রাজশাহীর সরস্বতী পূজার প্রতিমা বিসর্জনে একাল-সেকাল

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২২, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

অচিন্ত্যকুমার সরকার


বছর ঘুরে আবার এলো কাঙ্খিত শ্রীপঞ্চমী। উদ্বেলিত হয়ে উঠলো নবীন শিক্ষার্থীর মন-প্রাণ মা সরস্বতীর চরণে অর্ঘ্য দেবার বাসনায়। শুধু কি নবীন? নবীন প্রবীন সব বয়সের সবার। সনাতন ধর্মাবলম্বী তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এই পূজা জ্ঞান ও বিদ্যা-বুদ্ধির সাধনা। বিদ্যা- বুদ্ধির বলেই মানুষ আজ প্রাচীন গুহা থেকে সুরম্য অট্টালিকায় পদার্পণ করতে পেরেছে। তাই এই সাধনার শেষ নেই।

এই বাণী অর্চনাকে নিয়ে বলার এবং লেখার বিষয় অনেক, ইতিহাসও বহু প্রাচীন। এর চর্চা শুধু বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের গৃহে বা বিদ্যানিকেতনই নয় ; এর প্রসার বিশ্বের সুদূর প্রান্তেও। তাই ঐতিহ্যময়ী বিদ্যাদেবীর সাধনা যুগ যুগান্তরের।
ফিরে আসি রাজশাহী মহানগরীর প্রেক্ষাপটে। রাজশাহী এখন শুধু শিক্ষানগরীই নয়- সৌন্দর্যের নগরী, সবুজের নগরী, পরিচ্ছন্নতার নগরী। কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে এর রূপ।

গর্বের এই ঐতিহ্যবাহী শহরটিতে জমিদার আমল থেকেই সরস্বতীপূজার খ্যাতি ছিলো। যেহেতু রাজ রাজার আবাসভূমি তাই। তখনকার শহরের চিত্র ছিলো ভিন্ন, আজকের থেকে অনেক অনেক গুণ আলাদা। সব স্থানেই ছিলো প্রাচীনতার ছাপ। আজকের মহানগরীতে বসে তা ভাবাই যায় না। সেই সময়ের শহরকে ইতিহাস খুঁজে বের করতে হয়। যানবাহন বলতে সেই ঘোড়ার গাড়ি- টমটম। মোটরগাড়ি, রিক্সা বেশ পরে।

সাতচল্লিশের দেশভাগ আর জমিদারি উচ্ছেদের কারণে রাতারাতি বদলে গেছে রাজশাহী- যা সে সময়ে রামপুর বোয়ালিয়া নামেই ছিলো বেশি পরিচিত।
প্রেক্ষাপট সরস্বতীপূজা ও বিসর্জন নিয়ে কথা ; কিন্তু হারানো স্মৃতিকে খুঁজে দেখেই আসতে হচ্ছে আজকের কথায়, আনতে হচ্ছে নানা প্রসঙ্গ।

সাতচল্লিশপূর্ব জমিদার আমলে পৃথক পৃথক আঙ্গিকে যেমন দুর্গাপূজা হতো ; তেমনি বিদ্যার আরাধনার দেবী সরস্বতীর পূজাও হতো নানান আঙ্গিকে। আর প্রতিমা বিসর্জন অনষ্ঠানও ছিলো অনেক জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে। এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বিবি হিন্দু একাডেমীর ১৩৮১ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত বার্ষিকীতে কিছু তথ্য পাওয়া যায়।

বার্ষিকীর সম্পাদক ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষক, গবেষক ও ভাষাপ-িত শ্রী নিখিলনাথ মৈত্র। তিনি তাঁর প্রবন্ধে রাজশাহীর ‘সেকাল একাল’ প্রসঙ্গে একস্থানে বলেছেন- “সেকালের রাজশাহীর সরস্বতীপূজার শোভাযাত্রা রাজশাহীর মানুষের রুচিবোধ এবং শিল্পজ্ঞানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতো। শহরের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা পথের ধারে এবং গৃহে গৃহের অলিন্দে, এছাড়া মফস্বলের বহুজন ওই শোভাযাত্রা দেখবার জন্য সাগ্রহে প্রতীক্ষা করে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করতো। ”

ব্রিটিশ আমলে তথা জমিদারি শাসনামলে রাজশাহী শহরে ঘরে ঘরে সরস্বতী পূজা হতো। যতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিলো, সব প্রতিষ্ঠানের হিন্দু শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ উদ্যোগে সরস্বতী পূজা করতো।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর গোটাদেশের চিত্র যেমন বদলে গেলো, বদলে গেলো রাজশাহী শহরেরও। স্বচ্ছল হিন্দু পরিবারগুলো চলে গেলো ভারতে। সেই সাথে জমিদারদের দেশত্যাগ। থাকলো নগণ্য সংখ্যক কিছু হিন্দু। তাদেরও দিন কাটছিলো ভীতি এবং আতঙ্কে। সবসময় মনের ভেতরে কী হয় কী হয়? থমকে গেলো পূজার আনন্দ। তারপর ১৯৬২ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরেক দফা আতঙ্কের সৃষ্টি করলো। গ্রামেগঞ্জের হিন্দু পরিবারগুলোও আরেক দফা চলে গেলো ভারতে। বদলে যেতে লাগলো গোটা দেশের, সাথে সাথে রাজশাহী শহরের চিত্রও।

সুতরাং উৎসব আনন্দ যে কতোটা কমে গেলো, তা বলাই বাহুল্য। এমনি করে চললো শহরের হিন্দু জনগোষ্ঠীর পূজা পার্বণ। তারপরেও পূজা হয়েছে, হয়েছে বিসর্জনও।
সেই সময়ের সরস্বতী পূজা এবং প্রতিমা বিসর্জন বিষয়ে আলোচনার জন্যে এযুগের প্রবীণ তিনজনকে কাছে পেয়েছিলাম। এঁরা তিনজনই রাজশাহী বি বি হিন্দু একাডেমীর শিক্ষার্থী ছিলেন। শ্রী ভানুকুমার চৌধুরী, শ্রী দুলালচন্দ্র দাস এবং মহান মুক্তিযুদ্ধা বুলবুলরাণী ঘোষ। ভানুকুমার এবং দুলালচন্দ্র ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেছেন। বুলবুলরাণী ১৯৭০ সালে। এঁদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই শহরেই।

বিভিন্ন সূত্র এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে এইটুকু জানা যায় যে, পূজা হতো রাজশাহী বিবি হিন্দু একাডেমীতে বরাবরই। তাছাড়া রাজশাহী কলেজ, লোকনাথ হাইস্কুল, সার্ভে ইনস্টিটিউট, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আমরা পূজা দেখতে যেতাম। এখন বাংলাদেশ রেলওয়ের হিন্দু কর্মকর্তা-কর্মচারিবৃন্দ রাজশাহীতে প্রতিবছর আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে সরস্বতী পূজা করে আসছেন। তাঁরা এ উপলক্ষে ‘অর্ঘ্য ‘ নামে উন্নত মানের একটি স্মরণিকাও প্রকাশ করেন। এছাড়া বিভিন্ন ক্লাব তো আছেই।

পূজা বিসর্জনের সম্মিলিতধারা জমিদাররাই চালু করেছিলেন। পাকিস্তান আমলেও এ ধারা চালু ছিলো। তখন সরস্বতী পূজার পরদিন দুপুর থেকেই ঢাকঢোল সহ প্রতিমা সাজিয়ে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হতো রাজশাহী কলেজের হেমন্তকুমারী হিন্দু ছাত্রাবাসের সামনে। সবার আগে থাকতো সংস্কৃত কলেজের প্রতিমা। তারপর অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ক্লাবসমুহের প্রতিমা। এতে প্রতিমার সারি সদর হাসপাতাল, এমন কী কোনো কোনো বার ফাইয়ার ব্রিগেড পর্যন্ত চলে যেতো।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা আসা শেষ হলে শুরু হতো শোভাযাত্রা। এই সময় গোটা রাজশাহী শহর প্রায় অর্ধশত ঢাকের সম্মিলিত বাজনায় হয়ে উঠতো চরম উত্তেজনাকর এক ভিন্ন আনন্দের শহর।
এই শোভাযাত্রা সোনাদিঘির মোড় হয়ে উত্তরে গিয়ে সোনাদিঘির শেষপ্রান্তে ছুঁয়ে আবার পূর্বমুখি হয়ে রাণীবাজার বাটার মোড় পেরিয়ে রেশমপট্টিতে গিয়ে আবার মোড় নিতো দক্ষিণদিকে। এরপর সাগরপাড়ার পাশ ঘেষে এসে পৌঁছতো কল্পনা সিনেমা হলের (বর্তমানে কল্পনা সিনেমা হলের নাম স্বচ্ছটাওয়ার) সামনে।

এরপরে নাটোর রোডে এসে এই বিশাল শোভাযাত্রা আলুপট্টির ওপর দিয়ে বোয়ালিয়া থানার পাশ দিয়ে বামে মোড়ঘুরে ঢুকে যেতো কুমারপাড়ার পদ্মাতীরের গোপীনাথ আখড়া বা ওল্ড স্টিমার ঘাটে। (উল্লেখ্য-আলুপট্টির মোড় থেকে কুমারপাড়ার মোড়ের এই বিশাল রাস্তা তখন ছিলো না।) যা এখন মন্নুজান স্কুলের সীমানা বললে সহজে চেনানো যায়। এখানেই দেয়া হতো প্রতিমা বিসর্জন। একের পর এক করে প্রতিমা বিসর্জন দিতে গিয়ে রাত প্রায় শেষ হয়ে যেতো।

এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলতে হয়, এখন এই মাঘমাসে শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নোংরা ড্রেন বা খালের মতো কিন্তু তখনকার নদী ছিলো না। তখন এটিই ছিলো খরস্রোতা বেগবান পদ্মানদী। আজ আমরা দেখি নদী সরে গেছে প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণে।

১৯৭১ সালে আমাদের মহান স্বাধীনতা লাভের পর থেকে রাজশাহীতে যেমন দুর্গাপূজার পরিধি বেড়েছে ; তেমনি বেড়েছে সরস্বতী পূজার সংখ্যা এবং আড়ম্বর। আনন্দ উৎসবের যেন শেষ নেই। এখন পাড়ায় পাড়ায় পূজা, অলিতে গলিতেও পূজা। বিসর্জন দেয় বিক্ষিপ্তভাবে যার যখন ইচ্ছে যার যখন সময়। এতে পূজার সর্বজনিনতা থাকে না। সব পূজাগোষ্ঠী যদি একহয়ে আগের ধারায় পূজার সেই শোভাযাত্রাকে আবার চালু করতেন, তাহলে আমরা আমাদের হারানো ঐতিহ্যকে ফিরে পেতাম, ফিরে পেতাম অনাবিল আনন্দের সেই প্রণবন্ত মুহূর্তকেও।
লেখক: গবেষক, কবি, প্রাবন্ধিক এবং বাংলাদেশ বেতারের একজন সংগীতশিল্পী।