রাজশাহীতে এতো মৃত্যু কেন?

আপডেট: জুন ২২, ২০২১, ১১:০৩ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


করোনাভাইরাসের প্রতীকী

রাজশাহীতে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু কোনোভাবেই কমছে না। প্রতিদিন ১০-১২ জনের মৃত্যু হচ্ছে। একই সঙ্গে রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে। মূলত দুই কারণে রাজশাহীতে মৃত্যু বেড়েছে।
চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, প্রথমত করোনা আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তিদের শেষ সময়ে হাসপাতালে আনার কারণে মূলত বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত গ্রামের মানুষ করোনা পরীক্ষা কম করাচ্ছে। জ্বর-সর্দিতে আক্রান্ত হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই বাসায় কবিরাজি চিকিৎসা নেয়। এরা হাসপাতালে এসে অক্সিজেন নিতে নিতেই মারা যান।
রামেক হাসপাতালের তথ্যমতে, হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জন পুরুষ ও তিনজন নারী। যাদের পাঁচজনের করোনা পজিটিভ ছিল। বাকিরা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃতদের মধ্যে নয়জনের বয়স ৬১ বছর থেকে ৯৫ বছর পর্যন্ত। ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে একজন এবং ৩১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে তিনজন। গত ১ জুন সকাল ৮টা থেকে ২২ জুন সকাল ৮টা পর্যন্ত রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেছেন ২২৯ জন।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, রাজশাহীতে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা যে বেশি এটা বলা যায় না। এখন যে সংখ্যা আছে, তা স্বাভাবিক। কেন না যারা মারা যাচ্ছে তাদের অধিকাংশই বয়স্ক। কারও ৯৫ বছর, কারও ৭৫। কেউ ডায়াবেটিসের রোগী, কেউ হার্টের। এসব রোগী করোনায় আক্রান্ত হলে দুর্বল হয়ে পড়েন। এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। আবার শেষ সময়ে হাসপাতালে এসে অনেকেই অক্সিজেন নিতে নিতেই মারা যান। মূলত করোনা রোগীর মৃত্যুর অন্যতম কারণ বয়স বেশি এবং শেষ সময়ে হাসপাতালে আসা।
তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর সঙ্গে লকডাউনের সম্পর্ক নেই। সংক্রমণের ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক ফল দেয়। রাজশাহীতে যে লকডাউন দেওয়া হয়েছে, সেটা আরও আগে দেওয়া উচিত ছিল। এখন ঘরে ঘরে রোগী আছে বলা যায়। কার্যকরী লকডাউন শুরুতে দিতে পারলে ভালো হতো। একটা সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। লকডাউন যদি কার্যকর করা যায়, তবে ইতিবাচক প্রভাব আছে। সবমিলে মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে।
শামীম ইয়াজদানী আরও বলেন, করোনার নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা নেই। যা দেওয়া হচ্ছে সবগুলো ধারণার ওপর; একরকম পরীক্ষামূলকভাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটা প্রটোকল দিয়ে দিচ্ছে, সেটা ফলো করে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি। কিন্তু এই প্রটোকল তো প্রমাণিত না যে, করোনামুক্ত করতে পারবে। এজন্য মানুষকে টিকা নিতে বলা হচ্ছে, মাস্ক পরতে বলা হচ্ছে। অন্যথায় করোনা আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি করে ফেলবে।
তিনি আরও বলেন, এতদিন হাসপাতালে ১০২ জন চিকিৎসক করোনা চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন। নতুন করে ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য ১২ জনের একটি টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত চিকিৎসকের সংখ্যা আমরা বাড়াচ্ছি। নার্স ১৩টি ওয়ার্ডে প্রতি মাসে ২২ জন করে ডিউটি করছেন। শুধু আইসিইউতেই ৯০ জন নার্স আছেন। তবে একটা ইতিবাচক দিক হলো, করোনায় চিকিৎসক ও নার্সরা কম আক্রান্ত হচ্ছেন।
শামীম ইয়াজদানী বলেন, হাসপাতালে আগে ১০টা আইসিইউ ছিল। বাড়িয়ে ২০টি করা হয়েছে। যদিও চাহিদা আরও বেশি। তবে আইসিইউ হলেই রোগী বাঁচবে এমন না। রোগীর অবস্থা বেশি খারাপ হলে আইসিইউতে দেওয়া হয়। আইসিইউ দেওয়া মানে একরকম মৃত্যু। এখান থেকে খুব কম রোগী ফিরে আসে। আইসিইউ চিকিৎসার একমাত্র উপায় না। উপায় হলো প্রতিরোধ, সচেতন হওয়া।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. নওশাদ আলী বলেন, হাসপাতালে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কিছু গ্রামের, কিছু শহরের। এদের অনেকেই আক্রান্ত হওয়ার পর বাসায় চিকিৎসা নেন। অবস্থা খুব খারাপ হলে হাসপাতালে আসেন। তখন আর তাদের বাঁচানো যায় না। এখন হাসপাতালে হয়তো ৪০০ রোগী আছেন। এদের মধ্যে মারা যাচ্ছেন ১০-১২ জন। যারা দেরিতে আসছেন তারাই মারা যাচ্ছেন। অনেকেই চিকিৎকের পরামর্শের মধ্যে থাকছেন না। বাসায় হয়তো কবিরাজি কিংবা অন্য চিকিৎসা নিচ্ছেন। এজন্য তাদের বাঁচানো যায় না।
ডা. নওশাদ আলী আরও বলেন, শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। সুতরাং সবাইকে সচেতন হতে হবে। অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এতে মৃত্যু কমবে।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. মো. কাইয়ুম তালুকদার বলেন, এটা সত্য যে; রোগীর অবস্থা যখন খুব বেশি খারাপ হয়, তখন হাসপাতালে আনা হয়। আবার শহরে করোনা আক্রান্ত ও পজিটিভ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সে তুলনায় উপজেলাগুলোতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকলেও গ্রামের মানুষ পরীক্ষা কম করাচ্ছে। এক্ষেত্রে গ্রামের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত যোগাযোগের জন্য একটি টিম গঠন করা হচ্ছে। যারা রোগীদের পরামর্শ দেবে।
রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে, সোমবার (২১ জুন) রাজশাহীতে এক হাজার ৬৬৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ১৯.৫৩ শতাংশ। এদিন সিটি করপোরেশন এলাকায় এক হাজার ৩১৭টি নমুনা পরীক্ষায় ২৫৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়। জেলার নয় উপজেলা ও সিইএস অফিসসহ ৩৫২টি নমুনা পরীক্ষায় ৭৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়।
রোববার (২০ জুন) রাজশাহীতে এক হাজার ১০১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৩৭৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার ২৫.১২ শতাংশ। এদিন সিটি করপোরেশন এলাকায় এক হাজার ২০২টি নমুনা পরীক্ষায় ২৯২ জনের করোনা শনাক্ত হয়। জেলার নয় উপজেলা ও সিইএস অফিসসহ ২৯৯টি নমুনা পরীক্ষায় ৮৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়।
শনিবার (১৯ জুন) রাজশাহীতে ৭৫১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৩৩৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার ১৭.৮৪ শতাংশ। এদিন সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭৭৮টি নমুনা পরীক্ষায় ১৩৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়। জেলার নয় উপজেলায় কোনও নমুনা পরীক্ষা করা হয়নি। তবে সিএস অফিসে তিনটি নমুনা পরীক্ষার ফলাফল এখনও পাওয়া যায়নি।
রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুহাম্মদ শরিফুল হক বলেন, সংক্রমণ ঠেকাতে জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা হচ্ছে নিয়মিত। প্রয়োজনে জেল জরিমানাও করা হচ্ছে। উপজেলাতে সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, এটা ঠিক। মানুষকে সচেতনের চেষ্টা করছি আমরা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ