রাণীনগরে মাদুর পাটিতে খুলছে নারীদের ভাগ্য

আপডেট: মার্চ ২৯, ২০১৭, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

এম আর রকি, নওগাঁ



গ্রামে ঢোকার সাথেই খটাশ খটাশ শব্দ। শব্দ শুনে মনে হলো এখানে আদিকাল থেকে তাঁত ছিল। গ্রামের নারীরা বেশ উৎসাহ নিয়ে ছন্দের সাথে কাজে মত্ত। দম ফেলার সময় নেই। কথা বলার চেষ্টা করলাম। একজন বলছেন এখন গরম মৌসুম এ কারণে মাদুর পাটির চাহিদা বেশি তাই বিরামহীনভাবে কাজ করতে হচ্ছে আমাদের। নওগাঁর রাণীনগরের ত্রিমহোনী হাট সংলগ্ন বাসিন্দা রেবেকা ও তার পুত্রবধূ কাজ করছিল। সে সময় তাদের সাথে কথা হলো। খুব বেশিদিন নয়। গত ৪ /৫ বছর থেকেই এ এলাকায় মাদুর পাটি বুনন ও মাদুরের পাতি চাষ ব্যাপক বিস্তৃত হতে শুরু করে। গ্রামের নারীরা যখন ভারতীয় টিভি সিরিয়ালে নেশায় আড়ষ্ট। তখন রানীনগরের নিভৃত পল্লিতে নারীদের এমন কর্মউদ্দীপনা বেশ ভাল লাগছিল। এমন সময় পাশে ছিলেন কৃষি বিভাগের  রাজশাহীর কৃষি উন্নয়ন ও কর্মস্থান প্রকল্পের প্রধান ড. জগৎ মালাকার । তিনি মাদুর পাটি ও মাদুরর পাতি চাষ নিয়ে দীর্ঘ দিন গবেষণা করেছেন। মাদুর পাটি নিয়ে অনেক প্রতিবেদন লিখেছেন পত্র পত্রিকায়। তার উদ্দিপনায় মুলত আজকের এ প্রতিবেদন করার জন্য আমরা পা ফেলি নওগাঁর রানীনগরের মাদুর পল্লিতে। রানীগরের দিন দিন মাদুরের পাতি চাষ বাড়ছে। কার হিসাবে জানা গেল অন্য ফসলের চেয়ে মাদুরের পাতি চাষে বেশি লাভ। এক বিঘা জমি থেকে মাদুরের পাতি আসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বেশি। আবার পাতি চাষে কোন খরচ নেই। স্থানীয় ত্রিমোহনী হাটে দেখ গেল কয়েকজন কৃষক মাদুরের ছোট গাছ (স্থানীয় ভাষায় চেচড়া) বলে বিক্রির জন্য অপেক্ষা করছেন। কথা হয় কৃষক আলতাফ হোসেন সাথে। তিনি জানান, এক পন বীজের দাম (৮০ আটি) ৪শ টাকা বিক্রি হয় । স্থানীয়রা জানান, ত্রিমোহনী হাটে ভোর রাত থেকে মাদুর পাটির পাতি কেনাবেচা চলে। এছাড়া এখান থেকে পাটি কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায় পাইকাররা। ব্যস্থ মাদুর পল্লিতে কথা হয় আনজু আরা শেফালী বেগমসহ কয়েকজন নারীরর সাথে তারা জানান, দিনে ২০টা পর্যন্ত মাদুর পাটি তৈরি করা যায়। মাদুর পাটির কারণে সংসারের অভাব দূর হয়েছে।
রানীগরের ত্রিমোহনী গ্রামে সকাল থেকে রাত অবধি চলে মাদুর পাটি তৈরি খটখট শব্দ। বাজার থেকে মাদুরের পাতি সংগহ করে সেইপাতিতে রঙ লাগিয়ে তৈরি করা হয় মাদুর পাটি। পরে এসব পাটির দুপাশে কাপড় দিয়ে মেশিনে সেলাই করা হয়। দিনে ২০ থেকে ৩০টি মাদুর পাটি তৈরি করছে একজন নারী। তৈরি করা এসব মাদুর পাটি স্থানীয় হাটে তোলা হয়। সেখান থেকে পাইকার এসে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিটি মাদুর পাটি সাইজ অনুপাতে ৫০ থেকে দেড়শো টাকায় কিনে পাইকাররা। স্থানীয় ত্রিমোহনী হাট এ অঞ্চলের মাদুর পাটি কেনাবেচার হাট নামে পরিচিত। পাইকাররা এখান থেকে মাদুর পাটি ক্রয় করে নিয়ে যান।
রানীনগর উপজেলা কৃষি অফিসার গোলাম সারোয়ার বলেন, মাদুরের পাতি চাষ দিন দিন বাড়ছে রানীনগরে। কৃষি বিভাগ পাতি চাষীদের নানাভাবে সহযোগিতা করছে। তিনি আশা পোষন করেন আগামীতে এখানে মাদুর পাটির বড় একটি বিপ্লব ঘটবে। সেসাথে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে নারীরা।
ড. জগৎ মালাকার বলেন, ক্ষুদ্র কুঠির শিল্প হিসাবে আগামীতে মাদুর পাটি রানীনগরে বড় একটি জায়গা করে নিতে পারে। তিনি মনে করেন এ অঞ্চলে নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে মাদুর পাটির মাধ্যমে। মাদুর পাটি শিল্পে জড়িতদের  সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।