রাবির ড্রেনে ছাত্রের লাশ পুলিশের ধারণা হত্যাকান্ড, মামলা, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক ৪

আপডেট: অক্টোবর ২১, ২০১৬, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

রাবি প্রতিবেদক
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আব্দুল লতিফ হলের ভেতরে ড্রেন থেকে মোতালেব হোসেন লিপু নামের এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় হলের ডায়নিঙের পাশের ড্রেন থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশের ধারণা, লিপুকে হত্যা করা হয়েছে। তবে কে বা কারা কী কারণে হত্যাকা- ঘটিয়েছে তা জানা যায়নি। এ ঘটনার রহস্য উন্মোচনে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন নিহতের সহপাঠী ও শিক্ষকরা। লিপু বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি নবাব আব্দুল লতিফ হলের ২৫৩ নম্বর কক্ষে থাকতেন। লিপু ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার মকিমপুর গ্রামের বদর উদ্দিনের ছেলে।
হলের কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থী জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে হলের ডাইনিঙের কর্মচারী রানী বেগম ড্রেনে লাশ পড়ে থাকতে দেখে হলের শিক্ষার্থী ও অন্য কর্মচারীদের জানায়। বিষয়টি হল প্রশাসনকে জানানো হলে প্রশাসন প্রক্টর ও পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্যে রাজশাহী মেডিকেল (রামেক) কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
পুলিশ হেফাজতে নেয়ার আগে লিপুর রুমমেট মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বাইরে থেকে রুমে এসে রাত ১২টায় ঘুমে পড়ে মোতালেব। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি দরজা খোলা। সকালে ক্লাশে গিয়ে শুনি তার মৃত্যুর কথা।’
সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, হলের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ডাইনিঙের পাশে ড্রেনের ভেতরে বাম পাশ নিচের দিক করে লম্বালম্বিভাবে অনেকটা বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে আছে লাশ। রক্তে ড্রেনের পানি লালচে হয়ে গেছে। হলের দেয়াল থেকে ড্রেনের দূরত্ব দুই হাত।
কয়েকজন শিক্ষার্থী ও কর্মচারী বলেন, প্রথমে আমরা ধারণা করেছিলাম হয়তো হলের ছাদ থেকে পড়ে থাকতে পারে মোতালেব। কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখলাম, ছাদ থেকে এতো কাছে ড্রেনে পড়া সম্ভব না। এছাড়া ছাদ থেকে পড়লে বা ফেলে দেয়া হবে সরু ড্রেনের মধ্যে এমন লম্বালম্বিভাবে পড়ে থাকতো না। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে ড্রেনে ফেলে রাখা হয়।
নিহতের সহপাঠীরা জানায়, মোতালেব কোনও রাজনীতিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিল না। বছর খানেক আগে একটি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি দিতে গিয়ে আটক হন মোতালেব। এ অপরাধে তিন মাস জেল খেটে জামিনে মুক্ত হন। বিষয়টি নিয়ে কারো সাথে দ্বন্দ্ব থাকতে পারে তার।
মাথায় আঘাতের কারণে মৃত্যু : ময়নাতদন্ত শেষে বিকেলে রামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সিনিয়র প্রভাষক ডা. এনামুল হক বলেন, ‘নিহতের মাথার ডান পাশে বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন আছে। যার কারণে তার মৃত্যু হয়। আর বুকের দু’পাশে দুটো হাড় ভেঙ্গে গেছে। শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি।’
পুলিশের ধারণা হত্যাকা- : এদিন দুপুরে রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলামসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। ঘটনাস্থলের আলাতম দেখে নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (পূর্ব) আমীর জাফর বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণ করছি এটি হত্যাকা-। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনা যাই থাকুক না কেন, তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসবে।’ ঘটনাস্থল ও নিহতের রুম থেকে কিছু আলাতম সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মামলা দায়ের, আটক চার : এদিকে লিপুর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মতিহার থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মতিহার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হুমায়ুন কবির জানান লিপুর চাচা বশির আলী বাদী হয়ে হত্যামামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামাদের আসামী করা হয়েছে। এদিকে লিপুর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লিপুর রুমমেট মনিরুল ইসলাম, লিপুর বন্ধু প্রদীপ ও হলের দুই নিরাপত্তা প্রহরীকে থানা হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। তবে তাদের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় নি।
নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি দিয়ে আটক হয়েছিলেন : লিপুর সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরখানেক আগে লিপু একটি নিয়োগ পরীক্ষায় অন্যজনের হয়ে (প্রক্সি) পরীক্ষা দিতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন। জালিয়াতির দায়ে আটক হয়ে তিনমাস জেলে ছিলেন। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে জেল থেকে ছাড়া পান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কারো সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব থাকতে পারে বলা ধারণা করা হচ্ছে।
সুষ্ঠু তদন্ত দাবি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের : মোতালেবের মৃত্যুর ঘটনার রহস্য উন্মোচণে সুষ্ঠ তদন্তের দাবি জানিয়েছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিভাগের সভাপতি প্রদীপ কুমার পা-ে বলেন, ‘ময়নাতদন্তে মোতালেবের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া আলামতে এটি হত্যাকা- বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই। জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
নিহতের সহপাঠী নিঝুম সরকার, শহীদুল, নাজমুল বলেন,‘সব কিছু দেখে মনে হচ্ছে এটা পরিকল্পিত হত্যাকা-। আমরা এ হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিচার চাই।’
এদিকে মোতালেবের লাশ উদ্ধারের ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফেডারেশন। সন্ধ্যায় সংগঠন দুটির পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে শোক প্রকাশ করা হয়।
ক্যাম্পাসে জানাজা অনুষ্ঠিত : ময়নাতদন্ত শেষে বিকেল ক্যাম্পাসে মোতালেবের লাশ নিয়ে আসা হয়। বাদ আসর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রথম জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য প্রফেসর চৌধুরী সারওয়ার জাহান, ছাত্র উপদেষ্টা প্রফেসর মিজানুর রহমানসহ বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। পরে লাশ লিপুর চাচা বশির আলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সন্ধ্যায় লাশবাহী গাড়ি গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার মকিমপুরের উদ্দেশে রওনা হয়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ