রাজশাহীতে বাড়ছে চর্ম রোগির সংখ্যা

আপডেট: জানুয়ারি ২৭, ২০২০, ১:০১ পূর্বাহ্ণ

তারেক মাহমুদ


চর্ম বা ত্বকের সমস্যা এখন সব শ্রেণির মানুষের জন্য একটি সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। শীত কিংবা গরম সকল ঋতুতেই এই সমস্যায় পড়ছে ছোট-বড় সকলে। আর অতীতের চেয়ে এই রোগের সংখ্যাও বাড়ছে। রাজশাহীতে এখন ১৫ থেকে ১৬ ধরনের চর্ম রোগের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে রোগিরা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫৩-৫৬ ওয়ার্ডে ভর্তি গুরুতর রোগিদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ রোগি চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে। এর মাঝে শীতকালে ৫ শতাধিক ও গরমকালে ৬ শতাধিক রোগি বহির্বিভাগে এসে চিকিৎসা নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশগত সমস্যা, ব্যক্তিগত অপরিচ্ছন্নতা, বয়সগত সমস্যা ও অপরিষ্কারের কারণে চর্ম রোগে সংক্রমিত হচ্ছে মানুষ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে রামেক হাসপাতালে দুই লক্ষাধিক মানুষ চর্ম ও যৌন রোগে আক্রান্ত হয়ে সেবা নিয়েছে। যার মাঝে গরম কালে প্রতি মাসে চিকিৎসা নেয় ১৫ হাজার ও শীতকালে ১২ হাজার রোগি সেবা নিচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিন নগরীর প্রাইভেট চেম্বারে সেবা নিচ্ছে ১৫০ থেকে ১৮০ জন। গত একবছরে নগরীতে প্রায় ৬০ হাজার রোগি প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মাঝে শীতকালে ৮ থেকে ১০ ধরনের সমস্যা এবং গরম কালে ১৫ থেকে ১৬ ধরনের সমস্যা নিয়ে রোগিরা চিকিৎসকদের কাছে যাচ্ছে। এর মধ্যে বড় সমস্যা নিয়ে প্রতিদিন হাসপাতালের ডারমাটোলজি বিভাগে ভর্তি হচ্ছে ৬ থেকে ৭ জন রোগি। আক্রান্ত রোগিদের মাঝে সোরিয়াসিস, এটপিক, একজিমা, চিল, ব্লেইজ, খোসপাঁচড়া, দাউদ, ব্রণসহ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাকজনিক রোগ নিয়ে চিকিৎসকদের দেখাচ্ছে রোগিরা। আর ভর্তি রোগিরা ড্রাগ রিয়েকশন, সোরিয়াসিস, ইগ্রেথ্রো গরম রোগি।
দিনে দিনে এই সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রাম থেকে শহর সব পরিবেশের মানুষকে নিজেদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে বিশেষভাবে সজাগ থাকতে বলছেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসকদের মতে, যারা অপরিচ্ছন্ন ও ঘনবসতিপূর্ণ জায়গায় বসবাস করে তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা অনেক বেশি লক্ষ করা গেছে। শিশুদের মধ্যেও চর্মরোগের সমস্যায় অভিভাবকদের নিজের সন্তানদের প্রতি গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।
বর্তমানে বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন ৮ জন। তবে চারজন নিয়মিত রোগি দেখছেন আর সিনিয়র চারজন প্রতি সপ্তাহে দিন ভাগ করে রোগি দেখছেন। তাই সঠিক সেবা দেয়ায় চিকিৎসক সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে একজন বিভাগীয় প্রধান, সহযোগী অধ্যাপক একজন, সহকারী অধ্যাপক ২ জন এবং মেডিকেল অফিসার রয়েছে চারজন। এরমাঝে সিংহ ভাগ রোগি দেখছেন চারজন মেডিকেল অফিসার। সংকট রয়েছে অফিস সহকারীর পদেও। তাই রোগি দেখতে নিয়ম শৃঙ্খলায় চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে এই অবস্থায় জনবল ও ওষুধ অপ্রতুল থাকলেও চিকিৎসকরা সর্বক্ষণ নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর নগরীর বিভিন্ন ব্যক্তিগত চেম্বারে সব মিলে চিকিৎসক রয়েছে ১৪ জন।
গত বুধবার রামেক হাসপাতালের বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, মেডিকেল অফিসার ডা. ইবরাহীম মো. শরফের চেম্বারের সামনে বিশাল লম্বা লাইন। শতাধিক রোগি লাইন দিয়ে সেবা নিচ্ছেন। তিনি জানান, রোগি যতই হোক সেবা দেয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই রোগকে অবহেলা না করে চিকিৎসকদের পরামর্শে চললে এই রোগের সমাধান মিলবে। তিনি জানান, এখন জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে রোগিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। চর্মরোগ সাধারণ একটি ছত্রাকজনিত রোগ। দিনের বেলার চেয়ে রাতের বেলায় চর্ম রোগের চুলকানির প্রবণতা বেশি বৃদ্ধি পায়। ছত্রাকের সংক্রমণে চর্মরোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। গরমে যে সকল চর্ম রোগ বেশি দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে ঘামাচির পরেই ছত্রাকজনিত চর্মরোগ। তিনি বলেন, গরমে বেশি ঘাম হয়, শরীর ভেজা থাকে- তাই এ সময় ছত্রাক জন্মে। সে সময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সবসময় সজাগ থাকতে হবে। আর শীতে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও কাপড় চোপড় পরিষ্কার রাখতে হবে। তিনি বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তির মাঝে অনেকে চিকিৎসা নেয়ার পরেই কিছুদিন নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পরে ওষুধ বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে আবারো আক্রান্ত হয়ে যায়। এখন মানুষ আগের চেয়ে সচেতন হয়েছে। ছোট একটু ফোঁড়া চুলকালে চিকিৎসা নিতে আসে এটা অনেক ভালো।
বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. মকছেদুর রহমান জানান, ‘বর্তমানে ছেলেদের চেয়ে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। যেমন, আঙ্গুলের মাঝখানে, কোমরের চারিদিকে, হাতের কনুই ও শরীরের নানা অংশে ছোট ছোট ফুঁসকুড়ি দেখা যায়। এছাড়া যৌনাঙ্গের আশেপাশেও এ ধরনের ফুসকুড়ি দেখা দেয়। চুলকানোর সময় চামড়া উঠে যায়, পুঁজ ও পানি জমে। একবার চুলকালে শরীরের অন্য স্থানও সংক্রমিত হয়। ব্যথার সাথে জ্বর আসতে পারে। এ সব সমস্যার সমাধানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে চলতে হবে। এজন্য প্রতিটি মানুষকে সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করতে হবে। নিয়মিত গোসল করতে হবে। প্রয়োজনে গরম পানি দিয়ে গোসল করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিমপাতা সিদ্ধ পানিতে গোসল করালে উপকার পাওয়া যায়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে চলতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ