রাজাকার মুসার অপরাধের তদন্তে নেমেছে ট্রাইব্যুনাল || নির্মম হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন এলাকাবাসি

আপডেট: জানুয়ারি ১০, ২০১৭, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক



একাত্তরে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বাঁশবাড়িয়া, পশ্চিমভাগ ও গোটিয়া গ্রামে আদিবাসী ও বাঙালিদের ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানোর ঘটনায় তদন্তে নেমেছে আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগ চালানোর অভিযোগে আব্দুস সামাদ মুসা ওরফে ফিরোজ খাঁ ওরফে মুসা রাজাকারের বিরুদ্ধে এই তদন্ত করছে সংস্থাটি। মুসার হাতে নিহত পশ্চিমভাগ গ্রামের শহিদ আবদুস সামাদের স্ত্রী রাফিয়া বেগমের দাখিলকৃত অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই তদন্তে নেমেছে সংস্থাটি।
এরই প্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার দিনভর এলাকায় ঘুরে ঘুরে তদন্ত করেন আর্ন্তজাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের সদস্যরা। তদন্ত দলের তদন্ত কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরিদর্শক ফারুক হোসেন মুসা রাজাকারের হত্যাযজ্ঞের তদন্ত শেষে জানান, এর আগে গত ২৭ জুলাই রাজশাহীর সার্কিট হাউসে এ ঘটনার সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। এবার ঘটনাস্থল ঘুরে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের প্রথম দিন বাঁশবাড়িয়া, পশ্চিমভাগ, আটভাগ, ধোকরাকুল ও গোটিয়া গ্রামে পরিদর্শন করে সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। সাক্ষ্য দিয়েছেন মুসার হাতে নিহত বাঙালি ও আদিবাসীদের স্বজনরা।
ফারুক হোসেন বলেন, ঘটনাস্থল ঘুরে ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে নিঃসন্দেহ হওয়া যাচ্ছে যে, মুসা একজন যুদ্ধাপরাধী এবং মানুষ হত্যাকারী।  এসময় সহকারী তদন্ত কর্মকর্তা নাজমুল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় প্রবীণ এলাকাবাসীর বর্ণনা ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৪ সালে বাঁশবাড়িয়া গ্রামের আদিবাসীদের সঙ্গে জমি বিনিময় করে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘি থানার ইসলামপুর গ্রামের আব্বাস আলীর পুত্র আব্দুস সামাদ মুসা ও তার নিকট আত্মীয়দের নিয়ে পুঠিয়ায় এসে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আব্দুস সামাদ মুসার বয়স তখন ছিলো ২০ থেকে ২২ বছর। ওই বয়সে আব্দুস সামাদ পাকিস্তানের পক্ষে এলাকার যুবকদের নিয়ে একটি দল গঠন করে।
একাত্তরের ১২ এপ্রিল পাকহানাদার বাহিনী পুঠিয়া আক্রমণ করে মানুষ হত্যা ও অগ্নিসংযোগ শুরু করলে মুসা হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। সে ১৯ এপ্রিল ৩০-৪০ জন হানাদার বাহিনী নিয়ে যায় বাঁশবাড়িয়া গ্রামে।  সেখান থেকে তারা ২১ জনকে আটক করে। তাদের নিয়ে রাখা হয় গোটিয়া গ্রামের স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের বাড়িতে নিয়ে। সেখানে দিনভর নির্যাতন করে ১৭ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়। চারজনকে হত্যা করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে একজন ছিলেন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র নূরুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি বাঁশবাড়িয়া বাজারে পল্লী চিকিৎসক হিসেবে ওষুধ বিক্রি ও রোগি দেখেন।
পল্লী চিকিৎসক নূরুল ইসলাম জানান, তখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। তার সঙ্গে তার বাবা ইসমাইল হোসেন, বড় ভাই আকরাম আলীকেও আটক করা হয়েছিলো। সারাদিন নির্যাতন করে রাত ১০টায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। সেখানে গুলি করে হত্যা করা হয় চারজনকে।
রাফিয়া বেগমের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ও নূরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্গাপুরের নমিক ফকিরের ছেলে মফিজ উদ্দিন, পুঠিয়ার গোটিয়া গ্রামের মানিক সরদারের দুই ছেলে জাফর আলী ও আদম আলী এবং শুকদেবপুরের মেরা হাজীর ছেলে সিরাজ উদ্দিনকে মুসা চোখ বেঁধে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়। পরে সে হানাদার বাহিনীকে জানায়, এরা পাকিস্তানের শত্রু মুক্তিযোদ্ধা। তখন তার নির্দেশে তাদের গুলি করা হয়। এরপর তারা মাটিতে পড়ে ছটফট করতে থাকলে মুসা তাদের হাত পায়ের রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর মুসার নির্দেশে পশ্চিমভাগ মাদ্রাসার সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় আক্কেল আলীর ছেলে আব্দুস সাত্তারকে। এরপর মুসা পশ্চিমভাগ সাঁওতালপাড়ার গিয়ে ধন্যাঢ্য আদিবাসী লাডে হেমব্রমের বাড়িতে গিয়ে অগ্নিসংযোগ করে লুটপাট করে। মুসা নিজেই তরবারি দিয়ে লাডে হেমব্রমকে হত্যা করে। এরপর হানাদার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে মুসা হত্যা করে মংলা সরেনের ছেলে জটু সরেন ও মুন্সি মার্ড্ডির ছেলে টুনু মার্ড্ডিকে। এরপর পুঠিয়া-তাহেরপুর সড়কে এসে মুক্তিযোদ্ধা বহনের অভিযোগ এনে হত্যা করা হয় ধোকড়াকুল গ্রামের নেসু শাহ’র ছেলে টমটম চালক রহমত শাহকে। এরপর হানাদার বাহিনী তাহেরপুরে চলে গেলে মুসা বাঁশবাড়িয়া এলাকায় অবস্থান নেন।
নিহত বাঙালি ও আদিবাসীদের দেখতে এলে মুসা নিজের তরবারি দিয়ে বাঁশবাড়ি পশ্চিমভাগ গ্রামের ইব্রাহিম সরকারের ছেলে ইসমাইল সরকার, গফুরের ছেলে বদিউজ্জামান, বছিরের ছেলে ঝড়– ওরফে কালাকে হত্যা করে। মুসার হাতে নিহত ইসমাইল সরকারের ছেলে আনেস সরকার পিতার জন্য কাফনের কাপড় আনতে গেলে মুসা তাকেও রাস্তার উপর তরবারি দিয়ে হত্যা করে।
এঘটনার পর দেশ স্বাধীন হলে মুসা রাজাকার পরিবার ও সহযোগীদের নিয়ে ভারতে চলে যায়। তার এই বাঙালি ও আদিবাসী নিধনে পাক আর্মির সঙ্গে সহযোগী ছিলো বর্তমানে ভারতের মুর্শিদাবাদ প্রবাসী আব্দুল খালেক, আব্দুল হামেদ, সাদ আক্কাস, দেল মোহাম্মদ, সলেমান খলিফা ও দেদার আলী।
বাঁশবাড়িয়া আদিবাসী পল্লীর বধুরাই সাধু মার্ডি বলেন, একাত্তর সালে আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তাম। মুসার নেতৃত্বে আমার চোখের সামনে আমার দাদা টুনু মার্ডি, নানা জটু সরেন, মামা কানু হাজদা  ও প্রতিবেশী  দাদা লাডে হাজদাকে হত্যা করা হয়। মুসা তলোয়ার দিয়ে তাদের হত্যা করে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
পুঠিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জিল্লুর রহমান বলেন, একাত্তর সালে আমার বয়স ছিলো ১১ বছর। আদিবাসী পল্লীর পাশেই আমাদের জমিতে শ্রমিকের জন্য খাবার নিয়ে আসি। তখন দেখতে পাই মুসা রাজাকার তলোয়ার নিয়ে দৌড়ে এসে চান্দু সরেন নামের একজনকে জবাই করে হত্যা করেছে। তারপরে শুনতে পেয়েছি সে অনেক গ্রামে আগুন দিয়েছে। অনেককে হত্যা করেছে।
উল্লেখ্য, একাত্তর সালে বাঙালি ও আদিবাসী হত্যা ও লুটপাটের পর দেশ স্বাধীন হলে মুসা রাজাকার ভারতে পালিয়ে যায়। এরপর ৭৫ সালে গোপনে দেশে ফিরে আদিবাসী পল্লীর ১৫২ বিঘা জমি দখলের চেষ্টায় অপতৎপরতা শুরু করে।