে ২১টি এবং তানোরে ১৮টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যে হত্যা ১৩টি, হত্যার চেষ্টা ৩৫টি, রহস্যজনক মৃত্যু ৩টি, ধর্ষণ ৩৫টি, ধর্ষণের চেষ্টা ৭টি, পাচার ৪টি, অপহরণ ১৯টি, আত্মহত্যা ২৯টি, আত্মহত্যার চেষ্টা ৭টি, যৌন হয়রানি ২৯টি ও অন্যান্য ৪৯টি ঘটনা ঘটেছে।
সদ্য সমাপ্ত ২০১৬ সালে এ জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা অন্য যে কোন বছরের তুলনায় অনেক বেশি ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যে আলোচিত কয়েকটি ঘটনা হলো- পবায় স্বামী কর্তৃক পপি রানীকে (৪৫) পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা, নগরীর হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনালে সোমাইয়া ইয়াসমিন (২০) বন্ধুসহ খুন, যৌতুকের জন্য নগরীতে স্বামী-স্বজন কর্তৃক রিফাহ্ তাসফিয়া সালামকে (২১) বেধড়ক মারপিট ও নির্যাতন, পবায় মোবাইল চুরির অভিযোগে দুই শিশুকে বেধড়ক মারপিট ও নির্যাতন, চারঘাটে পুলিশ কনস্টেবল মিনহাজুল ইসলাম যৌতুকের জন্য স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা শারমিনকে নির্যাতনের পর শ্বাসরোধে হত্যা, মতিহার থানার শাহাপুর পশ্চিমপাড়ায় যৌন হয়রানির জেরে বর্না খাতুন (১৩) ও উম্মে মারিয়া সম্পা (১৩)’র এক সাথে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা, গোদাগাড়ীতে খালেদা খাতুনকে (১৪) বাড়িতে একা পেয়ে স্কুলের গ্রন্থাগারিক শহিদুল ইসলাম (৩৮) ধর্ষণ এবং দীর্ঘ দিন পরেও বিচার না পেয়ে অপমান বোধে ভিকটিমের বিষপানে আত্মহত্যা ইত্যাদি।
রাজশাহী জেলায় নারী ও শিশুদের প্রতি হওয়া নির্যাতন-সহিংসতার নানাবিধ কারণ আছে। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৬ বছর পরও রাজশাহীর সমাজ ব্যবস্থা হাজারো সমস্যা জর্জরিত এবং পশ্চাদগামী। হাজারো উন্নয়ন প্রচেষ্টা চালানোর পরও প্রত্যাশিত উন্নয়ন না হওয়ার জন্য যে সব বিষয়কে দায়ী করা হয় নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা তাদের মধ্যে অন্যতম। সমাজ ব্যবস্থার নানা ক্রুটির কারণে সমাজে নারী ও শিশুর যৌক্তিক অধিকারহীনতা, ক্ষমতায়নহীনতা ও ন্যায় বিচার প্রাপ্তিহীনতার দরুণ দিন দিন তাদের প্রতি সহিংসতা বেড়ে চলেছে, তেমনি এরূপ সহিংসতায় যুক্ত হচ্ছে নবতর ও মারাত্মক কৌশল। এ অঞ্চলের নির্যাতনের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। যথা- এ জেলায় নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার প্রধানতম কারণ হলো সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও নৈতিক অবক্ষয়। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে নতুন প্রজন্মের তরুণ সমাজ নিজের রীতিনীতি বিরুদ্ধ কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে, এতে তাদের নৈতিক অবক্ষয় হচ্ছে। সমাজে নারী ও শিশুকে মানুষ হিসেবে ভাবা হচ্ছে না। ফলে সমাজে তাদের প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারীর ক্ষমতাহীনতার প্রভাবে সমাজে নারীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে তারা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ সুযোগে নারী ও শিশুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাদের নিরাপত্তাহীনতা ঘরে-বাইরে সর্বত্র। ফলে সমাজে তাদের প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রভাবে সমাজে তাদের প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরূপ ঘটনার নির্যাতিতরা মামলা করলেও বিচারের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। এসময়ে অপরাধীরা নানা হুমকি-ধামকি দিয়ে নির্যাতিতকে আরও চাপে ফেলে দেয়। ফলে আপস করতে বাধ্য হয়। যা একটি নির্যাতনের দুষ্টচক্র তৈরি করেছে। এছাড়াও গরম আবহাওয়া, মাদকাসক্তি, বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অনুপস্থিতি ও ক্ষমতার দাপট ইত্যাদি নানা কারণে বাংলাদেশে নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সমাজে নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা বেড়েই চলছে।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজে নারী ও শিশুদের চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। এ অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিশু নির্যাতনের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ফলে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকরা বেশ উদ্বিগ্ন। এমনকি নারীরা নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ফলশ্রুতিতে সার্বিক ইতিবাচক কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে পড়েছে। এ কথা স্পষ্ট যে, রাজশাহী জেলায় নারী ও শিশুর প্রতি পারিবারিক সহিংসতার পরিমাণ অনেক বেশি। আমরা মনে করি যে, সার্বিক অগ্রগতির জন্য এ অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ জরুরি। এজন্য নারী ও শিশুর সার্বিক অধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি সকলকে সচেতন হতে হবে। সবাইকে এটা মনে রাখতে হবে যে, সমাজে নারী ও শিশুর ইতিবাচকতা তৈরি করতে না পারলে কখনোই কাক্সিক্ষত ও টেকসই ইতিবাচকতা আসবে না। তাই সরকার, জনগণ ও প্রশাসনকে কার্যকর ভূমিকা পালনের পাশাপাশি জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে এসব ঘটনার প্রবণতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে বলে আমরা মনে করি।
লেখক: উন্নয়ন ও মানবাধিকার কর্মী।