রাবিতে গরুর মাংস নিয়ে বিতর্ক, হল প্রাধ্যক্ষের অপসারণসহ ৫ দাবি ৭ ছাত্র-সংগঠনের

আপডেট: মার্চ ১০, ২০২৪, ৯:১৮ অপরাহ্ণ


রাবি প্রতিবেদক:সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সৈয়দ আমীর আলী হলের ইসাবেলা ক্যাটারিংয়ে সাহরিতে গরুর মাংস রাখা ও না রাখা নিয়ে ধর্মীয় অসন্তোষের সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় নিন্দা ও উদ্বেগ জানানোর-পাশাপাশি ৭ দফা দাবি জানিয়ে ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ৭ ছাত্রসংগঠন। রোববার (১০ মার্চ) সংগঠন-গুলোর পক্ষ থেকে পাঠানো এক যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়।
সংগঠনগুলো হলেন- বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, নাগরিক ছাত্র ঐক্য, বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের আহবায়ক ও বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এবং ছাত্র গণমঞ্চের সমন্বয়ক নাসিম সরকার।

তাদের দাবি- সাম্প্রদায়িক তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া ও সাম্প্রদায়িক উসকানির মূল হোতা আমীর আলী হল প্রভোস্ট মাহমুদুল হক-টুটুলকে অপসারণ করতে হবে, অবিলম্বে ক্যাটারিং গুলো বাতিল করে হল ডাইনিং ফিরিয়ে আনতে হবে, হল ডাইনিংয়ে ভর্তুকি দিয়ে রমজান মাসে পুষ্টিকর সাহরি নিশ্চিত করতে হবে ও সাহরির সমপরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার অক্ষুণ্ণ রেখে দুপুরে খাবার নিশ্চিত করতে হবে এবং
ক্যাটারিংয়ে রেগুলার মিল রেটে গরুর মাংস সরবরাহ করতে হবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গরুর মাংস কান্ডে হল প্রশাসন শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে উসকে দিয়েছে। গত ৩০ শে সেপ্টেম্বর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে, আমরা ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন সমূহ শুরুতেই জানিয়েছিলাম সুকৌশলে শিক্ষার্থীদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব অস্বীকার করতেই হল ডাইনিং বিলুপ্ত করে ক্যাটারিং চালুর সিদ্ধান্ত। সে সময় ‘শিক্ষার্থীরা পছন্দসই খাবার গ্রহণের স্বাধীনতা পাবে’ এমন বার্তা প্রদানের মাধ্যমে প্রশাসন তাদের গণবিরোধী সিদ্ধান্তের বৈধতা আদায় করতে চেয়েছে। যার অনিবার্য ফলাফল আজকের উদ্ভুত পরিস্থিতি।

হল প্রাধ্যক্ষের অপসারণ দাবি করে সলবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পূর্ব আশ্বাস মোতাবেক শুরুতেই হল প্রশাসনের একইসাথে সাহরিতে গরুর মাংস নিশ্চিত এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অধিকার সংরক্ষণ করতে পারার কথা ছিল। প্রশাসনের ব্যর্থতায় সৃষ্ট বিভাজন পরিস্থিতি ইতোমধ্যে ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রদায়িকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া ও সাম্প্রদায়িক উসকানির মূল হোতা হল প্রাধ্যক্ষ মাহমুদুল হক টুটুলের অপসারণ চাই। ক্যাটারিং সিস্টেম ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে একটি বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিবে আমরা এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলাম, সর্বশেষ ঘটনা সেই লক্ষণ হয়েই সামনে এলো। তাই অবিলম্বে ক্যাটারিং গুলো বাতিল করে পূর্বের হল ডাইনিং ফিরিয়ে আনতে হবে।

ধর্মালম্বীদের জন্য হলগুলোতে পুষ্টিকর দুপুরের খাবারের আয়োজন করার দাবি জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, উদ্ভুত পরিস্থিতির আরেক কারণ রমজান মাসে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্য হল ডাইনিংয়ে দুপুরের খাবারের সরবরাহ না থাকা। সব ধর্ম ও মতের মানুষের সমান নিরাপত্তা প্রদান বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব। অথচ প্রতিবছর দুপুরের খাবারের আয়োজনের দায়িত্ব অস্বীকারের মধ্য দিয়ে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের বাড়তি খরচ ও ভোগান্তির মুখোমুখি করে আসছে।

আরো বলা হয়, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে শিক্ষা জীবনের সামগ্রিক নিরাপত্তার আয়োজন রাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব। অথচ রাবিতে দীর্ঘদিন যাবৎ হল ডাইনিংয়ের খাবারে ভর্তুকি বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের মানহীন, পুষ্টিহীন খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। রোজা রেখে সুস্থ থাকতে ও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পুষ্টিকর খাদ্যের বিকল্প নেই। এই দুর্মূল্যের বাজারে খাদ্যে ভর্তুকি ব্যতিত শিক্ষার্থীদের পক্ষে যা পাওয়া অসম্ভব। তাই রমজান মাসে হল ডাইনিংয়ে ভর্তুকি দিয়ে শিক্ষার্থীদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাটারিংয়ে গরুর মাংসের জন্যে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা চলবে না৷ কেননা এতে যাদের আর্থিক সামর্থ্য কম তাদের খাবারের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়। ভর্তুকি দিয়ে রেগুলার মিল রেটেই গরুর মাংস সরবরাহ করতে হবে।

উল্লেখ্য, গত ৭ মার্চ (বৃহস্পতিবার) ডাইনিং সদস্য এবং সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের নিয়ে সভায় রমজান মাসে গরুর মাংস না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল হল কর্তপক্ষ। এ নিয়ে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি, বিভ্রান্তি এবং মতানৈক্যের সৃষ্টি হলে এর প্রেক্ষিতে শুক্রবার (৮ মার্চ) আবারও হলের প্রভোস্ট, আবাসিক শিক্ষক, কর্মকর্তা, হলের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত ছাত্রলীগ প্রতিনিধি এবং সকল আবাসিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে সভা ডাকা হয়। সভায় সকলের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ডাইনিং এ শুধু রমজান মাসে সেহেরিতে গরুর মাংস চালানো হবে এবং যেদিন গরুর মাংস খাওয়া হবে, সেদিন হল প্রশাসনের উদ্যোগে গরুর মাংস রান্না এবং খাওয়ার জন্য আলাদা তৈজসপত্রের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এবিষয়ে হল প্রাধ্যক্ষ স্বাক্ষরিত একটি নোটিশও প্রচার করা।

পরবর্তীতে ‘শুধু রমজান মাসে গরুর মাংস খাওয়া যাবে’ শর্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তখন হল প্রাধ্যক্ষ জানান, শুধু রমজান মাসের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটা সাময়িক। এখন শিক্ষার্থীরা যদি নিয়মিত খেতে চাই, তাহলে হল প্রশাসন থেকে আলাদা পাতিলসহ যা প্রয়োজন সব কিনে দেওয়া হবে।

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আমীর আলী হলে একটি মাত্র ডাইনিং। কোনো ক্যান্টিন নাই। নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইসাবেল ক্যাটারিং’। এটা শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে। কিছুটা ছাত্রাবাসের মতো। যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেরা মিটিং করে কি খাওয়া হবে, কারা বাজার করবে, তা নিজেদের মধ্যে থেকে ম্যানেজার নির্ধারণ করে। তবে এটি তদারকি করে হল প্রশাসন।