রাণীনগরে হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেতশিল্প

আপডেট: এপ্রিল ১, ২০১৭, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

আবদুর রউফ রিপন, রাণীনগর



নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় বাঁশ ও বেতশিল্প এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। গ্রামগঞ্জ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশের তৈরি বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। অভাবের তাড়নায় এই শিল্পের কারিগররা দীর্ঘদিনের বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে আজ অনেকে অন্য পেশায় ছুটছেন। শত অভাব অনটনের মাঝেও উপজেলায় হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার আজও পৈতিক এই পেশাটি ধরে রেখেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বর্তমানে উপজেলার কাশিমপুর ইউপির কাশিমপুর ঋশিপাড়ার ৩০-৩৫টি পরিবারই বর্তমানে এই শিল্পটি ধরে রেখেছেন। পুরুষদের পাশাপাশি সংসারের কাজ শেষ করে নারী কারিগররাই বাঁশ দিয়ে এই সব পণ্য বেশি তৈরি করে থাকেন। সনাতন ধর্মের মধ্যে একটিমাত্র গোত্র আছে যারা শুধু বাঁশ ও বেত দ্বারা এই সব পণ্য তৈরি করে থাকেন। বর্তমানে বেত তেমন সহজলভ্য না হওয়ায় বাঁশ দিয়েই বেশি এসব চিরচেনা পণ্য তৈরি করছেন এই কারিগররা। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে আজ অনেক পরিবারই বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন। বর্তমানে আধুনিতার যুগে বাজারে সহজলভ্য ও আর্কষণীয় বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য ও অন্য দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে পাল¬া দিতে না পারায় এই শিল্পের অনেক কারিগররা তাদের বাপ-দাদার পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এসব বাঁশ শিল্পের কারিগররা তাদের পূর্বপুরুষের এ পেশা আকঁড়ে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও হিমশিম খাচ্ছেন। দিন দিন বিভিন্ন জিনিসপত্রের মূল্য যেভাবে বাড়ছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না এই শিল্পের তৈরি বিভিন্ন পণ্যের মূল্য। যার কারণে কারিগররা জীবন সংসারে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। কয়েক দশক আগে নওগাঁ জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান হতো এই কারিগরদের তৈরি এই সব বাঁশ ও বেতের পণ্যগুলো। এক সময় রাণীনগরসহ দেশের ঘরে ঘরে ছিল বাঁশের তৈরি এইসব সামগ্রীর কদর ছিল অনেক। কালের আর্বতনের সঙ্গে বিশেষ আর চোখে পড়ে না এ পণ্যগুলো। অপ্রতুল ব্যবহার আর বাঁশের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বাঁশ শিল্প আজ হুমকির মুখে। বাঁশ ও বেত থেকে তৈরি সামগ্রী বাচ্চাদের দোলনা, তালায়, র‌্যাখ, পাখা, ঝাড়–, টোপা, ডালী, মাছ ধরার পলি, খলিশানসহ বিভিন্ন প্রকার আসবাবপত্র গ্রামঞ্চলের সর্বত্র বিস্তার ছিল। এক সময় যে বাঁশ ২০ থেকে ৩০ টাকায় পাওয়া যেত সেই বাঁশ বর্তমান বাজারে কিনতে হচ্ছে দুইশত থেকে আড়াইশ টাকা। সেই সাথে বাড়ে নি এসব পণ্যের দাম। জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ ঘর-বাড়ি নির্মাণে যে পরিমান বাঁশের প্রয়োজন সে পরিমান বাঁশের ঝাড় বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এই পরিবার বিভিন্ন সময়ে আসা সরকারিভাবে সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই বাপ-দাদার এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে আজ তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছে।
উপজেলার কাশিমপুর ঋশিপাড়ার নারী কারিগর রতœা, কাজলী, দহর চাঁদ, রহিদাস, অপেন দাসসহ অনেকে জানান, এই গ্রামের হাতেগোনা আমরা কয়েকটি পরিবার আজও এ কাজে নিয়োজিত আছি। একটি বাঁশ থেকে ১০-১২টি ডালি তৈরি হয়। সকল খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি পণ্য থেকে ১০-২০ টাকা করে লাভ থাকে। তবে আগের মতো আর বেশি লাভ হয় না বর্তমানে। তাই এই সীমিত লাভ দিয়ে পরিবার চালানো অতি কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের। তারা নিজেরাই বিভিন্ন হাটে গিয়ে ও গ্রামে গ্রামে ফেরি করে এই সব পণ্য বিক্রয় করে থাকেন।
তারা আরো জানান, খেয়ে-না খেয়ে অতি কষ্টে তাদের বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী এই বাঁশ শিল্প টিকে রাখতে ধারদেনা ও বিভিন্ন সমিতি থেকে বেশি লাভ দিয়ে টাকা নিয়ে কোন রকম বাপ-দাদার এই পেশাকে আকঁড়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। আমাদের এই শিল্পটির উন্নতি কল্পে যদি সরকারিভাবে অল্প লাভে ঋণ দেয়া হয়, তাহলে বাঁশ শিল্পের কারিগররা স্বাবলম্বী হবে আর হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ