রাফির চিঠি

আপডেট: জুলাই ১, ২০১৭, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

কাজল বিনতে শাহিদা


ছয় বছরের ছোট ছেলে রাফি। ছয় বছরের এই ছোট ছেলেটি যেমন চঞ্চল, চপল সুমিষ্ট তেমনি বুদ্ধিদীপ্ত। পড়ালেখার পাশাপাশি অবসর সময়ে নিজের খেয়াল খুশি মত খেলা করা রাফির প্রিয় সখ। রাফির খেলনাপাতির ভেতর ইলেকট্রনিক্সের খেলনার সংখ্যাই বেশি, মাঝে মাঝে খেলনাগুলোতে একটু মেকারি করার জন্য রাফির রয়েছে বেশ কিছু উপকরণ। এইতো সেদিন পাকামোর এক পর্যায়ে নষ্ট করে ফেলেছে ফ্লোর জিপটা। বিষয়টা মায়ের চোখে পড়তেই সজোরে একটা চড় মেরেছে সে রাফির ছোট গালে। বাবার কাছে নালিস পৌঁছালে বাবা কোন উত্তর করেনি মাকে। বা রাফিকে ডেকেও কোন প্রশ্ন করেনি। শুধু দীর্ঘ একটি নিশ্বাস নিয়ে ভাবতে বসেছে অদূর ভবিষ্যৎকে। কারণ এটি রাফির ঘটানো প্রথম ঘটনা নয়, এর আগেও এর থেকে দামি দামি খেলনা নষ্ট করেছে রাফি। তখন আনিশা নিজেই তাহমিদকে শান্তনা দিয়ে রাফিকে উৎসাহ দিয়েছে, আর আজ,  ঠিক তার উল্টো! মানুষ কত পরিবর্তনশীল! ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানাবার স্বপ্নটা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছে তাহমিদের কাছে।  তাহমিদের স্বপ্নটাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মূল কারণ হল দু বছরের মেয়ে তুলি। তুলির  জন্মের পর থেকেই আনিশার এই পরিবর্তন। ইদানীং রাফির প্রতি আনিশার দুর্ব্যবহার বেড়েই চলেছে। তার এই ব্যবহার রাফির কমল হৃদয়ের অসহায়ত্বকে বাড়িয়ে তুলছে দিন দিন।
সকালবেলা আনিশা যখন তুলির তুলতুলে ত্বকে চুমু এঁকে আদর করছিল, পাশে বসে রাফি অকোপটে বলে ফেলল, তুমি একটা পচা আম্মু! তুমি শুধু তুলিকে ভালোবাসো, আমাকে একটুও আদর কর না। আব্বু আসলে বলে দেব তুমি একটা পচা আম্মু।
পচা, দুষ্টু ছেলেদের আম্মুরা তো পচাই হবে, তাই না রাফি, সৎ আম্মু  কী কখনো ভালো হয়, আমি যে তোমার সৎ আম্মু  রাফি।
মিথ্যে কথা। সৎ আম্মু মানে তো ভালো আম্মু,  তুমি তো একটা পচা আম্মু।
বেশ হয়েছে রাফি, দিন দিন তোমার বেয়াদবি দেখছি বেড়েই চলছে, কথায় কথা না বাড়িয়ে ভদ্র হতে শেখ। আনিশার উচ্চসরে কেঁদে ফেলল রাফি। আনিশার নালিশ আর নালিশের স্তুপে রাফির কচি মুখটাকে হাসাবার জন্য দুটি কথা বলার সুযোগ পেল না তাহমিদ। সকালবেলা রাফি ঘুম থেকে উঠে সোজা চলে গেল ছাদের উপর, অনেকক্ষণ নীরব আকাশের দিকে তাকিয়ে কেটে গেল, তারপর চারিদিকে ঘুরে তাকাতেই রাফির চোখ পড়ল  পাশের ফ্লাটের তুর্যদের বাড়ির জানালায়।  তুর্যের আম্মু কত ভালো, কত মমতা দিয়ে তুর্যকে মুখে তুলে ভাত খাওয়াচ্ছে, কত ¯েœহ দিয়ে তুর্যের কপালে এঁকে দিল একটি চুমু। রাফির এরকম আদর ¯েœহ পেতে খুব ইচ্ছা করে।
পেছন থেকে বাবার কর্কশ কণ্ঠ ভেসে এলÑ রাফি তুমি এখানে, আর আমরা তোমাকে সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজছি, স্কুলে যেতে হবে না তোমার?
রাফি কোন উত্তর দেবার চেষ্টা না করে সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলো ঘরে। তড়িঘড়ি করে ড্রেস পরে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে নিচে নেমে পড়ল, তারপর রহিমের রিক্সায় চেপে বসল। আজ রাফির মনটা খুব খারাপ। তাই কোন ক্লাসেই মন বসলো না ওর। তবে বাংলা ম্যাডামের শেখানো চিঠি লেখার নিয়মটা খুব মন কেড়েছে রাফির। আজ ক্লাস শেষে এক আন্টির মাধ্যমে রাফি জানতে শিখেছে সৎ আম্মু অর্থ কী। সেই সাথে উদ্ভাবন করতে শিখেছে রাফির আম্মু আর তুলির আম্মু এক নয়।
আজ হোমওয়ার্কের পরিবর্তে রাফির মাথাটা দখল করে নিয়েছে একটি চিঠি। মায়ের  প্রতি সব ধরনের অভিযোগ, অনুরোধ এবং আম্মুর ফিরে আসার কথাটাও প্রকাশ পেয়েছে তাতে। চিঠিটা পৌঁছালেই রাফির আম্মু ফিরে আসবে, না এলেও ছেলেকে সান্তনা দিয়ে একটা চিঠি তো পাঠাবেন। এরকম পাগলামো উন্মাদনায় রাতে ঘুম ধরল না রাফির। সকালে ঘুম ভেঙে উঠেই কাউকে কিছু না বলে স্কুলের চেনা পথে হাঁটতে হাঁটতে বাবার চেনানো পোস্ট অফিসে পৌঁছে গেল সে। অফিসে পৌঁছে তিনটাকা দিয়ে চিঠিটি জমা দিল রাফি, কিন্তু প্রাপকের ঘরটা অস¤পূর্ণ দেখে ডাক কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, ছোটবাবু চিঠি কার কাছে পাঠাবে?
আম্মুর কাছে।
তোমার আম্মু কোথায় থাকেন?
আব্বু বলেছে আমার আম্মু আকাশে থাকেন।
দুঃখিত, বাবু, এই ঠিকানায় চিঠি পাঠানো যায় না।
কথাটা শোনামাত্রই রাফির কমল হৃদয়ের সবটুকু আনন্দ ¤¬ান করে দিয়ে  দুচোখ বেয়ে নেমে এলো অনর্গল অশ্রুধারা…