রাণীনগরে ভূয়া শিক্ষার্থী দেখিয়ে উপবৃত্তির টাকা উত্তোলন

আপডেট: নভেম্বর ২৬, ২০২২, ১:০১ অপরাহ্ণ


আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি:


নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার শিয়ালা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষানীতিকে উপেক্ষা করে উপবৃত্তির তালিকায় পার্শ্ববর্তী বগুড়া জেলার আদমদিঘী উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নাম দিয়ে টাকা উত্তোলন করেছেন শিয়ালা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হরেন্দ্রনাথ সরকার।

প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে ৩শ টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলে আকস্মিক ভাবে পরিদর্শন করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) গত ৩১ অক্টোবর তারিখে পরিদর্শন খাতায় নোট করেছেন।

জাতীয় শিক্ষানীতি অনুসারে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষায় সহায়তার জন্য সরকারি ভাবে উপবৃত্তি পাবেন। এতে ওই শিক্ষার্থীদের ৭৫% উপস্থিতির হার, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীতে ৩৩% নাম্বার পেতে হবে, অষ্টম ও নবম শ্রেণীতে গড়ে ৪০% নাম্বার পেতে হবে ও ভর্তির পর থেকে বিরতিহীন ভাবে অধ্যয়ন করতে হবে।

কাগজপত্রে দেখা যায়, শিয়ালা উচ্চ বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী (গতমাসের ভোটার লিস্ট অনুযায়ী) ২শ ২৪ জন অথচ উপবৃত্তির চাহিদার লিস্টে প্রধান শিক্ষক হরেন্দ্রনাথ সরকার ৪৩৮ জন শিক্ষার্থী দেখান। এরমধ্যে ১শ ৩৯ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পেয়েছেন। অথচ প্রাপ্যতা অনুসারে ওই প্রতিষ্ঠানের ৬৯ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পাবে।

উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪৪ জন শিক্ষার্থী ওই প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়াই করে না। তারা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তাদের নামে যে উপবৃত্তির টাকা আসে এটাও তারা জানেন না।

অভিভাবক ভোটার লিস্ট অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী আছে ৫৩ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ৫০ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ৩৯ জন, নবম শ্রেণিতে ৪১ জন, দশম শ্রেণিতে ৪১ জন। উপবৃত্তি পায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ২৪ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ৫২ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ২৫ জন, নবম শ্রেণিতে ২৩ জন, দশম শ্রেণিতে ১৮ জন।

এরমধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানের কোন কাগজপত্রে নাম নেই ষষ্ঠ শ্রেণির ১০ জনের, সপ্তম শ্রেণির ২১ জনের, অষ্টম শ্রেণির ৫ জনের, নবম শ্রেণির ২ জনের, দশম শ্রেণির ৬ জনেরসহ মোট ৪৪ জনের। তিনি উপবৃত্তির জন্য শিক্ষার্থী দেখিয়েছেন ষষ্ঠ শ্রেণির ১৩০ জন, সপ্তম শ্রেণির ১০০ জন, অষ্টম শ্রেণির ৭৮জন, নবম শ্রেণির ৭০ জন, দশম শ্রেণির ৬০ জনসহ মোট ৪৩৮ জন।

চাপাপুর ইব্রাহীম মেমোরিয়াল মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী নাদিয়ার মা আঞ্জুমান আরা, শ্রী জয় চন্দ্রের বাবা প্রবীণ কুমারসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক বলেন, আমার ছেলে/মেয়েদের কখনো তো শিয়ালা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেইনি, তারা কেউ সেই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে না।

এছাড়াও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক জানান, উপবৃত্তির কাজে প্রধান শিক্ষকের সাথে অফিস সহকারী নূরুল ইসলাম জড়িত। তারা আরও বলেন, প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন যাবৎ উপবৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক মাসিক বেতন আদায় করে আসছে। বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতায় বিদ্যালয়ের পাঠদানের পরিবেশ একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে। প্রধান শিক্ষকের কারণে বিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষকদের একাধিক দল হয়েছে।

এবিষয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী নূরুল ইসলাম বলেন, উপবৃত্তি দেওয়ার নামে অনেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩শ টাকা করে নেওয়ার যে কথা ইউএনও স্যার পরিদর্শন বহিতে লিখেছেন তা সঠিক নয়। এছাড়া শিক্ষানীতি উপেক্ষা করে অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কিভাবে উপবৃত্তি দেওয়া হয়েছে তার কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

এব্যাপারে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হরেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে এসব একটু করতেই হয়। আপনার প্রতিষ্ঠানে চায়ের দাওয়াত রইল আপনি আসেন সামনাসামনি কথা বলবো।

এবিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার রুহুল আমিন বলেন, আপনার মাধ্যমে এই বিষয়টি প্রথম জানলাম। সরেজমিনে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহাদাত হুসেইন বলেন, আমি এই প্রথম ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়েছি। সেখানে আমি যথেষ্ট অনিয়ম পাওয়ার পর সবার সামনে আমি সেগুলো লিখে তাদের পড়ে শুনিয়েছি। তখন তারা কেউ মিথ্যে বলেনি। আর অতিরিক্ত শিক্ষার্থী দেখিয়ে উপবৃত্তি উঠানোর বিষয়ে জানতাম না। সরকার শিক্ষার জন্য অনেক কিছু করছে। এবিষয়ে খোঁজ নিয়ে সত্যতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ