রাজশাহীতে পাম চাষে অপার সম্ভাবনা চ্যালেঞ্জ, তেল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ

আপডেট: September 17, 2020, 12:15 am

নিজস্ব প্রতিবেদক:


বাংলাদেশে অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে বাণিজ্যিক পাম চাষ। রাজশাহীতে পরীক্ষামূলকভবে পাম চাষ করে ফলের গুনগত মান বিশ্লেষণ করে এমন সম্ভাবনার কথা বলেছেন, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) গবেষকরা।
জানা গেছে, গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজশাহীতে বিসিএসআইআর গবেষণা কেন্দ্রে পাম চাষ শুরু করা হয়। দেশে পাম গাছের ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানতেই এ গবেষণা প্রকল্প। তিন বছরের মধ্যেই ৩ একর জমিতে রোপনকৃত ৩শ পাম গাছে ফল এসেছে। গবেষকরা বলছেন, পুরোদমে উৎপাদনে আসতে আরও এক বছর সময় লাগবে। কিন্তু এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে প্রকল্পের মেয়াদ। এতে গবেষণা কাজে ভাটা পড়েছে। পাম চাষের এই অপার সম্ভবনাকে কাজে লাগাতে সমন্বিত বৃহৎ প্রকল্প নেয়া প্রয়োজন এমনটাই বলছেন গবেষকরা। গতমাসে প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক বিসিএসআইআরের অয়েল, ফ্যাট অ্যান্ড ওয়েক্সেস রিসার্চ ডিভিশনের প্রিন্সিপ্যাল সায়েন্টিফিক অফিসার মইনউদ্দিন প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তাতে রাজশাহী অঞ্চলে পাম চাষ নিয়ে তুলে ধরা হয়েছে অপার সম্ভাবনার কথা।
মইনউদ্দিন জানান, বাংলাদেশে সাধারণত সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যে বিচ্ছিন্নভাবে পাম গাছ আছে। তবে সৌন্দর্য বর্ধনের পাশাপাশি পাম গাছের অপার সম্ভাবনা আছে। যা তারা ৩ বছরের গবেষণায় দেখতে পেয়েছেন। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু পাম গাছের জন্য খুবই উপযোগী। সঠিকভাবে পামের চাষাবাদ, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে দেশে ভোজ্য তেলের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব। সেই সাথে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও পাম তেল রফতানি করে তেল উৎপাদনশীল দেশের তালিকায় অবস্থান সম্ভব।
তিনি আরো জানান, এশিয়া ও আফ্রিকান দেশগুলোতে পাম গাছ প্রচুর পরিমাণে থাকায় তারা দীর্ঘদিন যাবৎ এ পাম ওয়েল সিড থেকে তেল নিঃসরণ করে সেটি ভোজ্য তেল হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে ফ্যাটি অ্যাসিড ও কোলেস্টরেল থাকলেও তাতে ক্ষতি হচ্ছে না। তাছাড়া পামে আছে ভিটামিন ই। যা ক্যান্সার প্রতিরোধে খুবই শক্তিশালী ও কার্যকর। আবার পুষ্টিমানের দিক থেকে গাজরের তুলনায় পামে রয়েছে ১৫ গুণ এবং টমেটোর তুলনায় ৩০০ গুণ বিটা-ক্যারোটিন। যা মানবদেহে ভিটামিন-এ উৎপাদনে সহায়তা করে। সঙ্গত কারণেই পাশ্চাত্যে এখন পাম তেলের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণে।
মইনউদ্দিন আরও জানান, বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলের মাটি, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও গড় বৃষ্টিপাত পাম গাছের বৃদ্ধির জন্য খুবই উপযোগী। এ ছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ বিভাগীয় অঞ্চলগুলোর অনাবাদি জমিতেও পাম চাষে সম্ভাবনা রয়েছে। এখানকার পাম ফল মালেশিয়ায় উৎপাদিত পাম ফলের চেয়ে আকারে বড়। এবং তেলের গুনগত মানও উন্নত। তবে বাংলাদেশে পাম চাষে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তেল সংগ্রহ। কারণ দেশে তেল সংগ্রহের উন্নত কোনো প্রযুক্তি নেই।
তিনি জানান, তারা রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল সেনা ক্যাম্প থেকে পাম গাছের চারা ও ফল সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে তিনি সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে লাগানো পাম গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করেন। রাজশাহীর বেলপুকুর এলাকায় মহাসড়কের পাশে লাগানো পাম গাছ থেকেও পাম সংগ্রহ করে প্রথম গবেষণায় ভালো ফলাফল পান। পরবর্তীতে বগুড়া নসরতপুর ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক ফজলুল হক এর কাছ থেকে ৩শ চারা এনে গবেষণাগারের পতিত জমিতে বাগান তৈরি করেন। ৩ বছর বয়সী পাম গাছে ফল এসেছে। পুরোদমে উৎপাদনে আসতে আরও অন্তত ১ বছর সময় লাগবে।
মইনউদ্দিন জানান, পাম ফলের বীজ ও উপরের মাংসল অংশ থেকে ভোজ্য তেল পাওয়া যায়। মালয়েশিয়ান ও আফ্রিকান স্থানীয়রা ব্লিচিং পদ্ধতিতে পাম ফল থেকে তেল বের করেন। গুগল ও ইউটিউবে বিভিন্ন তথ্যের মাধ্যমে ল্যাবেও প্রাথমিকভাবে ব্লিচিং পদ্ধতিতে তেল বের করেন তারা। এখন ইঞ্জিনিয়ারিং মেশিন পদ্ধতিতে তেল উৎপাদনের অপেক্ষা। এ ধাপে তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। মেশিনটি তৈরি হলেই সঠিকতা যাচাই করে পুরোপুরি বাণিজ্যিক ধাপে পাম তেল উৎপাদনে যাওয়া যাবে।
ব্যক্তি উদ্যোগে পাম নিয়ে প্রাথমিক গবেষণা শুরু করেছিলেন ফজলুল হক। তিনি জানান, তিনি ২০০৮ সালে মেলায় বেড়াতে গিয়ে পাম গাছের চারা দেখতে পান। সেখান থেকে চারা সংগ্রহ করে নিজের বাসায় লাগান। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাম চারা সংগ্রহ করে ব্যক্তি উদ্যোগে গবেষণা শুরু করেন। সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য অনেকেই তার থেকে গাছ ক্রয় করেন। তবে ফল আসতে দেরি হওয়ায় তারা গাছ কেটে ফেলে। তবে তিনি গবেষণা চালিয়ে গেছেন। ৩ বছর আগে বিসিএসআইআর রাজশাহীর পরিচালক তার থেকে চারা সংগ্রহ করে গবেষণা শুরু করেন। তিনিও সেই গবেষণা কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন।
তিনি আরো জানান, পাম চাষে পরিচর্যা খুবই সহজ। অনেকটা নারকেল গাছের মতো। পাম গাছের পাতা বেশি তাই সব সময় পরিষ্কার রাখতে হয়। আর পোকার আক্রমণ হলে কিটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। পাম চাষে রাজশাহীতে পাম চাষের সম্ভাবনা আছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিসের পতিত জমিতে এ গাছ লাগালে সৌন্দর্য বর্ধনের পাশাপাশি ফল থেকে তেল সংগ্রহও করা যাবে।
বাংলাদেশে পাম তেলের সম্ভাবনার কথা জানিয়ে বিসিএসআইআর রাজশাহীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ইব্রাহিম জানান, বর্তমানে সরকার ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার তেল আমদানি করে। আমদানিকৃত ভোজ্য তেলের ৬০ শতাংশই পাম ওয়েল। বাংলাদেশে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অনাবাদি, পতিত জমি এবং রাস্তা কিংবা রেল লাইনের ধার ঘেঁষে পাম চাষ করা যায়। এতে পাম তেলে শুধু সমৃদ্ধই হবে না বরং বিদেশে তেল রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এটি কেবলই আশাব্যঞ্জক নয় উৎসাহব্যঞ্জকও বটে।
তিনি আরো জানান, এ গবেষণা প্রকল্পে তারা ভালো ফলাফল পেয়েছেন। তবে আরো গবেষণা প্রয়োজন। কেননা এ গবেষণা প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন এ বিষয়ে সমন্বিত বৃহৎ প্রকল্প প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ ও সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশও হতে পারে ভোজ্য তেল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ। বাণিজ্যিক পাম চাষ, ভোজ্য তেল উৎপাদন ও বিপণন সম্ভব হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিধারাও পাল্টে যাবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ