রামেক হাসপাতালেও রডের বদলে বাঁশ তদন্ত কমিটি গঠন

আপডেট: নভেম্বর ২, ২০১৬, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

রামেক হাসপাতালে ভবন নির্মাণে রডের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে বাঁশ। বিষয়টি প্রকাশের পর বাঁশ ব্যবহারের স্থানটি প্লাস্টার করে দেয়া হয় ( গোল চিহ্নিত)। ছবিটি গতকাল সকালে তুলেছেন ফটোসাংবাদিক শরিফুল ইসলাম তোতা।
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের নতুন চারতলা একটি ভবনের তিনতলায় লিফটের পাশ থেকে দুটি বাঁশের বাতা বেরিয়ে এসেছে। বাতার ওপর থেকে টাইলস উঠে গেলে গত সোমবার বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।
এরপর বাঁশের ওই বাতার ওপর তড়িঘড়ি করে পত্রিকা বিছিয়ে প্লাস্টার করে দেয়া হয়। প্লাস্টারের পর জায়গাটি কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। তবে সোমবার সন্ধ্যায় লিফটে রোগি উঠানোর সময় ট্রলির চাকায় প্লাস্টার উঠে গিয়ে আবারো বাঁশের বাতা বেরিয়ে আসে। এ সময় বিষয়টি নিয়ে হাসপাতালে তোলপাড় শুরু হয়। এ ঘটনায় রোগি ও স্বজনদের মধ্যেও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
এদিকে দুটি বাঁশের বাতা বেরিয়ে আসার ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুরো ভবনে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার হয়েছে কী না তা তদন্ত করবে এই কমিটি। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার এএফএম রফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করার জন্য গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে তদন্ত কমিটি করে দেয়া হয়েছে। এতে রামেক হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের প্রধান ডা. মোসাদ্দেক হোসেনকে প্রধান করা হয়েছে। ওই কমিটিতে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী লতিফুল ইসলাম ও তাদের একজন ভবন বিশেষজ্ঞকে রাখা হয়েছে। তাদের তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০০৮ সালে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করেছে গণপূর্ত অধিদফতর। ২০১২ সালের ১৭ জুলাই তৎকালীন স্বাস্থমন্ত্রী ডা. আ.ফ.ম রুহুল হক ভবনটির উদ্বোধন করেন। এরই মধ্যে ভবনটির বিভিন্ন স্থানের প্লাস্টার খসে খসে পড়েছে। সোমবার লিফটের পাশ থেকে বেরিয়ে এলো বাঁশের বাতা।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বেরিয়ে পড়া বাঁশের বাতাগুলো সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এখন তিনতলার লিফট ও মূল ভবনের মেঝের মধ্যে প্রায় পাঁচ ইঞ্চি জায়গা ফাঁকা অবস্থায় রয়েছে। লিফটের দরজায় দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে চোখ রেখে দেখা যায়, সেখানেও বাঁশের বাতার ব্যবহার করা হয়েছে। তবে পুরো ভবনেই রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে কী না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হলে গতকাল সকালে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার  জেনারেল এএফএম রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী লতিফুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহিদ হাসান, মাসুম আল হাসান, আবু হেলাল আনসারী ও নাফিজ মাহমুদ ভবনটি পরিদর্শন করেন।
এ সময় নির্বাহী প্রকৌশলী লতিফুল ইসলাম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মার্ক বিল্ডার্সের পক্ষেই কথা বলেন। বলেন, ‘এটি বড় ধরনের কোনো সমস্যা নয়। মূল ভবনের সঙ্গে লিফট স্থাপনের সময় কিছুটা স্থান ফাঁকা থেকেছে। এই স্থানটিতে প্লাস্টার করে টাইলস বসানোর জন্য বাঁশের বাতা ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হবে না। পুরো ভবনে রডের পরিবর্তে বাঁশের বাতা ব্যবহার করা হয়েছে-বিষয়টি এমনও নয়।’
রডের পরিবর্তে বাঁশের বাতা ব্যবহারের যৌক্তিকতা কতটুকু-জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী কোনো মন্তব্য করেননি। তবে সেখানে বাঁশের বাতার পরিবর্তে লোহার অ্যাংগেল বা টিনের প্লেট ব্যবহার করা যেত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, লিফটের যতটুকু অংশে বাঁশের বাতা ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে প্রতিটি লিফট স্থাপনে ঠিকাদারের সর্বোচ্চ দেড় হাজার টাকা সাশ্রয় হয়েছে। এতো কম পরিমাণ টাকা বাঁচাতেই যদি বাঁশের বাতা ব্যবহার করা হয়, তবে পুরো ভবন নির্মাণে ঠিক কতো জায়গায় বাঁশের বাতা ব্যবহার করা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
‘রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি ফেসবুক পেজে বিষয়টি তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ ও তদন্তের দাবি জানিয়ে পেজটিতে লেখা হয়- ‘রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবনির্মিত ভবনের তৃতীয় তলায় লিফটের সামনে ভাঙা অংশে দেখা যায়, সেখানে লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। ওই ভবনে অবস্থানরত কয়েকশ রোগির প্রাণহানি ঘটতে পারে। যারা এ কাজ করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোর আবেদন জানাচ্ছি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএফএম রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখানে যোগ দেয়ার আগে ভবনটি নির্মিত হয়েছে। সকালে আমরা সবাই জায়গাটি পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তদন্ত করে দেখা হবে, ভবনটি অনিরাপদ কী না। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হবে কী না।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মার্ক বিল্ডার্সের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। রাজশাহী গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী লতিফুল ইসলামও প্রতিষ্ঠানটির কারও মুঠোফোন নম্বর ধরছেন না।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ