রাণীনগরে জনপ্রিয় হচ্ছে লাইভ পার্চিং || রক্ষা পাচ্ছে পরিবেশ

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৭, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

আবদুর রউফ রিপন, রাণীনগর


রাণীনগরে এভাবেই জামিতে ব্যবহার করা হচ্ছে লাইভ পার্চিং-সোনার দেশ

নওগাঁর রাণীনগরে দিন দিন লাইভ পার্চিংয়ের ব্যবহার বাড়ছে। ধীরে ধীরে ফসলের মাঠে কৃষকদের মাঝে এই লাইভ পার্চিংয়ের আগ্রহ বাড়ছে। লাইভ পার্চিং ব্যবহার করায় কমছে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার অপরদিকে রক্ষা পাচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। অন্যদিকে লাইভ পার্চিংয়ের পাশাপাশি ডেথ পার্চিংও কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
ফসলের জমিতে বিশেষ করে ধানের খেতে ক্ষতিকারক পোকা দমনের পাশাপাশি মাটির নাইট্রোজেনের ঘাটতিও পূরণ হচ্ছে। এতে ফসলে কীটনাশক স্প্রের বাড়তি খরচের প্রভাব যেমন পড়ছে না, তেমনি অন্যদিকে বাড়ছে ফসলের উৎপাদনও।
উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে ফসলের খেতের মাঝে ধৈঞ্চার বড় বড় গাছ। যে গাছগুলোর উপর বসে আছে বিভিন্ন ধরনের পাখি। এই পাখিগুলো কিছুক্ষন পর পর জমির মধ্যে থাকা ক্ষতিকারক পোকাগুলো ধরে ধরে খেয়ে নিচ্ছে। এতে করে ফসল রক্ষা পাচ্ছে পোকা-মাকড়ের হাত থেকে। আর এই পোকা-মাকড় নিধন করার জন্য কম পরিমাণে ব্যবহার করা হচ্ছে রাসায়নিক দ্রব্য। দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে পরিবেশ।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা, খরিপ-১ মৌসুমে উপজেলায় ৬হাজার ৭শত হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ করা হচ্ছে। এই জমিগুলোতে আফ্রিকান ধৈঞ্চা দিয়ে লাইভ পার্চিং করা হয়। এই পার্চিং পরিবেশ বান্ধব জৈব প্রযুক্তি। এই ধৈঞ্চা গাছে পাখি বসে খেতের মাজরা পোকাসহ অন্যান্য ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে ফেলে। ফলে কীটনাশক দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বিঘাপ্রতি ৪-৫টি এবং একর প্রতি ১৩-১৪টি ধৈঞ্চা গাছ লাগিয়ে পোকা-মাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করা যায় ধান খেত। আগের বছরের তুলনায় এবছর মাঠে এই লাইভ পার্চিং চোখে পড়ার মতো। এ বছর এর ব্যবহার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সুফল পাওয়ায় উপজেলার কৃষকদের অনেকেই এখন এ পথ বেছে নিয়েছে। আর বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলের মাঠ জুড়ে এখন শুধুই চোখে পড়ছে এই ‘লাইভ পার্চিং’। শুধু পোকা নিধনই নয় লাইভ পার্চিংয়ে ব্যবহৃত ধৈঞ্চার গাছের দেহে ও শিকড়ে বড় বড় নভিউল থাকে। যেখানে রাইজোরিয়াম ব্যাকটেরিয়া থাকে যা প্রকৃতির বাতাস থেকে নাইট্রোজেন গ্রহণ করে। আবাদের পর জমি চাষের সময় এই ধৈঞ্চাগুলো জমিতে নাইট্রোজেন সরবরাহ করে সমতা রক্ষা করে। তাই আলাদা করে আর জমিতে আবাদের সময় নাইট্রোজেন সার ব্যবহার করতে হয় না।
উপজেলার শিয়ালা গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম রবু জানান, এই মওসুমে তিনি ৫ বিঘা জমিতে আবাদ করেছেন রোপা আমন। তিনি ৫ বিঘা জমিতে ৪০টি ধৈঞ্চা গাছ লাগানোর ফলে পোকামাকড় দমন হচ্ছে। এছাড়াও জমিতে যোগ হচ্ছে নাইট্রোজেন। শুরুতে একবার কীটনাশক স্প্রে করার পর আর প্রয়োজন হয়নি। দিতে হচ্ছে না ইউরিয়া সারও।
উপজেলার ছয়বাড়িয়াগ্রামের কৃষক শাহিন আলম বলেন, ধৈঞ্চা গাছের ডালে পাখিরা বসে খেতের ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে ফেলছে। গাছটির পাতা জৈব সার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় খেতে আর ইউরিয়া ব্যবহার করি নি। এতে করে রক্ষা পাচ্ছে আমাদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র। কমে আসছে রাসায়নিক সারের ব্যবহার।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সবুজ কুমার সাহা জানান, চলতি রোপা আমন মৌসুমে রাণীনগরে পার্চিং পদ্ধতি দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কৃষকদের মধ্যে। তিনি বলেন, বিশেষ করে আফ্রিকান ধৈঞ্চা গাছ দারুণভাবে উপকার করছে জমির। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ধৈঞ্চার পুরো গাছে নুডুল রয়েছে। যা বায়ুমন্ডল থেকে নাইট্রোজেন গ্রহণ করে ফলে জমির উরর্বতা বৃদ্ধি পায়।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ এসএম গোলাম সারওয়ার জানান, কৃষি বিভাগ কৃষকদের এই পদ্ধতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছে। বরেন্দ্র ভূমি খ্যাত এ উপজেলার পুরো খেত আগামীতে ধৈঞ্চা পার্চিং পদ্ধতির আওতায় আনার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তদারকি এবং পরামর্শ দেয়া হচ্ছে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি অফিসার।
এই লাইভ পার্চিং এর ব্যবহারের ফলে ফসল কাটার পর কৃষক পাচ্ছে, বাড়তি জ্বালানির উপকরণ। সেই সাথে বাড়ছে, ফসলের উৎপাদনও। লাইফ পার্চিং এর ব্যবহার বাড়াতে ও কৃষকদের উদ্বুুদ্ধ করতে কাজ করছে রাণীনগর উপজেলা কৃষি অফিসসহ বিএডিসি। ফলে রাণীনগরে লাইভ পার্চিং এর সাড়া পড়েছে।