রাবির চারুকলা প্রদর্শনীতে নান্দনিকতার সমাহার

আপডেট: জানুয়ারি ৬, ২০১৭, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

রফিকুল ইসলাম



চারদিকে সবুজের সমারহ। বিভিন্ন রকম ছোট-বড় বৃক্ষ। মাঝে এক চিলতে পায়ে হাটার কাঁচা রাস্তা। একটুখানি গাছের ছায়া আবার গাছের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা সূর্যের আলোও আছে। নিচে পড়ে আছে ঝরাপাতা। নিসর্গের যেন এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। প্রথম দেখায় আলোকচিত্র মনে হলেও আসলে এটি চারুশিল্পীর তুলির আঁচড়ে আঁকা শিল্পকর্ম। এমনি নান্দনিক বিভিন্ন শিল্পকর্মের সমাহার ঘটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রদর্শনীতে। নবীন শিল্পীদের বৈচিত্রময় এসব শিল্পকর্ম দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে চলছে নয় দিনব্যাপী এ প্রদর্শনী। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে প্রদর্শনী। এ প্রদর্শনী চলবে আজ শুক্রবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত। চারুকলা অনুষদ ভবনের ছয়টি কক্ষের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে শিক্ষার্থীদের এসব শিল্পকর্ম। মেঝেতে সাজানো হয়েছে ভাস্কর্য ও মৃৎশিল্প। এসব শিল্পকর্ম দেখে মুগ্ধ শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী হাসিব আল মামুন বলেন, ‘প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া শিল্পকর্মগুলো সবই শিক্ষার্থীদের তৈরি। শিক্ষার্থীদের এমন কাজ আসলেও প্রশংসার দাবি রাখে। প্রদর্শনী ঘুরতে গিয়ে কিছু কাজ দেখে একদম ছোটবেলায় ফিরে গেছি। এসব শিল্পকর্মের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবেশ, নিসর্গতাসহ বিভিন্ন বিষয়।’
গত ২৯ ডিসেম্বর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১০২তম জন্মবার্ষিকীতে নয় দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক। প্রদর্শনীর শিল্পকর্মের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে নৈসর্গিক সবুজ প্রকৃতি, নারীর প্রতি সামাজিক বৈষম্য, সমাজে আকস্মিকভাবে বাড়তে থাকা শিশু সহিংসতা, সংগ্রামী মানুষের জীবন, জীবনের শেষ স্পন্দনসহ পরিবেশ প্রতিবেশ থেকে নেয়া বিভিন্ন চিত্র।
প্রদর্শনীতে চারুকলা অনুষদের তিন বিভাগের ২৮৮ শিক্ষার্থীর ৩৭৯ শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৭১টি চিত্রকলা, ৬০টি প্রাচ্যকলা, ছাপচিত্র ৫০টি, ডিজাইন ৫৪টি, কারুশিল্প ৪৭টি, শিল্পকলার ইতিহাস ৮টি, মৃৎশিল্প ৫৪টি এবং ভাস্কর্য রয়েছে ৩৫টি। শিল্পকর্মের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে পেন্সিল, উড কার্ভিং, উড কোলাজ, জলরং, তেল রং, অ্যাক্রেলিক, পোস্টার কালার, সরাভাঙ্গা ও ফাউন্ড অবজেক্ট।
প্রদর্শনীতে সকল মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ হয়ে শিল্পচার্য জয়নুল আবেদিন পুরস্কার লাভ করেছে অনুষদের চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র নুর আলম মিয়ার ‘নিসর্গ’। এই চিত্রকলায় শিল্পীর নিপুণ দক্ষতায় ফুটে উঠেছে সাঁওতাল পল্লীর নৈসর্গিক সবুজ প্রকৃতির অনিন্দ্য রূপ। ভাস্কর্য ডিসিপ্লিনে শ্রেণিশ্রেষ্ঠ পুরষ্কার পেয়েছে অনুপমের ‘শেষ স্পন্দন’। ফাইবারগ্লাসের মাধ্যমে বর্বরোচিত নির্যাতনে নিহত শিশু রাজনের করুণ মুখচ্ছবি নির্মাণ করেছেন তিনি।
শিল্পরসের টানে এখানে প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থী ভিড় করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়াও নগরীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন বয়সের শিল্পানুরাগীরা এসে ঘুরে ঘুরে দেখছেন শিল্পকর্ম।
তবে এসব নান্দনিক শিল্পকর্ম প্রদর্শন ও রক্ষাবেক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। চারুকলা অনুষদের ছাত্রী রওনক হাসান বলেন, ‘এ ধরনের প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা যেমন তাদের মনের নান্দনিক ক্ষুধা মেটান, তেমনি আমাদের কাজগুলো সকলের সামনে উপস্থাপনের সুযোগ থাকে। তবে শিল্পকর্মগুলো প্রদর্শনের ভালো ক্ষেত্র আর্ট গ্যালারি। আমাদের দুর্ভাগ্য যে রাবিতে আর্ট গ্যালারি নেই। ক্লাশ-পরীক্ষা বন্ধ রেখে তাই ক্লাশরুমগুলোতে এই প্রদর্শনী করতে হয়। একটি ভালো মানের আর্ট গ্যালারি নির্মাণের দাবি চারুকলা অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।’