রাজশাহী আঞ্চলিক গণিত উৎসব || সহস্র কণ্ঠে গণিতকে সহজ ঘোষণা

আপডেট: ডিসেম্বর ২৩, ২০১৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক



সূর্য উঠলেও কুয়াশা কাটেনি। সঙ্গে আছে বাতাস আর পৌষের শীত। কিছুই ঠেকাতে পারেনি খুদে গণিতবিদদের। এই সকালে এসে ওরা ভরে ফেলেছে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল মাঠ। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই যেন শুরু হয়ে যায় উৎসব। বন্ধুসভার স্টল ও বইয়ের দোকানে তখন উপচে পড়া ভিড়। ঘড়িতে সকাল সাড়ে আটটা বাজতেই মঞ্চে বেজে উঠল জাতীয় সঙ্গীত। শুরু হলো রাজশাহী আঞ্চলিক গণিত উৎসব। এবারের উৎসবে সহস্র কণ্ঠে ঘোষিত হলো সবার কাছে সহজ হয়ে গেছে গণিত।
বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির আয়োজনে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় গতকাল রাজশাহী আঞ্চলিক গণিত উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৯০৩ জন শিক্ষার্থী অংশে নেয়।
উদ্বোধনী পর্বে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী আশরাফ উদ্দিন, আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন, ভেন্যু প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক নূরজাহান বেগম, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পতাকা উত্তোলন করেন ব্যাংকের স্থানীয় ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম। বেলুন উড়িয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে নূর জাহান বেগম এই সুন্দর অনুষ্ঠানের ভেন্যু হিসেবে কলেজিয়েট স্কুলকে বেছে নেয়ার জন্য প্রথম আলো কর্তৃপক্ষকের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। উদ্বোধন শেষে শিক্ষার্থীরা চলে যায় এক ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিতে। এই পরীক্ষা চলাকালীন বাইরে অপেক্ষমান অভিভাবকেরা তাদের আলাপচারিতায় ভিন্ন এক উৎসবে মেতে উঠেন।
বেলা সোয়া ১১টার দিকে পরীক্ষার হল থেকে একে একে বের হতে থাকে শিক্ষার্থীরা। এ সময় মঞ্চে বেজে উঠে গণিতের গান ‘মন মেলে শোন শুনতে পাবি বিজয়ের আহবান, গণিতের ধ্বনিতে বাজে ওই মুক্তির জয়গান’। এই গানের সঙ্গে সঙ্গে যেন সারা মাঠে সত্যিকারের উৎসবের সাড়া পড়ে যায়। কে কার আগে গিয়ে মঞ্চের সামনে বসবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
এরপর শুরু হয় উৎসবের সবচেয়ে মজার পর্ব-প্রশ্নোত্তর। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) এর আর্কিটেকচার বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ইকবাল মতিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালেহ হাসান নকিব। রুয়েটের গণিত বিভাগে অধ্যাপক ফিরুজ আলম, সহকারী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ আব্দুস সামাদ, রাজশাহী নগরের অনন্যা শিশু শিক্ষালয়ের পরিচালক মাসুদ রানা ও রাজশাহী বন্ধুসভার সাবেক সদস্য বর্তমানে পিএইচ ডি গবেষক ফিজার আহাম্মেদ। এই পর্বে শিক্ষার্থীরা মজার মজার প্রশ্ন করে পুরস্কার জিতে নেয়।
একজন শিক্ষার্থীর প্রশ্ন ছিল, ‘আমি একাই জড়বস্তুর সঙ্গে কথা বলি। যখন অংক করি মনে হয় শুধু অংকই করি। আবার কখনো কিছুতেই অংক ভালো লাগে না। আমার কেন এমন হয়?’ একজনের প্রশ্ন ছিল গণিত শিখলে কীভাবে স্বপ্ন দেখা যায়। আরেকজনের প্রশ্ন ছিল গণিত দিয়ে কেন নিজের নাম লেখা যায় না। আকাশের তারাগুলো কেন পাঁচ কোণা বিশিষ্ট মনে হয়, আর আকাশ থেকে পানির ফোঁটা কেন গোল হয়ে পড়ে। মঞ্চে উপস্থিতিরা মজা করে এসব প্রশ্নের উত্তর দেন।
দুপুরের বিরতির পর অনুষ্ঠান শুরু হয় বন্ধুসভার বন্ধু রেজাউল করিমের গান দিয়ে। তার গানের কথা ছিল হার-জিত চিরদিন থাকবে তবু এগিয়ে যেতে হবে। কে প্রথম আর কে দ্বিতীয় ভাবছ কেন মিছে, আসল কথা সামনে যাব রইব না কেউ পিছে’। এই গান দিয়ে রেজাউল করিম বুঝিয়ে দেন এটা প্রতিযোগিতা নয়, এটা উৎসব। কাউকে পিছনে ফেলে নয় সবাই মিলে আমরা এগিয়ে যাব। উপস্থিত সবাই এই গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলায়। কয়েকজন শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানে গান ও কবিতা আবৃত্তি করে শোনায়।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের একাডেমিক কমিটির সদস্য জাহিদ হুসাইন শিক্ষার্থীদের মুখস্থ, মাদক এবং মিথ্যাকে না বলার অঙ্গীকার করান। শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে এই অঙ্গীকার করেন।
উৎসবের সমাপনী পর্বে গণিত উৎসবে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। এতে প্রাথমিক ক্যাটাগরিতে ১২, জুনিয়রে ২৪, সেকেন্ডারিতে ১৭ জনকে পদক ও টি শার্ট দেয়া হয়।