রাজশাহী শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণাগার ।। উদ্যোক্তার অভাবে অকার্যকর প্রযুক্তি

আপডেট: জুলাই ১, ২০১৭, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


উত্তরাঞ্চলে শিল্প প্রতিষ্ঠানে উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগাতে রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত হয় শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণাগার (বিসিএসআইআর)। এরপর এখানকার বিজ্ঞানীরা নিয়মিতভাবে নানা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। কিন্তু উদ্যোক্তার অভাবে পড়ে আছে বেশিরভাগ প্রযুক্তি। নানা জটিলতায় এ অঞ্চলের শিল্প প্রতিষ্ঠানে সেসব প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে অকার্যকর হয়ে পড়ছে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালে রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত হয় বিসিএসআইআর। সহজলভ্য কাঁচামালভিত্তিক শিল্প-কারখানায় প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগাতে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা ১৬৮টি ব্যবহার উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু রাজশাহীতে এসব প্রযুক্তির কোনো চাহিদাই সৃষ্টি করা যাচ্ছে না।
বিসিএসআইআর কর্মকর্তারা বলছেন, এখানে প্রতি বছরই চার থেকে পাঁচটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন হচ্ছে। উদ্ভাবনের তালিকা দিন দিন বড় হলেও মূলত উদ্যোক্তার অভাবে পড়ে আছে অধিকাংশ প্রযুক্তি। এর ফলে রাজশাহীতে স্থানীয় কাঁচামালভিত্তিক শিল্প এলাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ আলোর মুখ দেখছে না।
গবেষণাগারের বিজ্ঞানী ড. মঈন উদ্দীন জানান, উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সবগুলোই বাজারজাতের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু উদ্যোক্তাদের কাছে ইজারা দেয়া গেছে মাত্র ৩৫টি। এ হার মোট উদ্ভাবনের ৫ ভাগের ১ ভাগ। আগ্রহী উদ্যোক্তার অভাবে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে উদ্ভাবিত পণ্যগুলোর মধ্যে যেগুলো ইজারা দেয়া গেছে, তার অধিকাংশই রাজশাহীর বাইরের উদ্যোক্তারা নিয়েছেন।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে উদ্যোক্তা পাওয়া গেছে মাত্র তিনজন। এর মধ্যে বগুড়ার এক উদ্যোক্তা কসমেটিকস সামগ্রীর একটি প্রযুক্তি ইজারা নিয়েছেন। এছাড়া রাজশাহীর মুনলাইট হেলথ অ্যান্ড হাইজিন প্রাইভেট লিমিটেড কসমেটিকস সামগ্রী ইজারা নিয়েছে। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের জিএম ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান ওষুধজাতীয় সামগ্রীর প্রযুক্তি ইজারা নিয়েছে। বাকি ৩২টি প্রযুক্তি ঢাকা ও পূর্বাঞ্চলীয় শিল্পোদ্যোক্তারা ইজারা নিয়েছেন।
ড. মঈন উদ্দিন বলেন, বিভিন্ন জটিলতায় উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ইজারা নিতে আগ্রহী করে তোলা যাচ্ছে না। এছাড়া কিছুটা আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও আছে, যেমন প্রথমে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো প্রধান কেন্দ্রে পাঠাতে হয়। এরপর সেখান থেকে ইজারা দেয়া হয় ওই প্রযুক্তি। তাই স্থানীয়ভাবে কোনো উদ্যোক্তার সঙ্গে তারা যোগাযোগ করতে পারেন না। অনেক সময় উদ্যোক্তা পাওয়া গেলেও স্থানীয়ভাবে কোনো উদ্যোক্তাকে প্রযুক্তি ইজারা দেয়ার এখতিয়ার স্থানীয় বিজ্ঞানী বা প্রধানের নেই।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রযুক্তি ইজারার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না থাকলে হয়তো উদ্যোক্তা বাড়ানো যেত। এছাড়া এ অঞ্চলের মানুষ কৃষিজীবী হওয়ায় তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতি ঝোঁক কম। এজন্যও উদ্যেক্তা পাওয়া যায় না। অন্যদিকে শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির বাজারজাতের অনুমতি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) দিতে চায় না।
এ বিষয়ে রাজশাহীর মুনলাইট হেলথ অ্যান্ড হাইজিন প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান সমন্বয়ক ও বিসিএসআইয়ের সাবেক গবেষক আব্দুস সবুর বলেন, ‘শিল্পোদ্যোক্তারা অনেক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হলেও দাফতরিক নানা জটিলতায় পরবর্তীতে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।’
তিনি বলেন, ‘বিসিএসআইআর থেকে উদ্ভাবিত পণ্যগুলো নিজেদের তালিকায় না থাকায় বাজারজাতে অনুমোদন দিচ্ছে না বিএসটিআই। প্রতিষ্ঠান ও পণ্যের জন্য বিএসটিআই, পরিবেশ অধিদফতরসহ বিভিন্ন সরকারি দফতরের অনুমোদন সবচেয়ে ঝামেলা সৃষ্টি করে। তবে বিসিএসআইআর উদ্ভাবিত সব পণ্যের বাজারজাতে এসব দপ্তরের সহযোগিতা পেলে সমস্যা থাকবে না।’
বিএসটিআই রাজশাহীর পরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, ‘শিল্পে বাধা প্রদান নয়, মানসম্মত পণ্য যাতে সবাই পায় সেজন্য বিএসটিআইয়ের একটি তালিকা রয়েছে। সে তালিকা অনুসারে পণ্য যাচাই-বাছাই করা হয়। তবে কোনো পণ্য তালিকার বাইরে থাকে এবং সঠিক মানের না হয় সেগুলো তো বিএসটিআই অনুমোদন দেবে না। এছাড়া কোনো পণ্যের মান সঠিক থাকলে কেন বাধা দেয়া হবে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্যোক্তা হাকিম আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সহজ শর্তে ও কম খরচে যাতে উদ্যোক্তারা ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হন, সেদিক খেয়াল রেখে উদ্যোক্তাদের সুযোগ করে দিতে হবে। তাহলে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন বাড়বে, তেমনি ক্ষুদ্র শিল্প-কারখানাও গড়ে ওঠবে।’
বিজ্ঞানীরা বলছেন, উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহারে শিল্প-কারখানার ব্যয় খুব কম হয়। সাধারণত একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে ইজারা বাবদ যে অর্থ দিতে হয়, তার বাইরে শিল্পপ্রতিষ্ঠানভেদে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে করতে হয়। নিজস্ব অর্থায়নে শিল্পপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করতে হয় ইজারা গ্রহণকারীকে। তবে যাবতীয় পরামর্শ দেন গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা।
বিসিএসআইআরের পরিচালক বিজ্ঞানী ড. হুসনা পারভীন নূর বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তাসহ যথেষ্ট সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে। তবে বিসিএসআইআরের প্রধান কেন্দ্র থেকে যথাযথ পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ বিজ্ঞান ও গবেষণাগার শুধু রাজশাহী নয়, সব মিলিয়ে হাজারখানেক প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয়েছে। তবে সেগুলো বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। আর্থসামাজিক উন্নয়নে দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার ও দেশীয় বিজ্ঞানীদের প্রতি আস্থা রেখে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’
১৯৬৮ সালে বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারের একটি ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এ গবেষণাগারের নাম ছিল ‘নর্থ-ইস্ট রিজিওনাল ল্যাবরেটরি’। স্বাধীনতার পর গবেষণাগারের নাম বদলে রাখা হয় বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণাগার (বিসিএসআইআর) রাজশাহী। দেশের উত্তরাঞ্চলের সহজলভ্য কাঁচামালভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্থানীয় কাঁচামালের যথাযথ ব্যবহার, কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য কাজ শুরু করে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগার রাজশাহী শাখা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ