রাজশাহী জজকোর্টে পতাকা তোলা সাহসী আফজাল হোসেন ছবি

আপডেট: মার্চ ২৩, ২০১৭, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

ওয়ালিউর রহমান বাবু



উনিশশো একাত্তরের ১ মার্চ তখন দুপুর একটার সংবাদের পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার বেতার ভাষণে পার্লামেন্ট স্থগিত করলেন। তখুনি প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজশাহী কলেজে অফিস ভবনের সামনের প্রতিবাদ সভার বৃহত্তর ঐক্য থেকে ঘোষণা করা হলো “আর কোন দফা নয়, এক দফা স্বাধীনতা”। পরিস্থিতি হয়ে উঠলো উত্তেজনাকর। রাজশহী কলেজ থেকে মিছিল বের হয়ে পশ্চিম দিকে যেতে থাকলো। ছাত্র-জনতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এক হয়ে গেলো। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাকিস্তানি পতাকায় আগুন দেয়া হতে থাকলো। রাজশাহী নিউ ডিগ্রি কলেজ থেকে বের হয়ে সাহসী ছাত্র নেতা ছাত্র ইউনিয়নের আফজাল হোসেন ছবি মিছিলে যোগ দিলেন। স্লোগান দিয়ে রাজপথ উত্তাল করে তুললেন। কোট চত্বরে জেলা প্রশাসকের অফিসের পাকিস্তানি পতাকা পুড়ানোর পর জজ কোর্টের পতাকা নামানোর কাজটি হয়ে উঠলো ঝুঁকিপূর্ণ। আফজাল হোসেন ছবি এ কাজটি করতে রাজশাহী কলেজের ছাত্র দরগাপাড়ার সাব্বির হোসেন মতিকে সহযোগিতা করলেন। পোড়া পতাকাটির কিছু অংশ লাঠির আগায় লাগিয়ে ছাত্রনেতা চৌধুরী খুরশিদ বিন আলমের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার মিছিলে আফজাল হোসেন ছবি অংশ নিয়ে বেতার কেন্দ্রের সামনে আসতেই বেতার কেন্দ্রের ভিতর থেকে এক সৈন্য অস্ত্র তাক করলে মিছিলটি থমকে গেলো। অনেকে আশেপাশে আশ্রয় নিতে থাকলেন। এই সময় সেনাবাহিনীর এক অফিসার অস্ত্র তাক করা সৈনিকটিকে নিবৃত করলেন। ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া ছাত্র-জনতা আবার মিছিল করে  সিএন্ডবির মোড়ে আসতেই খবর পাওয়া গেলো বর্ণালী সিনেমা হলে উর্দু ছবি “রোড টু সোয়াত” চলছে। আফজাল হোসেন ছবি মিছিলকারীদের সাথে সেখানে গিয়ে সিনেমাটির প্রদর্শন বন্ধ করে দিলেন। জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে মিছিলটি ভুবনমোহন পার্কে এলে প্রতিবাদ সভা শুরু হলো। ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ স্লোগানে  রাজশাহী শহর কেঁপে উঠলো। ছাত্রনেতা আফজাল হোসেন ছবি অন্যদের সাথে আন্দোলন তীব্র করার শপথ নিলেন। সারা উত্তরাঞ্চল প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠলো। পরের দিন থেকে  কর্মসূচি সফল করতে আফজাল হোসেন ভূমিকা রাখতে থাকলেন। ৩ মার্চ হরতাল চলাকালে আফজাল হোসেন ছবির অংশ নেয়া মিছিলটি রাজশাহী শহরের মালোপাড়া টেলিফোন অফিসের সামনে দিয়ে যাবার সময় সেনাবাহিনী দেখে মিছিলে থাকা সকলে উত্তেজিত হয়ে উঠলো। সেনাবাহিনীর ছোড়া গুলিতে এখানে রাজশাহী লোকনাথ হাই স্কুলের ছাত্র সিদ্দিক, কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আনোয়ার হোসেন, সিরোইল হাই স্কুলের নুরূল ইসলাম সহ অনেকে গুলিবিদ্ধ হলেন। আশেপাশের বাড়ি ঘরে আশ্রয় নিলো মিছিলকারীরা। রক্তে লাল হয়ে গেলো রাস্তাটি। ছাত্রনেতা আফজান হোসেন ছবি ঝুঁকি উপেক্ষা করে আহতদের  মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে থাকলেন। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে আহতদের জন্য রক্ত দিতে ভীড় বাড়তে থাকলো। আহত এক অজ্ঞাত তার শরীরের তাজা রক্ত দিয়ে গণকপাড়ার  (সে সময়কার মুসলিম কর্মাশিয়াল ব্যাংক) রুপালী ব্যাংকের দেওয়ালে ‘বাংলা স্বাধীন কর’ রক্ত স্বাক্ষর লিখে উজ্জীবিত করলেন সকলকে। এই লিখাটি ছাত্রনেতা আফজাল হোসেন ছবিকে সাহসী করে তুললো। কারফিউ, সেনাবাহিনীর নির্দেশ উপেক্ষা করে তিনি ভূমিকা রাখতে থাকলেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু দিক নির্দেশনা দিবেন এই কথাটি প্রচার করতে থাকলেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনাটি শুনতে না পেয়ে তার মন প্রতিবাদী হয়ে উঠলো। পরের দিন ৮ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনা শোনার পর অসহযোগ আন্দোলন-প্রতিরোধকে সফল করতে সকলকে উজ্জীবিত করতে থাকলেন। রাজশাহী শহরের মিয়াপাড়া পাবলিক লাইব্রেরীতে জামে উদ্দিন, রুহুল আমিন প্রামাণিক আব্দুল মালেক, সেকেন্দার আবু জাফর, শফিকুর রহমান রাজা, মাহাতাব উদ্দিন, মোর্শেদ কোরাইশী স্বপন, সাইদুল ইসলাম প্রমুখের কাছে ট্রেনিং নিতে থাকলেন। পাশাপাশি বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহ্যিতিক, সাংবাদিক, খেলোয়াড়সহ অন্যদের কর্মসূচিতে সহযোগিতা দিতে থাকলেন। রাজশাহীর পরিস্থিতি পাল্টিয়ে যেতে থাকলো। তরুণ যুবকদের হাতে হাতে এসে গেলো মার্কস, লেলিন, মাওসেতুং, চেগুয়েভারা, নেতাজী সুবাস বোসের বিপ্লবী বই। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সংগ্রাম কমিটি গঠনে আফজাল হোসেন ছবি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ছাত্রনেতাদের সহযোগিতা করতে থাকলেন। হাতের তৈরি বিস্ফোরক ফাটিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোবল দুর্বল করে দেয়া হতে থাকলো।

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রসায়নগার থেকে রাসায়নিক দ্রব্যদি সংগ্রহ করা হলো, অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা চলতে থাকলো। রাতের রাজশাহী শহর হয়ে গেলো গেরিলাদের। ২১ মার্চ সন্ধ্যায় পর খবর পাওয়া গেলো রাজশাহীর শহরের ঘোড়ামারা বোয়ালিয়া থানার পাশে একটি বাড়িতে স্বাধীনতার ইশতেহার ও পতাকার নমুনা এসেছে। খুবই কৌশলে তিনি ছাত্র নেতা আব্দুল করিমকে সঙ্গে নিয়ে সেখান থেকে সেগুলি সংগ্রহ করলেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা শরিফ উদ্দিনের কাপড়ের দোকান থেকে কাপড় নিয়ে পতাকা তৈরি করে ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে ভুবন মোহন পার্ক, রাজশাহী কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ লাইন, মেডিকেল কলেজ, কোর্ট অঞ্চলে পতাকাগুলি তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দর্জ্জি সামশুল গোপনে ছয়টি পতাকা তৈরি করে দিলেন। ২২ মার্চ শোনা গেলো সরকার ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। নানা জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হলো। ২৩ মার্চ জানা গেলো, সরকার বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করছে না। ঝুঁকি উপেক্ষা করে ছাত্রনেতারা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে পতাকা তুললেন। আওয়ামীলীগের কোষাধ্যক্ষ অবাঙালি নেতা হাফেজ আব্দুস সাত্তার ও নিষিদ্ধ ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (ইপিসিপিএমএল)র নেতা ফেরদৌস দৌল্লাহ খান বাবলু ভুবন মোহন পার্কে পতাকা তুলতে সহযোগিতা করলেন। স্বাধীনতাকামী বাঙালি হাবিলদার আতাউর (শহিদ) ডিআইজি মামুন মাহমুদ (শহিদ) এর সহযোগিতায় পুলিশ লাইনে পতাকা তুললেন। ছাত্র জনতার মিছিল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে কোর্ট চত্বরে গেলে ‘জয় বাংলা’ ‘তোমার আমার ঠিকানা..’ সেøাগানে কোর্ট চত্বর উত্তাল হয়ে উঠলো। এখানে থাকা সেনাবাহিনী অস্ত্র নিয়ে পাহারা দিতে থাকলো। তাদের কড়া পাহারার মধ্যেই সিদ্ধান্ত হলো যে করে হোক কোর্ট চত্বরে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলতে হবে। নেতাদের বক্তব্য সকলকে সাহসী করে তুললো। আশেপাশ থেকেও স্বাধীনতাকামীরা আসতে থাকলো। মুক্তযুদ্ধকালিন ভগবানগোলা ক্যাম্পের ইনচার্জ সাবেক ছাত্রনেতা রুহুল আমিন প্রামাণিক মুক্তিযোদ্ধা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সাবেক ছাত্রনেতা শফিকুর রহমান বাদশা, মুক্তিযুদ্ধকালিন গ্রুপ কমান্ডার সাবেক ছাত্র নেতা শফিকুর রহমান রাজার দেয়া তথ্যে জানা যায়, জজকোর্ট ভবনে পতাকা কে তুলবে এই নিয়ে নেতারা কথা বলার মুহুর্তে রুহুল আমিন প্রামাণিক আফজাল হোসেন ছবিকে জজকোর্ট ভবনে পতাকা তুলতে বললে ছাত্র-জনতার মিলিত ঐক্য আফজালকে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ- সাহসী করে তুললো। তিনি দেরি না করে দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেকে মৃত্যুর কাছে সপে দিয়ে পতাকাটি নিয়ে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে জজকোর্ট ভবনের ছাদে উঠে ফ্লাগস্টান্ডে পতাকাটি উড়িয়ে দিতেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে রাজশাহী কোর্ট চত্বর ও আশপাশের এলাকা উত্তাল হয়ে উঠলো।
২৩ মার্চ রাজশাহীতে স্বাধীন বাংলা পতাকা তোলার ইতিহাসের পাতায় রাজশাহীর হড়গ্রাম পাড়ার আব্দুল আজিজ ও আয়েশা বেগমের সাহসী সন্তান আফজাল হোসেন ছবির নাম লেখা হয়ে গেলো। রাজনৈতিক সচেতন পরিবারের সন্তান ঢাকাস্থ হোসেন এন্টারপ্রাইজ সিসি লিমিটেডের মহাপরিচালক মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন ছবি ১৪ জানুয়ারি ঢাকা বেলিরোডে তার অফিস কক্ষে একান্ত সাক্ষাৎকারে বললেন, সেদিন স্বাধীনতাকামী ছাত্র-জনতার বৃহত্তর ঐক্য ও সাহসিকতায় তিনি সাহসী হয়ে ভয়-বাধা-ঝুঁকি উপেক্ষা করে দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেকে সপে দিয়ে সশস্ত্র সেনাবাহিনীর উপস্থিাতিতেই রাজশাহীর জজকোর্ট ভবনে স্বাধীনবাংলার পতাকা উড়িয়ে ছিলেন। সেই ঘটনা তাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে উজ্জীবিত করলো। সেই শক্তি, সেই স্মৃতি আজো তাকে দেশকে ভালোবাসতে অনুপ্রেরণা যোগায়।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক, প্রডিউসার প্রেজন্টার রেডিও পদ্মা রাজশাহী