রাজশাহীতে চাহিদার পাঁচগুণ উৎপাদন হলেও আলুর চড়া মূল্য মানা হচ্ছেনা না সরকার নির্ধারিত মূল্য

আপডেট: October 16, 2020, 12:17 am

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহীতে চাহিদার চেয়ে পাঁচগুন আলুর উৎপাদন হয়। তারপরও করোনাকালীন সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পন্যটি চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। এমন সময় বিভিন্ন অজুহাতে ব্যবসায়ীরা আলুর দাম বাড়াতে থাকলে আলুর উৎপাদন খরচসহ সার্বিক বিবেচনায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর আলুর মূল্যে নির্ধারণ করে দেয়। যেখানে আলুর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ টাকা। কিন্তু এই নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে রাজশাহীতে প্রতিকেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫৫ টাকা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) নগরীর সাহেববাজার, মাস্টারপাড়া, বিনোদপুর বাজার, স্টেশন বাজার, হড়গ্রাম, কাশিয়াঙ্গা বাজার ও কাটাখালী বাজার ঘুরে দেখা, বাজারগুলোতে খুচরা প্রতিকেজি আলু ৪৫ থেকে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদেরকে কোল্ডস্টোরেজে থেকে বেশি দামে আলু কিনতে হচ্ছে। বৃষ্টি আর বন্যার কারণে আলু সঙ্কট। কোল্ডস্টোরেজে খাবারের আলু কম। এখন যে পরিমাণ আলু আছে তার তিন ভাগের দুই ভাগ বীজ। তারা যদি আলুর দাম কম রাখেন তাহলে তারাও কম দামে আলু বিক্রি করতে পারবেন।
অথচ রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, রাজশাহীতে গত মৌসুমে ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করা হয়েছে। আর প্রতিহেক্টর জমিতে ২৬ মেট্রিক টন করে উৎপাদন হয়েছে। এতে রাজশাহীতে ৯ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন আলুর উৎপাদন হয়েছে। আর রাজশাহীতে আলুর চাহিদা হলো প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। রাজশাহীতে চাহিদার তুলনায় ৫ গুন আলুর আবাদ হয়ে থাকে।
এদিকে, জেলার পবা ও তানোর উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানেও চড়া দমেই আলুর বেচাকেনা হয়েছে। কোল্ডস্টোরেজগুলোতেও মানা হচ্ছেনা সরকার নির্ধারিত মূল্যে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে আলুর বেচাকেনা নিশ্চিত করতে কোল্ডস্টোরেজগুলোতে অভিযান পরিচালনা করতে দেখা গেছে প্রশাসনকে।
পবা উপজেলায় উত্তরা কোল্ডস্টোর ও আসমা কোল্ডস্টোরস লিমিটেডে দেখা যায়, অ্যাক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কৌশিক আহমেদ রাজকে। তিনি উপজেলার বিভিন্ন কোল্ডস্টোরগুলোতে গিয়ে আলুর দাম নির্ধারণের বিষয়টি জানান। এ সময় তিনি কোল্ডস্টোরে ২৩ টাকা, পাইকারিতে ২৫ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৩০ টাকা দরে বিক্রির নির্দেশ দেন। তিনি জানান, সরকারি নির্দেশিত দামে আলু বিক্রি করতে হবে। অন্যথায় ভোক্তা অধিকার আইনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, দাম নির্ধারণের পর থেকে আলু বিক্রয় করতে কোল্ডস্টোরেজে যাচ্ছেনা তানোরের চাষিরা। কয়েকদিন ধরে তানোর উপজেলার পাঁচটি কোল্ডস্টোরেজে কোন আলু বেচাকেনা হয়নি।
আলু চাষি মোহাম্মাদ আলী জানান, বিগত বছরগুলোতে লোকসান হয়েছে। আলু বেচাকেনা করে কোল্ডস্টোরেজের ভাড়া দিতে পারিনি। তখন কৃষি বিপনণ আমাদের খোঁজখবর নেয়নি।
রহমান কোল্ডস্টোরেজের এজিএম আবদুল হালিম জানান, গতবছরে আলুর দাম না পয়ে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। এবছর কিছুটা হলেও ক্ষতি পুশিয়ে নিতে পারছেন। সেই সাথে আগামীতে আবারো আলু রোপনের আগ্রহ বাড়তে পরে বলে তিনি মনে করেন।
রাজশাহী কোল্ডস্টোরেজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান জানান, দেশে গত বছর আলু উৎপাদন হয়েছে ৮৫ লাখ মেট্রিক টন। যা বিগত বছরের তুলনায় ৩০ লাখ মেট্রিক কম। অথচ গত আলুর মৌসুমে প্রায় ১ দশমিক ৯ কোটি মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে বলে কৃষি বিপণন অধিদফতরের হিসাবে উল্লেখ করেছেন। যা মাঠপর্যায়ের সাথে মিল নেই।
আর চলতি মৌসুমে বিদেশে আলু রফতানি হয়েছে ৫২ হাজার মেট্রিক টন। যা বিগত বছরের চেয়ে ১৭ লাখ মেট্রিক টন বেশি। এছাড়াও বিভিন্ন সময় আলু ত্রাণ হিসাবে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে ৩৫ লাখ মেট্রিক টন আলু কোল্ডরোজে মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে বীজ আছে ১৫ লাখ মেট্রিক টন।
রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার আলী বলেন, প্রতিবছর এই সময় আলুর দাম একটু বাড়ে। এ বছর একটু বেশি দাম বেড়েছে। এ দাম নিয়েন্ত্রণ করা উচিত। তবে এমন পদক্ষেপ নেওয়া ঠিক হবে না, যাতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সারা বছর হিমাগারে আলু রাখে ব্যবসায়ীরা। তাতে অনেক খরচ রয়েছে।
তিনি বলেন, আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে হিমাগার ব্যবসায়ী ও মধ্যসত্তভোগিরা। তারা মূলত দাম নিয়েন্ত্রণ করে। তবে আড়ৎদার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা যে দামে কেনে, দুই থেকে পাঁচ টাকা বেশিতে বিক্রি করে। এই ব্যবসায়ীরা দাম কমাতে বা বাড়াতে পারে না। তিনি বলেন, যারা সারাবছর ব্যাবসা করে তাদের নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে প্রশাসনকে। তাদের সাথে বসে দাম নির্ধারণ করলে ভালো হবে। তাহলে সিন্ডিকেট দাম বাড়াতে পারবে না।