রাজশাহীতে বছরে শত কোটি টাকার বেশি খেজুরের গুড় কেনা-বেচা

আপডেট: জানুয়ারি ২৫, ২০২৩, ১১:২০ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহীতে বছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি খেজুরের গুড় কেনা-বেচা হয়। বিশাল বাজারকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর বাড়ছে খেজুরের গাছের সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে রস থেকে গুড় উৎপাদনও। এমন অবস্থায় খেজুরের গুড় কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে জেলা উপজেলাগুলোর অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে। রাজশাহীর নয় উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেজুরের গাছ রয়েছে পুঠিয়ায়। দ্বিতীয়তে দুর্গাপুর। এই দুই উপজেলায় গাছের সংখ্যা ও গুড় উপাদনও বেশি বলে জানিয়েছে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একটি গাছে মৌসুমে ২০ কেজি খেজুরের রস হয়। তা থেকে ৮ কেজি গুড় হয়। ২০২২-২৩ মৌসুমের হিসেবে রাজশাহী জেলায় মোট খেজুরের গাছ রয়েছে ১১ লাখ ৮ হাজার ১৮টি। আবাদ হয়েছে ৫৪১ দশমিক ৩৭ হেক্টর জমিতে। তা থেকে গুড়ের উৎপাদন হবে ৮৮ লাখ ৬৪ হাজার ১৪৬ কেজি। যা ৮ হাজার ৮৬৪ মেট্রিকটন। আর বিক্রি হবে ১৪১ কোটি ২০ লাখ ৪৪ হাজার টাকায়। এবছর প্রতিকেজি গুড়ের দাম গড়ে ১৬০ টাকা ধরা হয়েছে।

২০২২১-২২ মৌসুমের হিসেবে রাজশাহী জেলায় মোট খেজুরের গাছ ছিলো ১১ লাখ ৩২৩টি। আবাদ হয়েছিল ৫৩৮ দশমিক ৩৭ হেক্টর জমিতে। এছাড়া মোট গুড়ের উৎপাদন ৮৮ লাখ ২ হাজার ৫৮৬ কেজি। যা ৮ হাজার ৮০২ মেট্রিকটন। আর বিক্রি হয়েছিল ৮৮ কোটি ২ লাখ টাকা মূল্যে। সেই হিসেবে ধরা যায় বছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি খেজুরের গুড় কেনাবেচা হয়ে থাকে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, দেশজুড়ে যেমন রাজশাহীর আমের খ্যাতি, তেমনই এখানকার সুমিষ্ট খেজুর গুড় প্রসিদ্ধ। জেলার গাছিরা শীতের মৌসুমে গাছ থেকে রস সংগ্রহের পরে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করে গুড়। উৎপাদনকৃত গুড় উপজেলার হাটগুলোতে কেনাবেচা হয়। সেখান থেকে পাইকাররা কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাটে-বাজারে বিক্রি করেন। এই গুড় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। সেই সূত্রে অর্জন হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। ফলে জেলার পুঠিয়া, চারঘাট ও বাঘা উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এখন চাঙাভাব বিরাজ করছে।

রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় খেজুর গাছের বাগান রয়েছে। এছাড়া সড়কপথ, পতিত জমি ও বাড়ির আঙিনায় খেজুর গাছ রয়েছে। শীতে এসব গাছ হয়ে ওঠে গাছিদের কর্মসংস্থানের উৎস। একজন গাছি প্রতিদিন ৪৫ থেকে ৫০টি খেজুর গাছের রস আহরণ করে। তার আগে পরিচর্যা থেকে শুরু করে সবই গাছিকে করতে হয়। তার পরে বিকেলে গাছে কোর (মাটির তৈরি হাড়ি) লাগিয়ে আসেন। আর সকালে রস ভর্তি কোর নামান গাছিরা। খেজুরের রস ও গুড় তৈরিকে কেন্দ্রে করে বছরের আড়াই থেকে ৩ মাস ব্যস্ত থাকেন গাছিরা। প্রতি মৌসুমে খেজুর গাছের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন অনেকেই।

কাটাখালীর হারিয়ান গ্রামের গাছি শমসের আলী। তিনি ২৬ থেকে ৩০ বছর ধরে খেজুরের গাছ লাগান। রস সংগ্রহ ছাড়াও তিনি গুড় তৈরি করেন। তার বেশির ভাগ খেজুরের গাছ এলাকাতেই। এছাড়া ১৫ থেকে ২০টি গাছ রয়েছে রাজশাহী চিনি কলের ইক্ষু ফার্মে।
গাছি শমসের আলী জানান, তার নিজের কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলো অন্য মানুষের গাছ। কেউ কেউ রস বিক্রি করেন। আবার কেউ রস ও গুড় খাওয়ার বিনিময়ে আমাকে দিয়ে রেখেছে। তিনি আমার খেজুরের গুড় খাঁটি। কিনতে হলে এক সপ্তা আগে জানাতে হবে। না হলে দিতে পারবো না। তিনি প্রায় ১২০টি গাছের রস সংগ্রহ করেন। সে রসগুলো বাড়িতে জাল করে প্রায় ২২ থেকে ২৫ কেজি গুড় তৈরি হয়। গুড় তৈরির জন্য জ্বালানি ও সামান্য কিছু কেমিক্যালের খরচ বাদ দিলেও ভালো লাভ হয়। শুধু শীত মৌসুমে এভাবে কাজ করলেও তার পুরো বছরের আয়-রোজগার হয়ে যায় বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, উপজেলাগুলোতে গুড় তৈরিতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীও ভূমিকা রাখে। বেশির ভাগ বাড়িতে পুরুষ গাছ থেকে রস এনে দেওয়ার পওে সে অন্য কাজে চলে যান। এরপরে রস জ্বাল করে তাক মতো নামান নারীরাই। সাইমা খাতুন ৩২ বছরের একজন নারী জানান, স্বামী ভ্যানগাড়ি চালায়। ভোর রাতে খেজুরের গাছ থেকে রস নামিয়ে বাড়িতে দেয়। এরপরে গোসল ও খাওয়া-দাওয়া করে কাজে বেড়িয়ে যায়। তারপরে রস ছাকনা দিয়ে ছাঁকা হয়। ছাঁকা শেষে সেগুলো চুলার উপরে কড়াইয়ে দেয়। খুড়ি (জ্বালানী) এসে গুড় না হওয়া পর্যন্ত জ্বাল করি। গুড় হয়ে গেলে সেগুলো ছোট ছোট পাত্রে ঢেলে রাখি। শক্ত হলে সেগুলো আবার কাগজে মুড়িয়ে রেখে দিই বিক্রির জন্য।

পুঠিয়ার ঝলমলিয়া হাটের গুড় বিক্রেতা জয় জানান, সপ্তাহের দু’দিন এখানে হাট বসে। প্রতি হাটে প্রায় কোটি টাকা গুড় বেচাকেনা হয়। এই গুড় দেশের বিভিন্ন বড় বড় বাজারে পাইকাররা নিয়ে বিক্রি করে। আমাদের রাজশাহীতে বিদেশে পাঠানোর মতো অর্ডার আসে না। তবে ঢাকার আড়ত থেকে গুড় কিনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভারতের কলকাতা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার প্রবাসী বাঙালিদের কাছে খেজুর গুড় পাঠায়।

জানা গেছে, বাঘা ও আড়ানি পৌরসভা ছাড়াও বাজুবাঘা, গড়গড়ি, পাকুড়িয়া, মনিগ্রাম, বাউসা ও চকরাজাপুর, বানেশ্বর, পুঠিয়া, দুর্গাপুরের কানপাড়াহাট, মোহনপুরের ধোপাঘাটা হাটে হাটেও কম-বেশি গুড় বেচাকেনা হয়। এই হাটগুলোর ব্যবসায়ীরা পুঠিয়া ও দুর্গাপুরের হাটগুলোতে থেকে বেশি খেজুরের গুড় কেনা-বেচা করে।

কাটাখালী হাটের গুড় ব্যবসায়ী আশকের আলী জানান, খেজুরের গুড় প্রতিকেজি ১৫০ টাকা। এছাড়া ভালো ও চিনিমুক্ত গুড় ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এখানে শুক্রবার ও সোমবার হাটের দিন। তিনি ছাড়াও আরো চারজন হাটে গুড় বিক্রি করেন। তারা পুঠিয়া, দুর্গাপরের বিভিন্ন এলাকা থেকে গুড় কিনে এই হাটে বিক্রি করা হয়। একেক জনের প্রতি হাটে দেড় থেকে দুই মণ গুড় বিক্রি হয়।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মেহদী হাসান জানান, জেলায় প্রতিবছর খেজুরের গাছ ও রস থেকে গুড় উৎপাদন বাড়ছে। একটি গাছ থেকে বছরে ২০ কেজি খেজুরের রস হয়। তা থেকে ৮ কেজি খেজুরের গুড় হয় বলে চাষীরা জানায়। ]

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ