রাবিতে জোহা দিবস আজ পাঁচ দশকেও মিলেনি স্বীকৃতি

আপডেট: February 18, 2020, 1:20 am

রাবি প্রতিবেদক


আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। ১৯৬৯ সালের এই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা গণঅভ্যুত্থানের অগ্রনায়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু হয়েছিল পাক-হানাদার বাহিনী হটাও আন্দোলন। সেদিন নিজের জীবনের বিনিময়ে বাঁচিয়ে ছিলেন হাজারো শিক্ষার্থীর জীবন। তিনিই পাক-হানাদারদের হাতে নিহত প্রথম বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবী।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলন গড়ে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণায় পাক-বাহিনী পূর্ব-পাকিস্তানে ১৪৪ ধারা জারি করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে শিক্ষার্থীরা এ ধারা উপেক্ষা করে প্রধান ফটকের সামনের মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সংবাদে তৎকালিন প্রক্টর ড. জোহা প্রধান ফটকে ছুটে যান।
প্রক্টর হিসেবে তিনি ছাত্রদের শান্ত করার ও ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। ছাত্ররা পিছু হঠতে না চাইলে পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন হাদী ছাত্রদের গুলী করার নির্দেশ দেয়। তখন জোহা পাক বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, ‘কোন ছাত্রের গায়ে গুলী লাগার আগে আমার গায়ে যেন গুলী লাগে’। ড. জোহা ডন্ট ফায়ার! ডন্ট ফায়ার! বলে চিৎকার করতে থাকেন। তিনি ছাত্রদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন। কিন্তু প্রক্টরের আশ্বাসে কর্ণপাত না করে বেলা ১১টার দিকে ক্যাপ্টেন হাদী তার পিস্তল বের করে ড. জোহাকে লক্ষ্য করে গুলী করে। হাসপাতালে নেয়ার পথে ড. জোহা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
তার অমর উক্তি ‘কোন ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে আমার গায়ে যেন গুলি লাগে’ আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ধূলিকণার কাছে চিরভাস্বর হয়ে আছে। এরপর থেকে এই দিনটিকে ড. জোহা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দিবসটি পালনের জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বিভিন্ন সময় নানা কর্মসূচি, মানববন্ধন করে দিবসটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণার জন্য দাবি জানিয়ে আসছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কিন্তু আজও পর্যন্ত মিলেনি জাতীয় দিবসের স্বীকৃতি।
এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য আনন্দ কুমার সাহা বলেন, ড. শামসুজ্জোহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ দেশের প্রত্যেকটি মানুষের নিকট একটি অনুপ্রেরণার নাম। ১৯৬৯-এ জোহার আত্মত্যাগ গণ-আন্দোলনকে করেছে বেগবান। যা পরবর্তীতে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা আনতে সহযোগিতা করেছিলো। আজকের শিশুরা বেড়ে উঠছে স্বাধীন দেশের হাওয়া আর জলে, সেই শিশু কোনো দিন জানতেও পারবে না কেমন উত্তাল ছিল ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলন। জোহা দিবসকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করলে এই ইতিহাসটি বছরের পর বছর নতুন প্রজন্মরা জানতে পারবে। আমরা দীর্ঘদিন থেকে দাবি করছি এই দিবসটিকে জাতীয়করণ করা হোক। হয়ত আমরা প্রধানমন্ত্রীর নিকট আমাদের বার্তা পৌঁছাতে পারি নি। প্রধানমন্ত্রী চাইলেই দিবসটি জাতীয়করণ সম্ভব।
ড. জোহার স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেটে ড. জোহার গুলীবিদ্ধ হওয়ার স্থানটিতে নির্মাণ করা হয়েছে জোহা স্মৃতি ফলক এবং মেইন গেইট দিয়ে প্রবেশ করলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থিত শহীদ জোহার মাজার। শহীদ শামসুজ্জোহা হলের সামনে নির্মিত হয়েছে শহীদ শামসুজ্জোহা স্মৃতি ভাস্কর্য ‘স্ফুলিঙ্গ’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে ড. জোহার নামানুসারে ও প্রতিবছর ১৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। সেই দিনটিকে স্মরণ রাখতে ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা হয়।