রাজশাহীতে বৈষম্যের ক্ষত নিয়েই বাড়ছে শিশুশ্রম

আপডেট: মে ৪, ২০২১, ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

মাহাবুল ইসলাম:


সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠা প্রতিটি শিশুর জন্মগত অধিকার। অথচ পারিবারিক অসচ্ছলতা কিংবা সচেতনতার অভাবে শিশুর শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অনেক অভিভাবক। শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে শিশুশ্রমে। যে সময় একটি শিশুর খেলাধুলা করার ও স্কুলে যাওয়ার কথা এখন তারা বিভিন্ন বঞ্চনার শিকার হয়ে বাধ্য হচ্ছেন কর্মক্ষেত্রে যেতে। করোনাকালে এমন চিত্র আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। শহর থেকে শুরু করে প্রান্তিক এলাকাতে নানা বৈষম্যের মধ্যেই কর্মক্ষেত্রেযুক্ত হয়ে পড়ছেন অনেক শিশু। প্রকট আকার ধারণ করছে বেতন বৈষম্যসহ শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এখনও শিশুবান্ধব হচ্ছে না কর্মক্ষেত্র।
বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার তথ্য ও প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজশাহীর কর্মজীবীদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশই শিশু। যা করোনা পরিস্থিতিতে আরো বেড়েছে। নতুন করে বিপুল সংখ্যক শিশু বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছে। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকার অজুহাতে অনেক শিশুকে কাজে দিচ্ছেন অভিভাবকরা। অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর এটিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর্মক্ষেত্রেযুক্ত হওয়া উল্লেখ করলেও এসব শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে বা শিক্ষাক্ষেত্রে ফিরে আসা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিশু শ্রম নিয়ে কাজ করা সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর বলছে, রাজশাহীতে ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮ টি সেক্টরে ১৪ বছরের নিচে শিশুশ্রমিক রয়েছে মাত্র ১৯০ জন। যদিও বাস্তবে এর সংখ্যা অনেক বেশি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু নগরীর মধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ এই সেক্টরগুলোতে ১৪ বছরের নিচে এক হাজারের বেশি শিশু শ্রমিক রয়েছে। যা করোনাকালে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এসব ঝুঁকিপূর্ণ সেক্টরগুলো শিশু বান্ধব না হওয়ায় প্রতিনিয়তই হেনস্তার শিকার হচ্ছে। বুলিং, মানসিক নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতনসহ যৌন হয়রানির শিকারও হচ্ছে শিশুরা।
রাজশাহীতে তেমন শিল্প-কারখানা না থাকায় কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে। এরমধ্যে যোগ হয়েছে করোনার সংকট। এতে অভিভাবকদের অনেকেই কর্ম হারিয়েছে। আয় কমেছে আরো অনেক অভিভাবকের। এতে জীবিকার তাগিদে অনেকটা বাধ্য হয়েই শিশুদের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। শিশুশ্রম নিরসনে সরকার ঘোষিত ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮ টি সেক্টরের বাইরে বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত শিশুদের কোনো জরিপ না হওয়ায় রাজশাহীতে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা কত তার সঠিক হিসেব নেই কারো কাছে।
এদিকে, রাজশাহীর প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি এলাকাগুলোতে শিশুশ্রমের চিত্র আরো নাজুক। নারী ও শিশুরা যেমন বাল্য বিয়ের শিকার হয়ে একপর্যায়ে বাধ্য হচ্ছেন কাজে যেতে। অপরদিকে দ্ররিদ্রতার অষ্টেপৃষ্ঠে থাকা পরিবারগুলোর ছেলে শিশুরা বাধ্য হচ্ছেন তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কাজ করতে। এসব এলাকাতে শিশুসহ নারীদের বেতন বৈষম্য কমছেই না। মানসিক-শারীরিক নির্যাতনসহ যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। রাজশাহীর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি অধ্যুষিত উপজেলা গোদাগাড়ি। এখানে প্রায় ২২ থেকে ২৫ টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি সম্প্রদায় রয়েছে। এই উপজেলায় শিশুশ্রমের চিত্র সবচেয়ে বেশি। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার তথ্য ও প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে দেখা যায় এখানকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ শিশুশ্রমিক। তারা বেতন বৈষম্যসহ নিজেদের পরিবার ও সামাজিকভাবেও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজশাহীতে সঠিক হিসাব না থাকলেও দিনে দিনে অসংগঠিত খাতে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা যে বেড়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আগে থেকেই এখানে শিশুশ্রমিক বেশি। এরমধ্যে যোগ হয়েছে করোনা পরিস্থিতি। দীর্ঘসময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। শিশুরা অলস সময় পার করছেন। অভিভাবকদেরও আয় কমেছে। অনেকে কর্ম হারিয়েছে। এ সময়টা শিশু যেন কোন খারাপ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে না পরেন এমন চিন্তা থেকেও অনেক অভিভাবক তাদেরকে বিভিন্ন কাজে লাগাচ্ছেন। এতে পরবর্তীতে এসব শিশুদের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করাটা অনেকটাই কষ্টকর হয়ে পড়বে। এবং এটা বলাই যায় অনেক শিশু শিক্ষা থেকে ঝরেও পড়বে। আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি এলাকাগুলোতে শিশুশ্রম আরো বেশি।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্রাকের জেলা সমন্বয়কারী মো. মহাসীন আলী ও সিসিবিভিও এর সমন্বয়কারী মো.নিরাবুল ইসলাম জানান, রাজশাহীতে শিশুশ্রম বাড়ছে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি এলাকগুলোতে এই চিত্রটা আরো বেশি। পরিস্থিতি উত্তরণে তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারি উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেন তারা।
এ বিষয়ে রাজশাহী কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মো. মাহফুজুর রহমান ভূইয়া জানান, তারা সকল শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ শিশুশ্রম নিয়েও কাজ করে থাকেন। কয়েক বছরের সঙ্গে তুলনা করলে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। এক্ষেত্রে তারা ঝুঁকিপূর্ণ সেক্টরগুলো থেকে শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করছেন। রাজশাহীর প্রায় ৪৮ কারখানা থেকে শিশুশ্রম নিরোসন করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে তারা কঠোর হতে পারেন না। কারণ এক জায়গা থেকে তাকে বের করে দেয়া হলে সে অন্য জায়গায় কাজ নিবে। আর এসব শিশুদের পারিবারি অস্বচ্ছলতার কারণেই এসব কাজে লাগানো হয়। তাই এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য তারা কার্যক্রম হাতে নিচ্ছেন। এরমধ্যে একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। যেখানে এসব শিশুদের একটি নির্দিষ্ট সময় ট্রেনিং দিয়ে শিক্ষিত ও দক্ষ করে তুলে উত্তম কর্মপরিবেশ সম্পন্ন কাজে লাগানো যায়। তবে বর্তমানে তারা শিশুশ্রম নিরোসনে তারা বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।