রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিতির শর্তপূরণ করতেই ক্লাসে আসা!

আপডেট: অক্টোবর ১৯, ২০১৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
ক্লাসে কোনো শিক্ষার্থীর শতকরা ৭৫ ভাগ উপস্থিতি না থাকলে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না। তাই ক্লাসের প্রতি আগ্রহের জায়গা থেকে নয়, শুধুমাত্র উপস্থিতির শর্ত পূরণ করতেই ক্লাসে আসছেন বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটছে এমন ঘটনা। আর ক্লাসের প্রতি আগ্রহ হারানোর কারণ হিসেবে শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতিকে দায়ী করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষকদের অনেকে দুষছেন আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে।
দেশের এ অন্যতম উচ্চবিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্রমেই ক্লাসের প্রতি এভাবে আগ্রহ হারাচ্ছেন। কিছু কিছু শিক্ষকের ক্লাসে মানসম্মত পাঠদান হচ্ছে না বলে দিনকে দিন ক্লাসে উপস্থিতির হার কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। নেহাতই দায়ে পড়ে শুধুমাত্র উপস্থিতির শর্তপূরণ করতেই ক্লাসে আসছেন বেশিরভাগ শিক্ষার্থী। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই ভালো ক্লাস নেন। যাদের ক্লাস বেশ আগ্রহ সহকারেই করেন শিক্ষার্থীরা। তবে সে সংখ্যা খুব বেশি নয় বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, কোনো শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্য বলে বিবেচিত হওয়ার জন্য ক্লাসে শতকরা ৭৫ ভাগ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। তবে ৬০ ভাগ উপস্থিতি থাকলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জরিমানা দিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেতে পারেন। আর কোনো শিক্ষার্থীর এর কম উপস্থিতি থাকলে তিনি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।
শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকই ক্লাসে মানসম্মত পাঠদান করতে পারছেন না। শিক্ষকদের অনেকের ক্লাস লেকচার শিক্ষার্থীদের বোধগম্য হচ্ছে না। শিক্ষকরা নিজেদের মতো করে ক্লাসে লেকচার দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বিষয়টি কোন শিক্ষার্থী কতখানি বুঝতে পারছেন, আদৌ কেউ বুঝতে পারছেন কিনাÑ সে বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না শিক্ষকরা। তাছাড়া বেশিরভাগ শিক্ষকের ক্লাসেই শিক্ষার্থীরা কন্ট্রিবিউট করতে পারে না। ক্লাসে প্রশ্ন করলে অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের প্রতি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া করে থাকেন। ফলে ক্লাসে আলোচিত বিষয় নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে মতামত ভাগাভাগি করতেও আগ্রহ প্রকাশ করেন না শিক্ষার্থীরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব বিভাগে প্রতি ব্যাচে ৫০ এর অধিক শিক্ষার্থী সেসব বিভাগের শিক্ষকরা ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না। ক্লাসের পেছনের সারির বেঞ্চে বসা শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের লেকচারের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে মোবাইল ফোনে ফেসবুক, ইউটিউব ব্যবহার ছাড়াও খাতায় বিভিন্ন ধরনের ছবি আঁকআকির কাজে ব্যস্ত থাকে।
ক্লাসের প্রতি অনীহার বিষয়ে জানতে চাইলে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ¯œাতকোত্তর পর্বের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ক্লাস করতে আমার মোটেও ভালো লাগে না। প্রথম থেকেই শিক্ষকদের ক্লাস লেকচারে সন্তুষ্ট হতে পারতাম না। ফলে ধীরে ধীরে ক্লাসের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। আর শিক্ষকরা যখন ক্লাসে কথা বলে তখন তারাই সর্বেসর্বা। আমাদের কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করেন না তারা। সেজন্য আর ক্লাসে কনট্রিবিউট করি না।’
ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘ক্লাসে যা শিখছি তা বাস্তব ক্ষেত্রে কীভাবে প্রয়োগ করবো, সেই ক্লিয়ারেন্স শিক্ষকরা ক্লাসে দিচ্ছেন না। বাস্তবের সঙ্গে শিক্ষার কোনো মিল নেই। শিক্ষা শুধুই তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর চাকরির বাজারে এ শিক্ষা খুব একটা কাজে লাগছে না। এসব কারণেই মূলত ক্লাস করতে ভালো লাগে না।’
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ক্লাসে ৬০ শতাংশ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক না থাকলে আমি খুবই কম ক্লাসে আসতাম। আমাদের অনেক শিক্ষকের পড়ানোর ধরন আমার পছন্দ নয়। উনারা একটা শিট নিয়ে এসে শুধু পড়িয়েই যান, আমরা লিখেই যাই। এখানে আসলে শেখার খুব বেশি কিছু থাকে না। তবে দুই-একজন শিক্ষক ভালো বোঝান, তাদের ক্লাস করতে ভালো লাগে।’
ক্লাস করতে একদমই ভালো লাগে না উল্লেখ করে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক ছাত্রী বলেন, ‘অনেক শিক্ষকই ভালো জানেন, কিন্তু ক্লাসে ঠিকমতো বোঝাতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে মনোযোগও আকর্ষণ করতে পারেন না। তাছাড়া শিট পড়েই যদি পাশ করা যায় তাহলে ক্লাস করার কী দরকার?’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ও প্রখ্যাত নাট্যজন মলয় কুমার ভৌমিক বলেন, ‘বিষয়টা আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থারই সমস্যা। এটা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের এসে ঘটছে না, শৈশব থেকেই শিশুদের শিক্ষা দেয়া হয় কীভাবে জিপিএ বাড়ানো যায়। যার জন্য ছোটোবেলা থেকে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জানার আগ্রহ তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে না। লেখাপড়াটা শিক্ষার্থীদের কাছে আনন্দদায়ক হয়ে উঠছে না। জানারও তো একটা আনন্দ আছে। সেটা শিক্ষকরা দিতে পারছেন না। ফলে পড়াশোনাটাই বোঝা হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে যদি শিক্ষার্থীরা এমন অভিযোগ করে থাকে তবে সেটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ বর্তমানে কারা শিক্ষক হচ্ছেন? যারা মুখস্থ করে ক্লাসে এসেছে, মুখস্থ করেই পাশ করে গেছে। তারাতো জ্ঞান লাভের আনন্দটা পায়নি। তাই তারাই যখন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের পড়ায় তখন শিট আর মুখস্থের মধ্যেই বিষয়টা সীমাবদ্ধ থাকে। তারাও বুঝে পড়েনি, ফলে ক্লাসে বুঝে পড়ায়ও না। তাই এই সমস্যার জন্য রাষ্ট্র, শিক্ষক, শিক্ষাব্যবস্থা সবাই দায়ী।’
এ বিষয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক বলেন, আমাদের এখানে শিক্ষা পদ্ধতিটা একমুখি হয়ে গেছে। এটাকে দ্বিমুখি করে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীরা বিষয়টি সম্পর্কে কতটুকু অবগত সেটা জেনে তবেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে শিট মুখস্থ করেই ভালো ফলাফল করা সম্ভব হচ্ছে। তাদের মধ্যে থেকেই অনেকে আবার শিক্ষক হচ্ছেন। এসব শিক্ষকরা ক্লাসে শিক্ষার্থীদের কতটুকু দিতে পারছেন তা শিক্ষার্থীরাই ভালো বলতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, আমাদের এ পদ্ধতি সেই শিশুকাল থেকেই চলে আসছে। মারধর করে বা শিক্ষক মারবে এ ভয় দেখিয়ে বাধ্য করে শিশুদের স্কুলে পাঠানো হয় এবং পড়া মুখস্থ করানো হয়। সেই যে মারধরের ভয়ে স্কুলে যাওয়া আর পড়া মুখস্থ করার রীতি সেটা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে হঠাৎ করে পরিবর্তন করা যাবে না। এজন্য দরকার প্রাথমিক পর্যায় থেকে এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘এখন যেভাবে পড়ানো হয় আর যেভাবে পরীক্ষা নেয়া হয় বিষয়গুলো অনেক পুরাতন হয়ে গেছে। যা বর্তমান যুগের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। আসলে আমাদের পুরো শিক্ষা-ব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজানো উচিত। আর আমাদের এ উচ্চশিক্ষা নিয়ে তেমন গবেষণা হয় না। এখন সময় এসেছে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও বৃহৎ আকারে গবেষণা করার।’