রাবি ছাত্রলীগের সম্মেলন ঘিরে বর্ণিল সাজে ক্যাম্পাস পদ প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ

আপডেট: ডিসেম্বর ৫, ২০১৬, ১০:৪২ অপরাহ্ণ

শিহাবুল ইসলাম



আর মাত্র একটি দিন পেরোলেই পরিবর্তিত হবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাত্রলীগের নেতৃত্ব। আসবে নতুন নেতৃত্ব। ৮ ডিসেম্বর সম্মেলনকে ঘিরে এরই মধ্যে বর্ণিল সাজে সেজেছে পুরো ক্যাম্পাস। ব্যানার, ফেস্টুন ও আলোকসজ্জায় গোটা ক্যাম্পাসসহ এর আশেপাশের এলাকা ছেয়ে গেছে। সেই সঙ্গে সমানতালে চলছে শীর্ষ পদ প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ। নানা কর্মকা-ে বির্তকিতরাও পদ পেতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তবে যোগ্য ও ত্যাগীদের নেতৃত্বে আনার দাবি নেতাকর্মীদের।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদুল ইসলাম রাঞ্জু বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫তম সম্মেলনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের চার সদস্যের প্রতিনিধি দল ক্যাম্পাসে এসে সিভি সংগ্রহ করেছেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের বিপরীতে প্রায় ৭০ জন সিভি জমা দিয়েছেন।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবাস বাংলাদেশ মাঠে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে প্রধান অতিথি থাকবেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্মসাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক। এছাড়া বিশেষ অতিথি রয়েছেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও রাজশাহী মহানগর সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।
এদিকে সম্মেলনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে চলছে সাজ সাজ রব। সম্মেলনস্থল সাবাস বাংলাদেশ মাঠ ছাড়াও প্রতিটি হলের সামনে, স্টেশনবাজার এলাকা, চারুকলা এলাকা, স্টেডিয়াম মার্কেট, পুরাতন ফোকলোর চত্বর, বাসস্ট্যান্ড, টুকিটাকি চত্বর, বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক ভবনসহ পুরো ক্যাম্পাস নেতাকর্মীদের ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা এলাকা থেকে শুরু করে বিনোদপুর এলাকা পর্যন্ত রাস্তার ধারে নজর কাড়ছে বিভিন্ন নেতাকর্মীর ছবি সম্বলিত ব্যানার-ফেস্টুন। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে জোহা চত্বর হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবন সাজানো হয়েছে বর্ণিল সাজে। সেখানে শোভা পাচ্ছে রংবেরঙের আলোকসজ্জা।
অপরদিকে দদীর্ঘ সময় থেকেই ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সম্পাদক দিয়েই চলছে রাবি ছাত্রলীগের নেতৃত্ব। এর ফলে  সাংগঠনিক তৎপরতা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। এছাড়া কয়েক বছর সম্মেলন না হওয়ায় কার্যক্রমও ঢিলেঢালা হয়ে পড়ে। এসব কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। সম্মেলনকে সামনে নিয়ে এই হতাশা দূর করে নেতাকর্মীদের মাঝে চাঙা ভাব লক্ষ্য করা গেছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। অর্ধশতাধিক প্রার্থী থাকলেও প্রায় ডজনখানেক পদ প্রত্যার্শীকে দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা যাচ্ছে। ক্যাম্পাসে শোডাউন, কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়, বিভিন্ন চত্বরে জড়ো হয়ে চলছে নিজ নিজ অবস্থান জানান দেয়ার প্রচেষ্টা। সেই সঙ্গে চলছে কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতাদের কাছে ধর্ণা দেয়া ও তদবির।
উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ রাবিতে অধ্যয়নরতদের অর্ধেকের বেশি রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোর বাইরের শিক্ষার্থী। অভিযোগ আছে, স্থনীয়দের প্রাধান্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে বাছাই করা হয় প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর নেতৃত্ব। গত ১০ বছরে প্রায় সবগুলো কমিটিতেই রাজশাহী অঞ্চলের বাইরের কাউকে শীর্ষ দুইপদের নেতৃত্বে আনা হয়নি।
সভাপতি ও সম্পাদক পদে কয়েকজনের নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে। এরা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি মেহেদী হাসান রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া ও সাহানুর সাকিল, সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু, ছাত্রলীগ নেতা মিনারুল ইসলাম ও সদস্য সাকিবুল হাসান বাকি।
এদের মধ্যে চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী রাসেল বছর খানেক আগে পড়াশোনা শেষ করেছেন। তার বাড়ি বাগেরহাট জেলায়। গোলাম কিবরিয়া ভাষা বিভাগের মার্স্টাসের শিক্ষার্থী। ২০১৪ সালের ১৬ জুন ক্যাম্পাসে দিনদুপুরে শিবির নেতা রাসেলের পা কর্তন মামলার তিন নম্বর আসামি তিনি। লোক প্রশাসন বিভাগের সাকিলের বাড়ি বগুড়ায়। সাকিল ২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের পেটানো মামলার ৮ নম্বর আসামি। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রুনু ছাত্রত্ব হারিয়ে এখানেই সান্ধ্যকালীন কোর্সে এমবিএ করছেন। তিনিও শিবির নেতা রাসেলের পা কাটা মামলার দুই নম্বর আসামি। প্রার্থী মিনারুলের বর্তমানে কোনো পদ নেই। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঝিনাইদহের ছেলে মিনারুল হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে কয়েকমাস আগে পড়াশোনা শেষ করেছেন। তবে সম্প্রতি তিনি একটি কোর্সে ভর্তি হয়েছেন বলে দাবি করেন। লোকপ্রশাসন বিভাগের বাকি চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। রাজশাহীতে বাড়ি বাকির বিরুদ্ধে রয়েছে সিট বাণিজ্য ও চাঁদা দাবিতে শিক্ষার্থী ও দলীয় কর্মীকে মারধরের অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।
এছাড়া নেতৃত্বের দৌড়ে এগিয়ে থাকা অন্য প্রার্থীরা হলেন, কাওসার আহম্মেদ কৌশিক, তন্মায়ান্দ অভি (অছাত্র), শরিফুল ইসলাম সাদ্দাম (অছাত্র), ক্রীড়া সম্পাদক কাজী আমিনুল হক লিঙ্কন, ছাত্রবৃত্তি বিষয়ক সম্পাদক টগর মোহাম্মদ সালেহ, আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, তাসকিন পারভেজ শাতিল, আতিকুর রহমান সুমন (ছাত্রত্ব শেষ), দেলোয়ার হোসেন ডিলস, রেজাউল করিম শামীম প্রমুখ। প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক বিপ্লবও।
প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময়ের শিবির নিয়ন্ত্রিত এ ক্যাম্পাসে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়েছে। এই ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রয়োজন। শিবিরের সঙ্গে আপসহীন, ত্যাগী ও যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচন করা হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন। যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতাদের মূল্যায়ন করারও আহ্বান জানান তারা।
জানতে চাইলে মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আমরা এখানে অভিভাবক হিসেবে কাজ করি। নেতৃত্ব বাছাইরের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে সহযোগিতা করা হয়। আর রাজশাহী অঞ্চলে জামায়াত-শিবির সন্ত্রাসী কর্মকা- বেশি চালানোর কারণে স্থানীয়ভাবে সাংগঠনিক দিকের ওপর নজর রাখতেই হয়। সজাগ থাকতে হয়। পূর্বের সময়ে এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তবে এবারের সম্মেলনে ভারসাম্য বজায় রেখেই রাবি ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নির্বাচিত করা হবে। কারণ এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে।’
এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি আবু হুসাইন বিপু বলেন, ‘আমি নিজে গিয়ে প্রার্থীদের অভাব-অভিযোগ শুনে তাদের থেকে সিভি গ্রহণ করেছি। যোগ্য প্রার্থীকেই রাবি ছাত্রলীগের নেতৃত্বে নিয়ে আসা হবে।’
সর্বশেষ ২০১৩ সালের ২০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ২৪তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে মিজানুর রহমান রানাকে সভাপতি ও তৌহিদ আল হোসেন তুহিনকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীকে মারধরের ঘটনায় ২০১৪ সালের ২৯ আগস্ট তুহিনকে পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পান খালিদ হাসান বিপ্লব। চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙের  দায়ে সভাপতির পদ থেকে রানাকে বহিষ্কার করে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয় রাশেদুল ইসলাম রাঞ্জুকে। দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে রাবি ছাত্রলীগ। #

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ