রাজশাহী মেডিকেলের লিফট কেনাকাটা ও রক্ষণাবেক্ষণ II বছরে ২৫ লাখ টাকা ব্যয়েও সচল থাকে না, ১৩ লিফটম্যানের হসিদ নেই

আপডেট: মে ২৭, ২০২৪, ৮:১০ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগীদের ওঠানামায় বর্তমানে মোট ৭ টি লিফট রয়েছে। এরমধ্যে দুইটি লিফট গত তিন বছর আগে স্থাপন করা সুইজারল্যান্ডের এ গ্রেডের লিফট। বাকিগুলো বিভিন্ন গ্রেডের। গণপূর্তের অধীনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রাণ আরএফএল গ্রুপের লিফট শাখা রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রতি বছর ২৫ লাখ টাকার বেশি অর্থ তুলে নেয়। এরপরও লিফটগুলো সারা বছর সচল থাকে না! এতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স, রোগীসহ সেবা সংশ্লিষ্টরা।

রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়ম
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শর্ত অনুযায়ী হাসপাতালের লিফটগুলোর জন্য একজন করে লিফটম্যান থাকার কথা। যারা লিফটগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করবেন। এছাড়া লিফট নষ্ট হলে জরুরি ভিত্তিতে লিফটগুলো মেরামতের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও সেবাপ্রার্থীরা বলছেন, এই ৭ টি লিফটের মধ্যে প্রশাসন ভবনের একটি, পুরাতন বিল্ডিংয়ের আইসিইউ ভবনের একটি ও নতুন আইসিইউ ভবনের একটি লিফট সচল থাকে। বাকি ৪ টি লিফট বছরের অধিকাংশ সময় থাকে নষ্ট। বছরের অধিকাংশ সময় ধরেই মেরামত কাজ চলতেই থাকে।

সরেজমিনে রোববার (২৬ মে) হাসপাতালের প্রশাসন ভবন ঘুরে দেখা যায়, প্রশাসন ভবনের তিনটি লিফটের মধ্যে মাত্র একটি লিফট সচল আছে। বাকিগুলো অচল! এরমধ্যে একটি লিফটের মেরামতের কাজ করছিলেন দুই কর্মী।

তারা জানান, এই দুই লিফটের মধ্যে একটি ১০ থেকে ১২ দিন আগে নষ্ট হয়েছে। আরেকটি কয়েকদিন আগে নষ্ট হয়েছে। মেরামত কাজ চলছে। দু’এক দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে।

১৩ জন লিফট ম্যানের হসিদ নেই
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তত্বাবধানে মোট ১৩ জন লিফটম্যান থাকার কথা। যারা শিফট অনুযায়ী লিফটগুলোর ভেতরে অবস্থান নিয়ে পরিচালনা করবে। কিন্তু রির্পোটারের গত এক বছরের পর্যবেক্ষণে কোন লিফট ম্যানের অস্বিত্ব পাওয়া যায় নি।

এ বিষয়ে হাসপাতালে এক দশকের বেশি সময় ধরে কর্মরত এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি জানান, হাসপাতালে লিফট ম্যানের কথা শুনেছি। কিন্তু লিফট ব্যবহার করতে গিয়ে কখনো দেখি নি। তবে মাঝেমধ্যে মেরামত কাজ করতে দেখেছি।

লিফট কেনাকাটায় জালিয়াতি:
প্রতিষ্ঠানটিতে নতুন আইসিইউর জন্য নতুন একটি লিফট সংযোজন করা হয়। দরপত্র অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনের কথা ছিলো ‘এ’ গ্রেডের ফায়ার প্রটেকটেড’ লিফট। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে ‘সি’ গ্রেডের সাধারণ লিফট স্থাপন করা হয়েছে। এই জালিয়াতির বিষয়টি আলোচনায় আসার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে লিফট অপসারণের জন্য সাত দিনের সময় বেঁধে দেয়ে চিঠি দেয় গণপূর্ত দপ্তর। দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সে লিফট অপসারণ না করায় রোববার (২৬ মে) ঢাকায় বিশেষ মিটিং হয়। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিফট অপসারণ করে নিবেন বলে জানান।

তবে এই লিফট অপসারণ করা হলেও ২০২২ সালের বাজার মূল্য এবং বর্তমান বাজার মূল্যের ফারাকের কারণে সরকার স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক জাকির হোসেন বলেন, লিফট নিয়ে জালিয়াতি হয় নি। ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আমরা শেষ পর্যন্ত লিফট খুলে নিবো। আর ক্ষতিগ্রস্ত আমরা হচ্ছি। সরকার হচ্ছে না। তবে বাজার মূল্যের ফারাকের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না সেটা বাজার যাচাই করলে বোঝা যাবে। আর গণপূর্ত যে লিফটের কথা বলছে, সেটি ৬ তলা ভবনের জন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, আমি এখনো গণপূর্তের কাছে ৬ কোটি টাকার বিল পাবো। সেখান থেকেই লিফটের টাকা কেটে নিবে বলে জেনেছি।

যা বলছে কর্তৃপক্ষ:
এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হায়াত মুহাম্মদ শাকিউল আজমের মুঠোফোনে কল করা হলে বলেন, লিফট তো অপসারণ করতেই হতো। তবে এসব বিষয় নিয়ে মুঠোফোনে আমি কোনো কথাই বলবো না।
গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফজলুল হক জানিয়েছিলেন, চুক্তি বহির্ভুতভাবে যে লিফট স্থাপন করা হয়েছে, এটার মাধ্যমে অর্ধ কোটি টাকার জালিয়াতির প্রচেষ্টা হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী লিফট না দেয়ায় লিফট অপসারণ করার জন্য বলা হয়েছে।

রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফএম শামীম আহম্মদ বলেন, এই লিফট নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খুব শিগগিরই নতুন লিফট স্থাপন করে দিবে বলে জানিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, লিফটম্যান ছিলো। কিন্তু তারা ঠিকমতো ডিউটি করতো না। একারণে আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসে যে ১৩ জন লোক আছে, তাদের রোস্টার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদারকি করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে লিফট ম্যানদের নির্দিষ্ট পোশাক দেয়া হবে। আর লিফটে তাদের ডিউটিও এখন তদারকি করছি। আর লিফটের মেরামত কাজ হতেই থাকে। আমরা সচল লিফট চাই। এজন্য সব সময়ই তাগাদা দিয়ে যাচ্ছি। আর এই ব্যয়টা গণপূর্ত করে থাকে। সুতরাং টাকার বিষয়টা জানা নেই।

এদিকে, প্রাণ আরএফএল গ্রুপের লিফটের প্রতিনিধি মামুন হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায় নি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ