রাজশাহীতে গলদা চিংড়ি চাষে ঘটবে বিপ্লব ।। নির্মাণ হচ্ছে হ্যাচারি, উৎপাদনে যাবে জুনে

আপডেট: জুন ৫, ২০১৭, ১:০৯ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


নির্মাণাধীন গলদা চিংড়ি পোনার হ্যাচারি- সোনার দেশ

রাজশাহী অঞ্চলে স্বাদু পানিতে গলদা চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে। তবে সঙ্কট রয়েছে পোনার। সেই সঙ্কট এবার কাটছে। চলতি বছরের জুনের প্রথম দিক থেকে রাজশাহীতেই মিলবে গলদা চিংড়ির পোনা। বর্তমানে আধুনিক হ্যাচারি নির্মাণ করছে রাজশাহী মৎস্য অধিদফতর। এর ফলে গলদা চিংড়ি চাষে ঘটবে বিপ্লব। পাশাপাশি কার্প জাতীয় মাছের বিপরীতে গলদাচাষ করে মৎস্যচাষীরা অধিক লাভবান হবেন।
নগরীর আমবাগান এলাকার মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারেই স্থাপন করা হচ্ছে এ হ্যাচারি। অত্যাধুনিক এ হাচারি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৭৫ লাখ টাকা। চলতি বছরের মে মাসে শেষ হবে এটির নির্মাণ কাজ। এরপর জুনের প্রথম সপ্তা থেকেই শুরু হবে গলদা চিংড়ির পোনা উৎপাদন। এখানে উৎপাদিত মানসম্মত পোনা সরবরাহ হবে রাজশাহী ছাড়াও নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোরসহ আশেপাশের জেলাগুলোয়।
জেলার পুঠিয়া উপজেলার শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকা নান্দিপাড়ায় গলদা চিংড়ি চাষ করছেন ইউসুফ আলী। স্বাদু পানিতে গলদা চাষ শুরু করেছেন তিনি ২০১০ সালে। সফলতাও পেয়েছেন। এ বছর তিনি ৬৫ শতকের একটি পুকুরে গলদা চিংড়ির পোনা চাষ করেছেন।
তিনি বলেন, নাটোরের মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার থেকে প্রতি পিস ২টাকায় পোস্ট লার্ভা সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর সেগুলো পালন করেন পুকুরে। ৪০দিন পর এগুলো কিশোর চিংড়িতে পরিণত হয়। এরপর প্রতি পিস ২২ টাকা থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি করে দেন। স্থানীয় চাষিরা এসব কিশোর চিংড়ি নিয়ে গিয়ে কার্পজাতীয় মাছের সাথে মিশ্রচাষ করেন। আরো বেশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে জানান মাছ চাষে ২০১৫ সালে জাতীয় যুব পুরস্কারপ্রাপ্ত এ চাষি।
জেলার পবা উপজেলার হুজুরিপাড়া ইউনিয়নের কর্ণহারের পোনা চাষি শহিদুল ইসলাম জানান, চাষিরা তাদের কাছ থেকে কিশোর চিংড়ি সংগ্রহ করেন। ছয় মাসের মধ্যে এক একটি চিংড়ির ওজন ১২০ থেকে ১৫০ গ্রাম হয়ে যায়। প্রতিকেজি ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এসব চিংড়ি।
ওই এলাকার চিংড়ি চাষি শফিউল ইসলাম বলেন, দিন দিন গলদা চিংড়ি চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পোনার সরবরাহ নেই। এছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে পোনা চাষ হওয়ায় দামও পড়ছে বেশি। সরকারি উদ্যোগে রাজশাহীতে পোনা উৎপাদন শুরু হলে ব্যাপক ছড়িয়ে যাবে গলদা চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ।
এ বিষয়ে রাজশাহী মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের খামার ব্যবস্থাপক আবদুল খালেক জানান, বাণিজ্যিক গলদা চাষ সম্প্রসারণে রাজশাহীতে পোনা উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক হ্যাচারি নির্মাণ শুরু হয়েছে। মে মাসের মধ্যেই শেষ হবে এটির নির্মাণকাজ। এরপর শুরু হবে পোনা উৎপাদন।
তিনি আরও বলেন, পুরুষ ও স্ত্রী মাছ এনে রাজশাহীর হ্যাচারিতে পোস্ট লার্ভা উৎপাদন করা হবে। এরপর চাষিরা এগুলো নিয়ে গিয়ে কিশোর অবস্থায় বিক্রি করবেন। নির্ধারিত মূল্যে চাষিরা মানসম্মত এ পোনা সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে ব্যাপক কিশোর চিংড়ি উৎপাদনের সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, রাজশাহীর মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের তিনটি করে ব্রড পুকুর, নার্সারি ও লালন পুকুর রয়েছে। এসব পুকুরে অন্যান্য কার্প জাতীয় মাছের পোনা উৎপাদন করা হয়। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় চলে যায় এসব পোনা। এর একটি পুকুরে তারা কিশোর চিংড়ি পালনের সুযোগ পাবেন। হ্যাচারি নির্মাণ শেষ না হলে কী পরিমাণ পোস্ট লার্ভা ও কিশোর চিংড়ি এখানে উৎপাদন সম্ভব হবে তা নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি খামার ব্যবস্থাপক।
এ ব্যাপারে রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সাহা বলেন, ধীরে ধীরে রাজশাহীতে বাণিজ্যিক গলদা চিংড়ির চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে। এতে চাহিদা বেড়েছে পোনার। মৎস্য অধিদফতর বরেন্দ্রে গলদা চিংড়ির চাষ ছড়িয়ে দিতে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর একটি স্বাদু পানিতে চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ ও অন্যটি ইউনিয়ন পর্যায়ে মৎস্য চাষ প্রযুক্তি সেবা সম্প্রসারণ। গত অর্থ বছর থেকে শুরু হওয়া এসব প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে জেলার পবা, পুঠিয়া, চারঘাট, দুর্গাপুর ও বাঘায় শুরু হয়েছে গলদা চাষ। প্রদর্শনী পুকুরসহ একজন চাষি ও আরো পাঁচ বন্ধু চাষি নিয়ে চলছে এ কার্যক্রম। এসব চাষির দেখাদেখি অন্যরাও এগিয়ে আসছেন গলদা চাষে। এটি ছড়িয়ে দিতে কাজ করছেন তারা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ