রাণীনগর ও আত্রাইয়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি গো-খাদ্যের চরম সঙ্কট, নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত

আপডেট: আগস্ট ২১, ২০১৭, ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

আবদুর রউফ রিপন, রাণীনগর


রাণীনগর ও আত্রাইয়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় এভাবেই কষ্ট ভোগ করছে গরু-ছাগল -সোনার দেশ

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নওগাঁর আত্রাই (ছোট যমুনা) নদীতে বন্যার পানি দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি। পানিতে ভেসে গেছে শত শত পুকুরের মাছ।
রাণীনগর উপজেলার দুই বেড়িবাঁধের তিনটি মূলবাঁধ ভেঙে পানি প্রবাহিত অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে আত্রাই উপজেলার মালিপকুর, পাঁচুপুর বেঁড়িবাঁধ, পাঁচুপুর-সিংড়া সড়ক ও গতকাল রোববার সকালে উপজেলার হেলিপ্যাড থেকে আত্রাই উচ্চবিদ্যালয় সড়ক ভেঙে পানি প্রবাহিত অব্যাহত রয়েছে। পানি দ্রুত সরিয়ে না যাওয়ার কারণে দিন দিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। চরম আতঙ্কে রয়েছে উপজেলার বাসিন্দারা। এদিকে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার সাত দিন অতিবাহিত হলেও এখনো মোরামত করা হয় নি এই ভাঙনের স্থানগুলো।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁর আত্রাই নদীতে পানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে গত ১৩ আগস্ট সন্ধ্যার পর থেকে উপজেলার রাণীনগর সদর, কাশিমপুর, গোনা, মিরাট, বড়গাছা ইউনিয়নের প্রায় ৫৮টি গ্রাম এবং আত্রাই উপজেলার ফুলবাড়ি, পূর্বমিরাপুর, উদনপৈয়, মিরাপুর, রসুলপুর, জাতোপাড়া, জিয়ানিপাড়াসহ প্রায় এক শত অধিক গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। আত্রাই থেকে আত্রাই-সিংড়া যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এই বন্যার পানির কারণে উপজেলার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শতাধিক পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। রাণীনগরের বেতগারী থেকে নওগাঁ-আত্রাই মহাসড়কের তিনটি স্থানে ভেঙে যাওয়ায় আত্রাইয়ের সঙ্গে রাণীনগর ও নওগাঁর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এই বন্যার পানির কারণে উপজেলার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শতাধিক পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। আতঙ্কে রয়েছেন বন্যা কবলিত এলাকার লাখো মানুষ।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বন্যাকবলিত পরিবারগুলো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। আবার অনেকইে স্থানীয় ঘোষগ্রাম উচ্চবিদ্যালয়ে, ঘোষগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকের অভিযোগ- ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রেও স্বজনপ্রীতি করা হচ্ছে। অনেকে ত্রাণ পাওয়ার যোগ্য না হলেও তাদেরকে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। আর যে পরিমাণ ত্রাণ দেয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের চাইতে খুবই অপ্রতুল্য। দিনমজুরেরা কাজ পাচ্ছে না। তাই তারা নিজের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে গোখাদ্যের চরম সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আর যা পাওয়া যাচ্ছে তার দাম অনেক বেশি। তাই গবাদি পশুলোকে বাঁচানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাণীনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে প্রতিদিনই সরকারের দেয়া ত্রাণগুলো বিতরণ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে বানভাসী পরিবারের মাঝে ১৬ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও শুকনো খাবার হিসাবে চিড়া, মুড়ি, গুড় ও খাবার স্যালাইন বিতরণ করা হচ্ছে। বন্যাকবলিত পরিবারগুলোকে বন্যাপরবর্তী পুনর্বাসন করার আগ পর্যন্ত এই ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত থাকবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এসএম গোলাম সারওয়ার জানান, উপজেলায় বন্যার পানি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া ফসলের অনেক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পানি দ্রুত নেমে না যাওয়ার কারণে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন ফসলের খেত পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত উপজেলায় ধানসহ বিভিন্ন ফসলের প্রায় ছয় হাজার ১৫০ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। যদি মাঠের পানি সাতদিনের মধ্যে নেমে যায় তাহলে জমিতে আবার স্বল্পকালীন বিভিন্ন প্রজাতির ধান লাগানোর সুযোগ পাবেন কৃষকরা। তবে কৃষকদের প্রতিনিয়তই বন্যা পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা যথাক্রমে আবু তালেব এবং ডা. রুহুল আমিন আল-ফারুক জানান, বন্যায় মানুষের পাশাপাশি গবাদি পশুরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে গো-খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকেই গো-খাদ্যের অভাবের কারণে লোকশান দিয়ে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। বন্যায় গবাদি পশুকে কিভাবে ভালো ও সুস্থ রাখা যায়, তার পরামর্শ প্রতিনিয়তই প্রদান করা হচ্ছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলো আমাদের লোকজনরা প্রতিদিনই পর্যবেক্ষণ করছেন ও গোবাদি পশুগুলোর খোঁজখবর রাখছেন।
রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যথাক্রমে সোনিয়া বিনতে তাবিব এবং মোখলেছুর রহমান জানান, বন্যাকবলিত এলাকায় ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে। সরকারি দফতর ছাড়াও বিভিন্ন দল ও সংগঠনগুলো বন্যাকবলিত এলাকায় সাধ্যমতো ত্রাণ বিতরণ করছেন। পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ