রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসন : জনপ্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জসমূহ

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২১, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

মো. আবদুল কুদ্দুস:


মতিহারের সাতশ তেপান্ন একর সমতল ভূমি জুড়ে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ের প্রভাব বাংলাদেশের ছাপান্ন হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়েই। আজও দেশের মানুষ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পরিচয় জেনে তাদের সামনে মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে কথা বলেন। শুধু দেশে নয়, সারা দুনিয়ার একাডেমিক জগতে এর প্রভাব কম নেই। নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ২০১৯ সালের স্কোপাসের জরিপে দেশের এক নম্বর উচ্চ শিক্ষা ও গবেবষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্মান অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর মহাসাফল্যেরই ইঙ্গিত দেয়। সীমানা, শিক্ষার্থী ভর্তি, পাঠদানকৃত বিষয়ের সংখ্যা ও সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের অবদানের দিক থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য প্রফেসর ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু মহোদয়ের নেতৃত্বে কর্মরত নতুন প্রশাসনকে জানাই সুস্বাগতম ও অভিনন্দন।

১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং স্বায়ত্ত্বশাসনসহ নানামাত্রিক সংকটের মধ্যে দিয়ে দিন কাটিয়েছে। সামরিক শাসনে যাতাকলে পদদলিত হয়ে স্বায়ত্ত্বশাসনের সংকটে পড়া এই বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে স্বয়ং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে লিখেছেন:
ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বায়ত্ত্বশাসন শেষ হয়ে গেল। ভবিষ্যতে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ডান্ডা চালাইতে সক্ষম হইবেন। অবস্থা যে কি হবে! বোধ হয় শিক্ষক সমাজ একটু ঘাবড়াইয়া গিয়াছেন। ভয় নাই, কলম ফেলে দিন। লাঠি, ছোরা চালান শিখুন। আর কিছু তেল কিনুন রাতে ও দিনে যখনই দরকার হবে নিয়ে হাজির হবেন। লেখাপড়ার দরকার নাই। প্রমোশন পাবেন, তারপরে মন্ত্রীও হতে পারবেন (১০ই জুলাই, ১৯৬৬, রোববার, পৃ.১৫৬)।
দেশের মানব সম্পদ উন্নয়নের উপর জাতীয় অগ্রগতি নির্ভরশীল। বঙ্গবন্ধু সেই বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশের উন্নয়নে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা বিস্তারের উপর জোর দেন। আর সেই কারণে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের পর ১৯৭৩ সালে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্ত্বশাসন ফিরিয়ে দেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এই আইনের একজন গর্বিত অংশীদার।
জনপ্রত্যাশাসমূহ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশার শেষ নেই। কেউ এটিকে মনে করেন চাকরি পাবার কারখানা। স্থানীয় অনেক নেতা-কর্মীগণ মনে করেন এখানে আমার প্রবল প্রভাব-প্রতিপত্তি অটুট থাকুক। অনেকে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় খোলা থাকলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো চলবে। অন্যথায় নয়। অভ্যন্তরীণ কতিপয় শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মনে করেন গবেষণাকর্ম এবং অফিসিয়াল দায়িত্ব পালন করি বা না করি কর্মপরিবেশ শিথিল করে শুধু মাস শেষে ব্যাংক হিসেবে টাকা জমা হোক। তাদের অনেকেই মনে করেন সন্তান-সন্ততিদের পড়াশোনা আর কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এটি একটি ঊর্বর ভূমি।
শুধু নেতিবাচক নয়, ইতিবাচক ভাবনার এবং কর্ম করার মানবসম্পদও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন। যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মে প্রাণের এই বিশ্ববিদ্যালয় আজও মাথা উচু করে বিশ্বদরবারে জায়গা করে নেওয়ার জন্য প্রাণপণ লড়াই সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এখনো বহু শিক্ষক নিজের অর্থায়নে গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা অফিসের নির্দ্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বাদেও দেশের স্বার্থে এবং শিক্ষার্থীদে কল্যাণে কাজ করে থাকেন।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রত্যাশা একটু ভিন্ন ধরনের। প্রখ্যাত দার্শনিক জন হেনরী নিউম্যান তাঁর আইডিয়া অব ইউনিভার্সিটি শীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বুদ্ধিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে নিজের উৎকর্ষতা অব্যাহত রাখবে। বিশ্ববিদ্যালয় হতে সৃষ্ট জ্ঞানী সম্প্রদায়রা পৃথিবীর সমস্ত রং-এর সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে সক্ষম হবে। তাঁরা অন্যদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কথা শুনবে। যখন বলার প্রয়োজন তখন কথা বলবে। জেগে উঠার প্রয়োজনে জেগে উঠবে। যখন নিশ্চুপ থাকবার প্রয়োজন তখন নিশ্চুপ থাকবে। নিজেকে অন্য জাতি বা গোত্রের কাছ থেকে পৃথক মনে না করে একজন কমন মানুষ হয়ে থাকবে।
স্কলারগণ মনে করেন, শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নয় পৃথিবীর সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে তার আসল রূপে ফিরে আসতে হলে এর নাম রাখা উচিত ইংরেজি `University’র পরিবর্তে Humaniversity। এই Humaniversity শুধু চাকরি বা আবিষ্কারের অর্চণাকারী হবে না। অতি মাত্রায় শুধু শিল্প ও বাণিজ্যের মাধ্যমে মুনাফার কথা বলবে না। মানবতার কথাও বলবে। সবার উপরে মানুষের জয়গান করবে।
চ্যালেঞ্জসমূহ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিশন ও মিশন স্টেটমেন্টস অনুযায়ী সমাজের প্রয়োজনের সাথে শিক্ষা ও গবেষণাকে সঙ্গতিপূর্র্ণ করার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। এসব চ্যালেঞ্জসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’র সাথে তাল মিলিয়ে পাঠ্যক্রম প্রস্তুত এবং শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করা। নৈতিক শিক্ষার উপর যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার আন্তর্জাতিকরণ এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করা। জীবনের সর্বস্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করা এবং প্রশাসনিক ও একাডেমিক সকল পর্যায়ে স্বচ্ছ্বতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ধর্ম, বর্ণ, প্রতিবন্ধিতা এবং বিশ্বাস নির্বিশেষে পারস্পারিক শ্রদ্ধা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করা। উপর্যুক্ত চ্যালেঞ্জসমূহ বাদেও এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমানে কিছু সুনির্দ্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেগুলো হলো:
বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক হলসমূহ খুলে দেওয়া ও পাঠদান শুরু করা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সামনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোভিড-১৯ পরবর্তী সরকারি নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্যাম্পাস খুলে দিয়ে শিক্ষার্থীদের জীবন ও কর্মের নিরাপত্তা নির্বিঘ করা। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের পাঠদান নিশ্চিতকরণে মহান শিক্ষকদের সাশ্রয়ী মনোভাব, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও কৌশল নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ইতোমধ্যে মাননীয় উপাচার্য মহোদয় আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক হলসমূহ খুলে দেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করবে।
স্বাস্থ্যবিধি মানা ও মানিয়ে চলা
বিশ্ববিদ্যালয় খুলার পর সব থেকে বড় সমস্যা হতে পারে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মানিয়ে চলা। বিভিন্ন অঞ্চলের, বিভিন্ন মতের এবং বিভিন্ন পরিবারের শিক্ষার্থীরা পড়াশো করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারুণ্যের কারণে এদের মধ্যে রাগ অভিমানও অনেক বেশি। যেকোনো মুহূর্তে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা পরিহার করতে বিভাগের শিক্ষকদের বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। আবাসিক হল খুলে দিলে সেখানে প্রভোস্ট এবং আবাসিক শিক্ষকদের স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত নিয়মিত তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে। অন্যথায় সামান্য কারণেও হল এবং শ্রেণি কক্ষে বড় ধরনের ঝামেলা তৈরি হতে পারে। শিক্ষক-কর্মকর্তাগণ যেহেতু আগে থেকেই নিয়মিত আফিস করছেন সেক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি একটু কম হবে।
নতুন সেশনে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া ও সেশন জট নিরসন
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের নথি অনুযায়ী আগামী ৪-৬ অক্টোবর ২০২০-২০২১ সেশনের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে এই সেশনের শিক্ষার্থীগণ কোভিড-১৯ এর মহামারী প্রকোপের কারণে তাদের জীবন থেকে একটি বছর হারিয়েছে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সকল শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে একই কারণে প্রায় দেড় বছর সময় নষ্ট হয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নয়া প্রশাসনকে ব্যাপক কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলকে একটি বিশেষ প্রণোদনার আওয়তায় এনে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশাসনিক গতিশলতার ব্যাপারে ভুল ধারণা সৃষ্টি বা অনাস্থা তৈরি হতে পারে।
নিয়োগ ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছরের মাস্টার প্ল্যান (২০১৯-২০৬৯) অনুযায়ী প্রতি দশ বছরের ব্যবধানে গড়ে ১০ শতাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই প্রাক্কলন মোতাবেক ২০৬৯ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুন হয়ে যাবে (মাস্টার প্ল্যান, অধ্যায় ৩, পৃ. ২)। জনবলের ক্রম বর্ধমান এই চাহিদা মেটানোর জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়া একটি চলমান ব্যাপার। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন শিক্ষক নিয়োগের যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে তা গ্রহণ করে নিয়োগ পক্রিয়ায় আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে নতুন প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের জন্য একটি স্বচ্ছ্ব নীতিমালা অবলম্বনও জরুরি প্রয়োজন।
পরিশেষে, নানা কারণে বিগত দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ রয়েছেন নানা ধরনের আশা নিরাশার মধ্যে। নিয়োগ সংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী বনাম স্থানীয় জনতার মধ্যে একটি ভুল বুঝাবুঝির ও সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো খুব সাময়িক ব্যাপার। বর্তমান উপাচার্য জনাব গোলাম সাব্বির তাপু মহোদয় নিযুক্ত হওয়ার পর ক্যাম্পাসে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে এটি এখন চরম সত্যি। তবুও দ্বিধাবিভক্ত ওই সকল শিক্ষকদের এক কাতারে এনে শিক্ষা ও গবেষণা এবং উদ্ভাবনী কাজে সবাইকে একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার পরিবেশ বিনির্মাণ করতে হবে। এতে হয়তো কিছু সময় লাগবে তবুও এর ফলাফল হবে বেশ সুমধুর। তাপু স্যার তাঁর সম্মোহনী নেতৃত্বের গুনে এই সমস্যাগুলো সমাধান করে আমাদের প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বিশ্বদরবারে নতুন করে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরবেন এই প্রত্যাশা রইলো।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বিজনেস স্টাডিজ বিভাগ, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী

shyamoluits@gmail.com