রাজাকার দমনের জন্য ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম

আপডেট: ডিসেম্বর ১৩, ২০১৬, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

রাশেদুল হক ফিরোজ, বাগমারা



পাকসেনারা বাগমারার আশেপাশে গ্রামে প্রবেশ করে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। এতে সহযোগিতা করে আলবদর, আল শামস ও রাজাকার বাহিনী। এদের প্রতিরোধ করতেই দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে কৃষক, মজুর, কুলি, শিক্ষকসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষজন। সেই সময় তাহেরপুরের কয়েকজন যুবকসহ এদেশের হাজার হাজার মানুষের মতো ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেয় ইউসুফ আলী খন্দকার। তার ডাক নাম বুলবুল। তার বাড়ি বাগমারা উপজেলার তারেপুর। তার বাবার নাম মৃত গিয়াস উদ্দিন।
ইফসুফ আলী খন্দকার বলেন, মিলিশিয়াদের গুলিতে মরার চেয়ে দেশ রক্ষায় শক্রুদের সাথে লড়েই মরবোÑএমন প্রতিজ্ঞা নিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার জন্য চার সহপাঠীসহ ভারতে যাই। আমাদের সঙ্গে ছিল তাহেরপুর পৌরসভার বিষুপাড়ার মাহাবুর, আনোয়ার, তাহেরপুরের ফজলু খন্দকার। সবাই একসঙ্গে নওগাঁ জেলার পোরশা উপজেলা হয়ে ভারতের চন্ডিপুর স্টেশনে পৌঁছাই। এরপর মালদহ শহরে। মালদহে আমাদের জানাশুনা কেউ ছিল না। আমাদের মধ্যে আনোয়ার ও ফজলু প্রথমে মুর্শিদাবাদ চলে যায়। পরে আমি ও মাহাবুর সেখানকার নিমতলার জয়বাংলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ভর্তি হই।
ইউসুফ আলী খন্দকার বলেন, কাতলামারী প্রাইমারি স্কুলে ক্যাম্প ছিল। পাকসেনাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সেখানে মাসখানেক প্রশিক্ষণ নেয়া হয়। আমাদের গ্রেনেড বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরপর শেখপাড়া প্রাইমারি স্কুলে আরো এক মাস প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ওখান থেকে চার কিলোমিটার দুরে পানিপিয়া গ্রামে আবার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ওখান থেকে বিহার রাজ্যে গিয়ে রাইফেল, এসএমসি, এলএমজি, এসএলআর, মর্টারসহ অস্ত্র বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। প্রশিক্ষণ শেষ করে কাজিপাড়া নামকস্থানে পাক-মিলিশিয়াদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয়। এরপর মেজর গিয়াসের নেতৃত্বে লালগোলা সীমান্ত পার হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর, বাবলাবনা, সুজন একাডেমিসহ কয়েকটি স্থানে মিলিশিয়াদের ওপর আক্রমণ করি। সেইদিনের সেই সম্মুখযুদ্ধে একজন রাজাকারকে অস্ত্রসহ ধরতে সক্ষম হয়েছিলাম। ‘হয় মরো না হয় বাঁচো’ এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলাম সম্মুখযুদ্ধের প্রাক্কালে। সেদিনের কথা ভেবে আজো গা শিউরে ওঠে। ওই এলাকার যুদ্ধ শেষে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করি। প্রশিক্ষন নেয়া হলেও বাগমারা, দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় রাজাকার ও পাকসেনাদের ভয়ে ভিত থাকতে হয়েছে। দুর্গাপুরের পানানগর গ্রামের একটি স্থানে প্রায় ১০/১৫ দিন লুকিয়ে থাকার পর বাগমারায় আসি।
ইউসুফ বলেন, বাগমারা উপজেলার হামিরকুৎসা ইউনিয়নের হামিরকুৎসা গ্রামের আব্বাস আলী খাঁ এর বাড়িতে অবস্থিত একটি শক্তিশালী মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করি। যুদ্ধে আব্বাস আলী খাঁ মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আগলে রাখেন তিনি। ওই বাড়ি থেকে রাজাকার ও মিলিশিয়াদের দমন করার জন্য নাটোরের সড়কুতিয়া গ্রামে অপারেশন চালিয়ে কয়েকজন রাজাকারকে ধরে নিয়ে এসে তাদের খতম করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল তাহেরপুর এলাকায় চলে এক নারকীয় তান্ডব। শান্তি কমিটি খ্যাত রাজাকারদের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে সেদিন পাকিস্তানি হায়েনারা তাহেরপুর থেকে সাধনপুর যাওয়ার রাস্তার পাশে ১৩জন হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ ১৭ জনকে রাইফেলের গুলি ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেদিন হত্যা করা হয়েছিল প্রমোদনাথ প্রামানিক, সুরেন্দ্রনাথ, নীরোধদেব ও মানিক চন্দ্র দাশ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকায় নদীপার করে দেয়ার অপরাধে সাধনপুর গ্রামের আব্দুল খালেককে জীবন্ত কবর দেয় রাজাকাররা। শান্তি কমিটির এক নেতার নির্দেশে খালেককে দিয়ে গর্ত খুঁড়িয়ে নিয়ে ওই গর্তেই তাকে ফেলে মাটি চাপা দিয়ে হত্যা করার ভয়াবহতার কথা মনে পড়লে এখনো চোখে পানি এসে যায়। তারপর বাগমারা থানার বিভিন্ন স্থ্ানে রাজাকাররা পাকবাহিনীদের সঙ্গে নিয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। সেদিন তারা তাহেরপুরের অনেকস্থানে ও গোয়ালকান্দি হিন্দুপাড়ায় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ