রাজশাহীর কৃষি আবাদে ক্ষতি ৫০ কোটি ছাড়াল ‘ক্ষতির অজুহাতে অস্থিরতা তৈরি করে ফায়দা নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা!

আপডেট: October 19, 2020, 12:21 am

মাহাবুল ইসলাম:


প্রকৃতিক দুর্যোগের কবলে চলতি মৌসুমে আবাদ করে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন রাজশাহীর চাষিরা। করোনার মধ্যেও বুক ভরা আশা নিয়ে আবাদে নামলেও প্রতিকূল আবহওয়া প্রতিনিয়তই কৃষককে হতাশ করছে। এ কারণে যেমন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তেমনি এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে। এ ক্ষতির সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ী কুচক্রে নাভিশ্বাস উঠেছে ভোক্তাদের।
করোনাকালীন অতিবৃষ্টি ও বন্যার প্রভাবে রাজশাহীর কৃষি আবাদে ক্ষতির পরিমাণ ৫০ কোটি ছাড়িয়েছে। শুধু গত ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বন্যা ও জলাবদ্ধতায় রাজশাহীর তানোর, মোহনপুর ও বাগামারা উপজেলার ৬ হাজার ২১৬ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ৫০৩ দশমিক ৫ হেক্টর জমি যা রাজশাহীর মোট ফসলি জমির দশমিক ৬০ শতাংশের আবাদ নষ্ট হয়েছে। এতে কৃষকের প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকার অধিক ক্ষতি হয়েছে। সর্বস্বান্ত হয়েছেন অনেকই। এমন তথ্য-চিত্রই জানাচ্ছে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই তিন উপজেলায় ৭৭ হাজার ৫৭০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছিলো। ২০ দিনে আবাদকৃত জমির মধ্যে আগের আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত জমিসহ ৪৭৩ দশমিক ৫ হেক্টর আবাদ নষ্ট হয়ে যায়। এতে মোট উৎপাদন থেকে ১ হাজার ৪৯৬ দশমিক ২৬ মেট্রিক টন উৎপাদন নষ্ট হয়েছে। এছাড়া এ উপজেলাগুলোতে ২ হাজার ৫৬১ হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ করা হয়েছিলো। আবাদকৃত জমির ৫ হেক্টর জমির সবজি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া পানবরজেও কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এর আগে রাজশাহীতে চলতি মৌসুমে চার উপজেলাতে ২৭ দশমিক ৫৮ হেক্টর জমির রোপা আউশের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ৮ হাজার ৫৮০ দশমিক ৫৬ মেট্রিক টন উৎপাদন কমেছিলো। রোপা আউশের আবাদে ৩০ কোটি ৮৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছিলো। মৌসুমে সবজির ক্ষতি হয়েছিলো ৩৬ দশমিক ৫ হেক্টর জমির। ক্ষতিগ্রস্ত জমির সবজি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৩৬৫ মেট্রিক টন। এতে সবজিতে ৭৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ক্ষতিসহ পানবরজে ৮ কোটি ৮২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ও মরিচের আবাদে ১২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছিলো।
তবে, রাজশাহীতে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় তানোর, মোহনপুর, বাগমারা ও পুঠিয়া উপজেলা ছাড়াও পবা ও গোদাগাড়ি উপজেলাতে সবজি আবাদে কৃষক কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মৌসুমের ফুলকপি, পাতাকপি আবাদ করেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষীরা। আর এই ক্ষতির অজুহাতে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে ব্যবসায়ীরা। এতে মূলত যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারা কোনোভাবেই লাভবান হচ্ছে না।
তবে কৃষিবিদরা বলছেন, রাজশাহীর কৃষিতে অতিবৃষ্টি বা জলাবদ্ধতার কারণে যে ক্ষতি হয়েছে তার প্রভাবে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বাজারেও কিছুটা প্রভাব পড়েছে এটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বাজার অস্থির করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করছে।
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এসএম কামারুল্লাহ জানান, রাজশাহীতে অতিবৃষ্টিতে এবার কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে। এর প্রভাব বাজারে পড়বে এটাও স্বাভাবিক। তবে কৃষিতে এতো বড় কোন ধরনের ক্ষতি হয়ে যায়নি যে সবজির দাম এতো চড়া হবে। বাজারগুলোতে সবজির সরবরাহ যে কম হচ্ছে এমনটি দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বেশি দাম নিচ্ছেন। আসলে এখানে সিন্ডিকেট কাজ করছে। তারা বিভিন্ন অজুহাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করাসহ বিভিন্ন পলিসিতে বাজারকে অস্থির করে তুলছে। এর মধ্যে দিয়ে তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করছে।
তিনি আরো জানান, সবজির দাম বেশি নেয়ায় কৃষকরা যে উপকৃত হচ্ছেন এমনটা না। সিন্ডিকেট করে ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে। এ সময় তিনি ব্যবসায়ীদের এ ধরনের কালচার থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ইলিয়াস হোসাইন জানান, করোনাকালীন অতিবৃষ্টি বা বন্যার প্রভাবে রাজশাহীর কৃষিতে যে ক্ষতি হয়েছে তার প্রভাব স্থানীয় বাজারে দেখা যাচ্ছে। রাজশাহীর জমিতে এত সবজি উৎপাদন হওয়ার পরেও এখানে সবজির চড়া দাম। একেতো কৃষকের ক্ষতির মধ্যে উৎপাদন কমেছে অন্যদিকে যুক্ত হয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছে ভোক্তারা। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোকে আরো তৎপর হওয়ার আহ্বান জানান।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামছুল হক জানান, এ মৌসুমে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে রাজশাহীর কৃষিতে বেশিকিছু ক্ষতি হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে ফলনও কমেছে। প্রকৃতি সব সময়ই আমাদের একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে। প্রকৃতির ঝুঁকিকে আমরা ইচ্ছে করলেই এড়াতে পারি না। তবে আমরা সচেতনতার মাধ্যমে ক্ষতির মাত্রাটাকে কমাতে পারি।
তিনি আরো জানান, এ ক্ষতির প্রভাবে বাজারে পড়ছে। তবে এর প্রভাবে সবজির দাম এতোটা বাড়ার কথা না। আর যেসকল কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তারা নতুন করে আবাদ শুরু করেছেন। এ সময় তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন আগামী ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে সবজির দাম কমে আসবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ