রাজশাহী সংগীতাঙ্গনের এক নিবেদিত প্রাণ পুরুষ

আপডেট: ডিসেম্বর ২৬, ২০২১, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ


খন্দকার মো. আব্দুস সামাদ


শ্রী যতন কুমার এক সংগীতানুরাগী পরিবারের কৃতি সন্তান। সংগীতের আবহে তিনি বড় হয়েছেন। যতনকুমার পালের প্রয়াত পিতা জগন্নাথপাল ছিলেন; রাজশাহীর একজন প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী। আমি ব্যক্তিগতভাবেও জগন্নাথ পালের ভীষণ ভক্ত ছিলাম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য আমার সংগীত বিদ্যালয়ে ওঠাবসা করতেন। তিনি মনসামঙ্গল ও পদ্মপুরান গান গাইতেন। তাঁর কাছ থেকে আমি কিছু মনসামঙ্গল ও পদ্মপরান গান শিখেছিলাম। বস্তুতঃ অনেক সংগীতানুষ্ঠানে সেসব গান আমি পরিবেশনও করেছি। মনসামঙ্গল ও পদ্মপুরণ গানের তিনি ছিলেন অপ্রতিন্দ্বী গায়ক। তাঁর জ্যাঠামশাই প্রয়াত রঘুনাথ পাল বাবু ভাল খোলবাদক ছিলেন। হাত ছিল অত্যন্ত মিষ্টি। তাঁর বাদন পদ্ধতি ছিল শোনার মত, দেখার মত। এক কথায় বলা যায়, খোল জাতীয় যন্ত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী। বংশপরম্পরায় তাঁরা ছিলেন রং তুলির শিল্পী। রং তুলি নিয়ে সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকতেন। মাটি দিয়ে বিভিন্ন দেব-দেবীর ছবি আঁকতেন এবং পুতুল তৈরি করতেন। এজন্য তিনি এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর প্রতিবেশী অনেকের উৎসাহ ও পরামর্শে তিনি রাজশাহী চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু সঙ্গীতের প্রবল আকর্ষণে তিনি আর্ট কলেজের কোর্স সমাপ্ত করতে সক্ষম হন নি।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, যতনকুমার পাল এই পরিবারের সদস্যদের অনুপ্রেরণায় ছোট বেলা থেকেই তবলা বাদন শিখতে শুরু করেন। সুন্দর সু-মধুর বাদন, নানান ছন্দে মা প্রাণকে আকুল করে তোলে, তাঁর বাদনে শিল্পী গান বড় আনন্দ অনুভব করেন। বস্তুতঃ আমার গানের স্কুলেও ওঠাবসা করতেন। ছাত্র/ছাত্রীদের সঙ্গে সঙ্গত করতেন। বাংলাদেশ বেতার, রাজশাহী কেন্দ্রে আমার গানের অনুষ্ঠানে তিনি অনেকবার তবল সঙ্গত করেছেন। তিনিও রং তুলির শিল্পী। সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকেন।

পরম পূজনীয় শিক্ষাগুরু অপূর্বনারায়ণ চৌধুরী ভৈরব, অশোক কুমার সান্যাল পরেশ ও বাংলাদেশের খ্যাতিমান ওস্তাদ কামরুজ্জামান মণির নিকট নিবিষ্টমনে তবলা বাদন শিখেছেন। শ্রী যতন কুমার অত্যন্ত ভদ্র, নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। তিনি কথায় কথায় অনেকের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা স্বীকার করলেন। যেমনÑগীতিকার, সুরকার ও শিল্পী খন্দকার মোহাম্মদ আব্দুস সামাদ, হাফিজুর রহমান লাবু, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী রাজশাহীর সাবেক জেলা সংগঠক সুখেন মুখোপাধ্যায়, বিশিষ্ট চিত্র শিল্পী ও কবি-গীতিকার আশফাকুল আশেকীন এবং তবল বাদক শিল্পী গৌতমকুমার মোদক, তাঁর বন্ধুবর শিল্পী ডা. জগৎ এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

শ্রী যতনকুমার পাল বিভিন্ন সংগীতানুষ্ঠানে বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে তবলা সঙ্গত করে ভূয়শী প্রশংসা অর্জন করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম একুশে পদকপ্রাপ্ত পণ্ডিত অমরেশরায় চৌধুরী, উস্তাদ আব্দুল মালেক খান, প্রয়াত পণ্ডিত রঘুনাথ দাস, পণ্ডিত শিবনাথ দাস, শ্রীমতি মঞ্জশ্রী রায়, ওস্তাদ রবিউল হোসেন, ওস্তাদ সাইমুদ আলী খান, গঙ্গানারায়ণ রায়, বুদ্ধুবাবু প্রমুখ ব্যক্তিগণের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
যতনকুমার পালের জন্ম রাজশাহীতে ২১শে অগ্রহায়ণ ১৩৭৪ বাংলা মোতাবেক-ইংরেজি ৮ ডিসেম্বর ১৯৬৪ সাল। পিতা স্বর্গীয় জগন্নাথ পাল, মাতা শ্রীমতি শোভারাণী পাল। তাঁরা বর্তমান ঠিকানা রাজশাহী কোর্ট, হড়গ্রাম বাজার, থানা- রাজপাড়া, জেলা- রাজশাহী বাড়ি নং- ২৬৯।

শ্রী যতনকুমার পাল

শ্রী যতন ১৯৯১ সনে পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ব ভারতীতে কিছুদিন থাকাকালীন সেখানকার অনেক গুণি সংগীত সাধকের স্নেহ সান্নিধ্যে ধন্য হয়েছেন। তালিম নিয়েছেন, আশীর্বাদ লাভ করেছেন। এছাড়াও শান্তি নিকেতনে বিখ্যাত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী ও অধ্যাপক পণ্ডিত মোহনসিং খানগুরা এবং কোলকাতার পণ্ডিত তুষার দত্তের সাথে তবলা বাজিয়েও যথাযোগ্য মর্যাদা অর্জন করেছেন। প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
যতন কুমার ১৯৯৬ থেকে বাংলাদেশ বেতার, রাজশাহী কেন্দ্রে নিয়মিত একজন তবলাবাদক শিল্পী। বর্তমান ‘ক’ শ্রেণির একজন তবলাবাদক। এছাড়াও বাংলাদেশ বেতার রাজশাহী কেন্দ্রের একজন আধুনিক ও পল্লীগীতির সঙ্গীত শিল্পী।
যতন সঙ্গীত প্রশিক্ষকও। বিভিন্ন সঙ্গীত শিক্ষালয়ে সঙ্গীতে প্রশিক্ষকের কাজ করে আসছেন। বিদ্যালয়গুলি হলো- সঙ্গীতাশ্রম, শিল্পাশ্রম, রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ সারদা, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত তবলাবাদক।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, তাঁর হাতেগড়া অনেক ছাত্র-ছাত্রী জাতীয় শিশু সঙ্গীত প্রতিযোগিতায়, টেলিভিশন নতুন কুঁড়ি শিশু প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত হয়েছেন।

প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত সাধক পণ্ডিত অজয় রায় চৌধুরী ও শ্রী মতি মঞ্জুশ্রী রায়ের সাথে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে নিয়মিত তালিম নিচ্ছেন। ও সঙ্গঁও ও করে আসছেন। শ্রী যতন কুমার পাল ২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত “নরও য়ে” সফর করেন। নরওয়ের ক্রিষ্টানস্যান্ড ও রাজশাহী কেন্ডসলীপ কমিটির আশুরিক বন্ধুত্বপূর্ণ আমন্ত্রণে সপ্তাহ ব্যাপী অনুষ্ঠান মালায় অংশ গ্রহণ করে প্রশংসিত হয়েছে।
তাঁর সম্মাননা ঝুড়িও অনেক ভারী। উল্লেখ করার মতই। সম্মাননা পেয়েছেন, লক্ষীদাস চাকী স্মৃতি পদক পাবনা;
ওস্তাদ মোজাম্মেল হোসেন স্মৃতি সম্মাননা স্মারক, হিন্দোল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী রাজশাহী ; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগ আয়োজিত আন্তর্জাতিক সঙ্গীত সম্মেলন ২০১৬ সম্মাননা স্মারক; একুশে পরিষদ নওগাঁ থেকে সুরসাধক ভবেশ চ্যাটার্জী সম্মাননা স্মারক এবং শ্রী সংগীতালয়, বোয়ালিয়া পাড়া, রাজশাহী কর্তৃক সংবর্ধনা।

যতন কুমারপাল ব্যক্তিগত জীবনে একজন সুখি মানুষ। স্ত্রী প্রতিমাপাল ও কন্যা পার্বতী পালকে নিয়ে তাঁর ছোট সংসার। এই গুণি শিল্পীর কথাবার্তায় অত্যন্ত নমনীয় ও কমনীয়। আলাপচারিতায় অন্যের মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়। যতনকুমার পালের সাথে আমরা মামা-ভাগ্নে সম্পর্ক। সে সম্পর্ক বড়ই মধুর।
এই শিল্পীর মনের কথা বলেই আমি আমার লেখা শেষ করবো ‘অভিনন্দন নয়, প্রশংসা নয়Ñনয় কোনো সংবর্ধনা, মানুষের ভালবাসা পেতে চাই আমি। চাই শুধু শুভ কামনা।’
এই গুণি শিল্পীর সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন কামনা করি।
লেখক: গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত প্রযোজক ও স্ত্রিপ্ট রাইটার, বাংলাদেশ বেতার, রাজশাহী