রাজশাহী সার্ভে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়েই চলছে ৩৮ বছর

আপডেট: জানুয়ারি ১১, ২০১৭, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক



রাজশাহী সার্ভে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের সংকট সমাধান হচ্ছেই না। প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও কর্মচারীর অভাবে ধুঁকে ধুঁকে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়েই চলছে ৩৮ বছর ধরে। ২৭ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষকও নিয়োগ দেয়া হয়নি। পদোন্নতি দেয়া হয়নি কোনো শিক্ষকদের। প্রকৌশল বিদ্যা শেখানো হলেও নেই ল্যাব ইনচার্জ। নেই শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থাও।
ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, ১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত সবচেয়ে প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠে এখনো জরাজীর্ণ ভবনেই চলছে পাঠদান। রাজশাহী জেলা পরিষদ পরিচালিত ৪০০ শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানে ১৬টি পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন সাতজন। এদের মধ্যে এবছরেই আরো দুইজন শিক্ষক অবসরে যাবেন। তখন শিক্ষক দাঁড়াবে ৫ জন।
সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটিতে ১৯৮৮ সালের পর থেকে কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়নি। যারা অবসরে গেছেন তাদের গ্রাচুইটি ভাতাও দেয়া হয়না। ‘ম্যাথমেটিক্সের’ শিক্ষক না থাকায় অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তিনজন শিক্ষক। কিন্তু তাদের কোনো সম্মানী ভাতা দেয়া হয়না।
সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটিতে ১৯৭৭ সাল থেকে অধ্যক্ষের পদ শূন্য। তখন থেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাকার্যক্রম। শিক্ষকদের পদোন্নতি না দেয়ায় এই অচলাবস্থা বিরাজ করছে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো ধরনের কর্মচারী নেই। কেরানি থেকে শুরু করে প্রধান সহকারী, উচ্চমান সহকারী, সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটরসহ সব পদ শূন্য। কারিগরি প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো ল্যাব ইনচার্জ। কর্মচারী না থাকায় শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো থেকে শুরু করে দাফতরিক সব কাজ করেন শিক্ষকরা।
শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী সার্ভে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট সারাদেশে বিদ্যমান দুইটি সার্ভে ইঞ্জিনিয়ারিঙের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন বিদ্যাপীঠ। এই একমাত্র প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহী জেলা পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত। গত ১৯৮৯-৯০ সালের দিকেও এই প্রতিষ্ঠানে সার্ভে ইঞ্জিনিয়ারিঙের পাশাপাশি সিভিল ও মেকানিক্যাল বিষয়ে পাঠদান করা সম্ভব হত। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে তা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। নতুনভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া না হলে সার্ভে ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের পাঠদানও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
শিক্ষকরা বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অধীনে যেতে আইনত কোনো বাধা নেই। জেলা পরিষদও তা চায়। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষামন্ত্রণায়ের অধীনে ন্যাস্ত করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানান তারা।
অথচ এরই মধ্যে গত ২০১৪ সাল থেকে জেলা পরিষদ হুট করে ইনস্টিটিউটের উন্নয়ন ফি’র নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ও ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তির সময় প্রতিষ্ঠানে জমা দিতে হয় ১৪ হাজার ৭০ টাকা। এর মধ্যে আছে জেলা পরিষদ কর্তৃক নির্ধারিত উন্নয়ন ফি’র ১০ হাজার টাকা। এই ১৪ হাজার ৭০ টাকার মধ্যে জেলা পরিষদে জমা দিতে হয় সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। বেতন বাবদ প্রতি ৬ মাস অন্তর একজন শিক্ষার্থীকে দিতে হয় ২০৭০ টাকা। যার মধ্যে জেলা পরিষদের ফান্ডে জমা হয় ১৫০০ টাকা। বাকি ৫৭০ টাকা সেশন চার্জ হিসেবে প্রতিষ্ঠানে জমা হয়। অথচ গত তিন বছর আগেও প্রতিষ্ঠানের ভর্তি ফি ছিল নামমাত্র। সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ৪০০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। কিন্তু ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে জরাজীর্ণ ভবনে দোতলা ও টিনশেড মিলে শিক্ষার্থীর আবাসন রয়েছে ৩০/৩২ জনের।
রাজশাহী সার্ভে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আনোয়ার জাহিদ। তিনি ১৯৮৮ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি এই বছরেই অবসরে যাবেন। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের এই দুরাবস্থার কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত আছেন। এই প্রতিষ্ঠান অনেকবার শিক্ষামন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত হতে গিয়েও শুধুমাত্র জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে হয়ে উঠে নি। তবে সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের চেষ্টায় নওদাপাড়া বাস টার্মিনালের বিপরীতে ৩ একর জায়গার ওপর ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন একটা প্রকল্প চালু করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
তিনি জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের সংকট নিরসন হবে। যেখানে শিক্ষকদের থাকার জন্য ডরমিটরি, শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য আবাসন ব্যবস্থাসহ ক্লাসরুমের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকবে। তখন এই সংকট কেটে উঠবে বলে মনে করেন তিনি। তবে তিনি দ্রুত শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আর্কষণ করেন।
জেলা পরিষদের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জেলা পরিষদকে সরকার কোনো অর্থ দেয় না। নিজস্ব আয়ে চলতে হয়। সরকার থেকে কোনো অর্থ না দেয়ায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ফি বাবদ ১০ হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে। এই অর্থ নেয়া না হলে প্রতিষ্ঠানটি এতদিন বন্ধ হয়ে যেত। তবে এই উন্নয়ন ফি বাবদ নেয়া টাকাকে তিনি অতি অল্প বলে মনে করেন। এটা ৫০ হাজার টাকা হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। তিনি জানান, সরকার থেকে বলে দেয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ নিয়ে চালাতে পারলে চালান না পারলে বন্ধ করে দেন।
শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে তিনি বলেন, কোনো পরিকল্পনা নাই। ২০১৮ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষক অবসরে যাবে। তখন এমনিতেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। তবে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটিকে শিক্ষামন্ত্রণালয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। শিক্ষামন্ত্রণালয়ে নিলে এইসব কোনো সমস্যা আর থাকবে না।