রাজশাহীর সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের গোলাগুলি

আপডেট: অক্টোবর ১৮, ২০১৯, ১:১১ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও চারঘাট প্রতিনিধি


ভারতীয় মৎস্যজীবীকে আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজশাহীর চারঘাট সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজশাহীর চারঘাট সীমান্তে এ গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় বিএসএফের এক সদস্য নিহত ও এক সদস্য আহত হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। এ নিয়ে সীমান্ত এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বিষয়টি মীমাংসা করতে সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধীনে চারঘাট বিওপি থেকে এক কিলোমিটার পশ্চিম দিকে ও সীমান্ত পিলার ৭৫/৩-এস থেকে ৫০০ মিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চারঘাট থানার শাহরিয়ার খাল নামক স্থানে পদ্মা নদীতে মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির অভিযানে তিনজনকে জেলেকে আটক করার চেষ্টা করা হয়। এই সময় দুইজন জেলে ভারতে পালিয়ে যায়। আর ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গী থানার ছিড়াচর এলাকার প্রণব মন্ডলকে চার কেজি কারেন্ট জালসহ আটক করা হয়। এরপর ১১৭ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কাগমারী ক্যাম্প থেকে চারজন বিএসএফ সদস্য স্পিড বোট যোগে অনুমতি ছাড়া শূন্য লাইন অতিক্রম করে অবৈধভাবে ৬০০-৬৫০ গজ বাংলাদেশ অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নদীর এপারে বিজিবি টহল দলের নিকট আসে। সেই সাথে ভারতীয় নাগরিককে ছেড়ে দেয়ার জন্য বলে। বিজিবি টহল দল আটক ভারতীয় নাগরিককে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে জানান। কিন্তু তারা ভারতীয় নাগরিককে বিজিবির কাছ থেকে নিয়ে মারধর করে এবং তাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এতে করে বিজিবি সদস্যরা বাধা প্রদান করলে বিএসএফ সদস্যরা বিজিবির উপর আনুমানিক ৬ থেকে ৮ রাউন্ড গুলি ফায়ার করে। আত্মরক্ষার জন্য বিজিবি টহল দল পাল্টা ফাঁকা ফায়ার করলে বিএসএফ সদস্যরা ফায়ার করতে করতে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে চলে যায়।
বিজিবি জানায়, বৃহস্পতিবার বিকাল পৌনে ৫টা থেকে ৫ টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত ১ বিজিবি ও ১১৭ বিএসএফ ব্যাটালিয়ানের মধ্যে সীমান্ত পিলার ৭৫/৩-এস থেকে ১ কিলোমিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পদ্মা নদীর চর শাহরিয়ার বাধ নামক স্থানে ব্যাটালিয়ান কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১১৭ বিএসএফ ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক কেএস মেহেতা পতাকা বৈঠকে নেতৃত্ব দেন। আর বিজিবির পক্ষে বিজিবি-১ এর অধিনায়ক ফেরদৌস জিয়াউদ্দিন মাহমুদ নেতৃত্ব দেন।
চারঘাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে এখন নদীতে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ অবস্থায় জেলেরা যেন নদীতে ইলিশ শিকার করতে না পারে সে জন্য বিজিবি সদস্যদের নিয়ে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নদীতে অভিযানে যান তিনি।
তিনি আরো জানান, আমরা দেখতে পাই, পদ্মা-বড়ালের মোহনায় বাংলাদেশের সীমানার ভেতর একটি নৌকায় করে তিন ভারতীয় জেলে ইলিশ শিকার করছে। তাদের আটকের চেষ্টা করা হলে দুইজন পালিয়ে যায়। একজনকে আটক করা সম্ভব হয়।
তিনি জানান, খবর পেয়ে বিএসএফ সদস্যরা এসেই গুলি ছোড়া শুরু করে। জবাবে বিজিবিও তখন গুলি ছোড়ে। উভয় পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়। এক পর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা পিছু হটে।
আরিফুল ইসলাম জানান, গোলাগুলির পর আটক ভারতীয় জেলেকে বিজিবির চারঘাট করিডোর সীমান্ত ফাঁড়িতে আনা হয়। তার কাছ থেকে ইলিশ শিকারের জালও জব্দ করা হয়।
বিষয়টি নিয়ে জানাতে গতকাল রাতে বিজিবি-১ এর সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলন করেন অধিনায়ক ফেরদৌস জিয়াউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে পতাকা বৈঠকে উভয় পক্ষ তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়ে একমত হন। এছাড়া এ বিষয়ে আরো আলোচনার জন্য খুব শিগগিরই পতাকা বৈঠক করার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে সীমান্ত এলাকায় সর্তকতার সাথে নিজ নিজ অবস্থান থেকে টহল দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। এ নিয়ে বাড়তি আতঙ্ক তৈরি করার প্রয়োজন নেই বলে উভয় পক্ষ একমত হন।
সাংবাদিকের প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিচয় বিজিবির কাছে প্রেরণ করা হয়নি। এমনকি তাদের পদবি ও পরিচয় জানানো হয়নি।
গতকাল রাত ১০টার দিকে চারঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুমিত কুমার কুন্ডু বলেন, মামলা ও ভারতীয় নাগরিক হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলছে।
তবে ভারতীয় সংবাদসংস্থা এনডিটিভি ও বিবিসি বাংলা জানায়, গোলাগুলির ঘটনায় বিএসএফের এক কনস্টেবল নিহত ও আরেক সদস্য আহত হয়েছেন।
অপর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জি-নিউজের খবরে বলা হয়, নিহত বিএসএফ জ্ওয়ানের নাম বিজয় ভান সিং। তিনি উত্তর প্রদেশের ফিরোজাবাদ জেলার চামারোলি গ্রামের বাসিন্দা। আহত জওয়ানের নাম রাজবীর সিং। তিনি এখন মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সীমান্তে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় জনসাধারণের চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। সীমান্তের দু’পাশেই থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ