রাজশাহীতে ২২১ ইটভাটার লাইসেন্স নেই ।। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসল ও প্রকৃতি

আপডেট: জানুয়ারি ১৮, ২০১৭, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব



রাজশাহীতে আইন লঙ্ঘন করে লাইসেন্স বিহীন ও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে ইটভাটায় ইট প্রস্তুত। অথচ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। কয়েকটি নোটিশ পাঠানো ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেই সরকারি দফতরগুলো তাদের কাজ সীমাবদ্ধ রাখছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসল। দুষণ ঘটছে পরিবেশ ও প্রকৃতির।
পরিবেশ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের আওতাভুক্ত। এই তিনটি জেলায় ইট ভাটা রয়েছে ৩৯৬টি। অথচ লাইসেন্স আছে মাত্র ৭৩ টির। ২২১টির কোনো লাইসেন্স নেই। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় অবস্থিত কোনো ইট ভাটার লাইসেন্স নেই। রাজশাহী জেলার ১৮০টি ইটভাটার মধ্যে লাইসেন্স আছে ১৪টির ও নাটোরের ১১৪টির মধ্যে লাইসেন্স আছে ৫৯টির। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ এ সুস্পষ্টভাবে লেখা আছে, জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স ব্যতিত কোনো ব্যক্তি ইট ভাটায় ইট প্রস্তুত করতে পারবে না। অথচ দিব্যি লাইসেন্স ব্যতিত এসব ইটভাটায় ইট প্রস্তুত করা হচ্ছে।
অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এই তিনটি জেলায় পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র আছে ২২০টি ইটভাটার। ১৭৬টি ইটভাটার পরিবেশ অধিদফতরের কোনো ছাড়পত্র নেই। এর মধ্যে রাজশাহীতে ১৩৭টি, নাটোরে ১৯টি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০টি ইটভাটার পরিবেশগত কোনো ছাড়পত্র নেই।
২০১৩ এর আইনে স্থায়ী চিমনি ইটভাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এই তিনটি জেলায় স্থায়ী চিমনির ইটভাটা রয়েছে ১৭০টি। জিগজ্যাগ ইটভাটা রয়েছে ২২১টি ও হাইব্রিড হফম্যান ইটভাটা রয়েছে পাঁচটি। তার মধ্যে রাজশাহীতে স্থায়ী চিমনি রয়েছে ৬০টি, নাটোরে ৩১টি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭৯টি স্থায়ী চিমনির ইটভাটা রয়েছে। এইসব ইটভাটার রূপান্তরের হার রাজশাহীতে ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, নাটোরে ৭২ দশমিক ৮১ শতাংশ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২২ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক মামুনুর রশিদ জানান, যেসব ইটভাটা আইন মেনে তৈরি হয়নি তাদের পরিবেশগত ছাড়পত্র ও লাইসেন্স দেয়া হয়নি। এছাড়া অনেক ইটভাটা ফিক্সড চিমনি যা আইনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাদেরও লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। যেসব ইটভাটা পরিবেশগত ছাড়পত্র ও লাইসেন্স নেই তারপরও ইট প্রস্তুত করছে তাদের নোটিশ পাঠানো হয়েছে। কিছু এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিচার করা হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রাজশাহী জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি সাদরুল ইসলাম বলেন, লাইসেন্স পেতে পরিবেশ অধিদফতর থেকে প্রথমে ছাড়পত্র নিতে হয়। এই ছাড়পত্র নিয়ে জেলা প্রশাসকের দফতরে আবেদন করতে হয়। যা দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। কারণ আইনগত জটিলতার কারণে অনেক সময় পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়া যায় না। পেলেও লাইসেন্স পেতে দীর্ঘ সময় লাগে।
৩৭টি ইটভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র থাকলেও লাইসেন্স এত কম কেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ছাড়পত্র পেলেও লাইসেন্স পেতে দীর্ঘ সময় লাগে এইজন্য লাইসেন্সের সংখ্যা এত কম।
রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আতাউল গণি জানান, জেলা প্রশাসন থেকে প্রতিটি ইটভাটার মালিকদের ইট প্রস্তুতের জন্য তিন বছরের জন্য লাইসেন্স দেয়া হয়। তিন বছর পূর্ণ হলে আবার নতুন করে লাইসেন্স করতে হয়। রাজশাহীতে ১৪টি ইটভাটার মাত্র লাইসেন্স আছে। কারণ ইটভাটার মালিকদের অনেকের লাইসেন্সের মেয়াদ পার হয়ে গেছে। অনেকে লাইসেন্স না করেই ইট প্রস্তুত করছে। তবে যাই হোক, জেলা প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
২০০৪ সালের রাজশাহী বিভাগের এক সমীক্ষায় (খান ও সাত্তার ২০০৪) দেখা গেছে, রাজশাহী বিভাগে এক সময় ইট ভাটার সংখ্যা ছিল ৯৬৭টি। ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ প্রায় ১১২৭ একর। উল্লিখিত সময়ে ইট প্রস্তুত হয়েছে ১৬৩০ মিলিয়ন যার জন্য জ্বালানি হিসাবে কাঠ ব্যবহৃত হয়েছে আনুমানিক ১৩ হাজার ৩৪৩ টন এবং কয়লা ব্যবহৃত হয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৩৪০ টন। ডেপুটি কমিশনার কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট এর কার্যালয় সূত্র থেকে জানা গেছে, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় ২০০৬-২০০৭ মৌসুমে ইট পোড়ানো হয়েছে ১০৪৭টি ইট ভাটায়।
বাংলাদেশে সাধারণত অক্টোবর থেকে ইটভাটার কার্যক্রম শুরু হয়। চলে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত। বর্ষাকালে ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ থাকে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তা থেকে ইট পোড়ানো শুরু হয়। প্রধানত ইটের ভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় কাঠ, কয়লা ও প্রকৃতিক গ্যাস। অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় (৪০০-৬০০ºঈ) পূর্বে শুকানো নির্দিষ্ট মাপের কাদাকে পুড়িয়ে ইটে রূপান্তরিত করা হয়। কাঠ ও কয়লা পোড়ানোর সময়েই ওই সকল পদার্থ হতে নির্গত হয় অযৌগ কার্বন (ঈ), হাইড্রোজেন (ঐ), নাইট্রোজেন (ঘ), সালফার (ঝ), ছাই (অংয), শিশা (চন) অতি ক্ষুদ্রাতিকায় ভাসমান পদার্থ (ঝচগ)। পরবর্তীতে রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়ায় ওই সকল নির্গত পদার্থসমূহ পরিবর্তিত হয়ে ক্ষতিকারক রাসায়নিক যৌগ পদার্থের সৃষ্টি করে।  পরিবেশে ওই সকল পদার্থের উপস্থিতি যখন সহনীয় মাত্রাকে অতিক্রম করে তখনই পরিবেশ হয়ে উঠে দূষিত।
২০০৪ সালের রাজশাহী বিভাগের ওই সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাটি পোড়ানোর ফলে ভাটা ও ভাটা সংলগ্ন ক্ষারীয় জমি অতি দ্রুত অম্লীয় হয়ে পড়ে। মাটির স্বাভাবিক জৈব পদার্থগুলি আগুনের আঁচে নষ্ট হয়ে যায়। মাটির স্বাভাবিক সালফারের পরিমাণে ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া অন্যান্য ্উপাদান যেমন সোডিয়াম, পটাশ ও ক্যালসিয়ামের মাত্রা ৭৫ শতাংশ অধিক হ্রাস পায়। এতে করে শুধু ইট ভাটার মাটিই নয়, এর পাশ্ববর্তী মাটিগুলো তার স্বাভাবিক গুণাবলী হারিয়ে অনুর্বর হয়ে পড়ে। মাটির জৈব পদার্থের হ্রাসের কারণে ভূমির ক্ষয় বৃদ্ধি পায়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আজিজুল ইসলাম বলেন, লাইসেন্স ও ছাড়পত্র ব্যতিত ইটভাটায় ইট প্রস্তুত পরিবেশের জন্য অশনিসংকেত। তাই প্রত্যেক ইটভাটা মালিককে লাইসেন্স ও পরিবেশের ছাড়পত্র নিয়েই ইট প্রস্তুত করা উচিত।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ