রাজশাহীর চরে দিনবদলের হাতছানি

আপডেট: জানুয়ারি ১৬, ২০২২, ১০:৪২ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


এক সময় রাজশাহীর চরের একটা বড় অংশ অনাবাদি থাকতো। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই ধুধু চর এখন ফসলেপূর্ণ থাকছে। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি থেকে শুরু করে তিনটি ফসলের চাষও হচ্ছে। পলি মিশ্রিত উর্বর চরাঞ্চলের মাটিতে এখন দিনবদলের হাতছানি দিচ্ছে। চরে এখন মসুর, গম, সরিষা, শাকসবজি, ভূট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, আলু, আম, মাসকালাই, ধনিয়াসহ বাদামের আবাদ হচ্ছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার বিচ্ছিন্ন চর এবং মূল ভূখন্ডের সঙ্গে সংযুক্ত বৃহৎ আয়তনের চর রয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ২১ হাজার ৮৫৬ হেক্টর। এরমধ্যে আবাদ হয় এমন চরের পরিমাণ ৮৮ হাজার ৬৬০ হেক্টর। আবাদকৃত এই চরের মধ্যে বছরে একবার আবাদ করা যায় এমন ১৪ হাজার ৯১২ হেক্টর। বছরে দুইটি ফসলের আবাদ করা যায় এমন চরের পরিমাণ ৩৬ হাজার ৩১৩ হেক্টর। এছাড়া বছরজুড়েই সোনালি ফসল ফলায় এমন চরের পরিমাণ ২১ হাজার ২৮ হেক্টর। তবে এখনো মোট চরের প্রায় ৫৩৩ হেক্টর জমি এখনো চাষাবাদের বাইরে। এই পতিত জমি চাষযোগ্য করে তুলতে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন কৃষি অফিস।

চাষীরা বলছেন, চরে আবাদ করা কিছুটা কষ্টকর হলেও এটা তাদের ভাগ্যের উন্নয়নে মূল ভূমিকা রাখছে। চরের মাটি এখন পতিত থাকে না। এখানে ফসল ফলিয়ে কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছেন। তবে চরাঞ্চলে যাতায়াত, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সমস্যা আছে। এক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্টপোষকতা বাড়লে চরাঞ্চলের কৃষিতে আরও পরিবর্তন আসবে।

রাজশাহীর মতিহার, বোয়ালিয়া, পবা, গোদাগাড়ি, চারঘাট ও বাঘা এই ছয়টি উপজেলার চরে প্রায় ১০ হাজার ১৮৭ হেক্টর জমিতে গত বছর প্রায় ১৩ টি ফসল চাষ হয়েছে। ওই বছর এই চর থেকে ২ হাজার ৩১৮ মেট্রিক টন মসুর, ৯ হাজার ৮৩৭ মেট্রিক টন গম, ৫১৮ মেট্রিক টন সরিষা, ৩২ হাজার ১০৫ দশমিক ৬ মেট্রিক টন শাকসবজি, ৬ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন ভুট্টা, ২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন বোর, ৭ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ, ৫ হাজার ৭৭৫ মেট্রিক টন রসুন, ১১ হাজার ৮৮২ দশমিক ৫ মেট্রিক টন আলু, ৩ হাজার ৮২৫ মেট্রিক টন আম, ৭২৮ দশমিক ০৭ মেট্রিক টন মাসকালাই, ৪৪৬ মেট্রিক টন চিনাবাদাম ও ২৮৫ মেট্রিক টন ধনিয়া পাতা উৎপাদন হয়েছে। এ বছর চাষকৃত জমি ও উৎপাদন বাড়বে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।

চরেও এখন বোরো ধানের বীজতলা পরিচর্যা ও লাগানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। শ্রী রামপুরের কৃষক কালাম হোসেন বলেন, প্রতি বছর আমরা কয়েকজন মিলে চরের প্রায় ২০ থেকে ৩০ বিঘা আবাদ করে থাকি। গতবছর ধান, খেশারী, কালাইসহ সবজির চাষ করেছিলাম। চরের মাটি উর্বর। এখানে অন্যান্য সাধারণ জমির চেয়ে চাষাবাদ খরচ তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম। ফসলও ভালো পাওয়া যায়। গত বছর বিঘা প্রতি ২২ থেকে ২৫ মন করে ধান পেয়েছি। এবারও ধানের আবাদ করছি। আশা করছি এবারও ভালো ফলন পাবো।

রাজশাহীর পদ্মাপাড়ে জেগে ওঠা চরে এখন ফসলের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষীরা। এমনিই একজন রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, জেগে ওঠা চরের প্রায় চার বিঘামতো জমি লিজ নিয়ে আবাদ করছি। প্রতিবছরই চরের কিছু জমি লিজ নিয়ে আবাদ করি। এবারও করছি। চার বিঘা জমিতে পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ও খেসারির আবাদ আছে। মসুরের আবাদটা তেমন ভালো হয় নি। তবে অন্যান্য আবাদ মোটামুটি ভালো আছে। আশা করছি এই ফসল থেকে লাভবান হবো।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা উম্মে সালমা জানান, চল এলাকায় যাতায়াত, বিদ্যুত একটি বড় সমস্যা। যদিও কিছু কিছু চরে এখন বিদ্যুৎ যাচ্ছে। তবে চরের সেচ ব্যবস্থা এখনও সাধারণ এলাকার মতো না। এই সমস্যাগুলোর সমাধান হলে চরের চাষাবাদের কৃষকদের দূর্ভোগ কমবে। এছাড়া কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে পরামর্শসহ সরকারি যাবতীয় সুবিধা কৃষকদের দেয়া হচ্ছে।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, রাজশাহীর চরাঞ্চলে প্রতিবছরই আবাদ বাড়ছে। যে চর প্রতিবছর ডুবে সেখানে পলি জমে। আর পলি জমির জন্য খুবই উপকারী। এই পলি মিশ্রিত মাটির ফসলের গুনগত মানও ভালো। তবে চরের কিছু জমিতে দেখা যাচ্ছে পর্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রচলিত ক্ষতিকর মেডিসিন ব্যবহার করা হয়। এই মেডিসিন মূলত পোকা দমনের জন্য ব্যবহার করা হয়। এতে এই মেডিসিন ব্যবহারকৃত জমির ফসল স্বাস্থ্যর জন্য ক্ষতিকর। যদিও এমনটা খুব কম হয়।

তিনি আরও জানান, চরের কৃষকদের চাষাবাদে উৎসাহিত করতে ও সমস্যা সমাধানে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের নির্দেশ দেয়া আছে। এছাড়া বিভিন্ন কর্মক্রম পরিচালনার মাধ্যমে তাদের সমস্যার সমাধান করা হয়। সরকারের কৃষিবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগের সুফল চরাঞ্চলের কৃষকরাও পাচ্ছে। দেশের উৎপাদনে তারা ভালো ভূমিকা রাখছে।