রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে রাজশাহীর অবদান

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২০, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

[তসিকুল ইসলাম সম্পাদিত ১৯৯০ সালে প্রকাশিত ‘রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন স্মারকপত্র’ থেকে-]
বিচারপতি মোহাম্মদ আনসার আলী


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
এরপর রাজশাহীতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয। এতে মরহুম মাদার বখশ (অ্যাডভোকেট ও এমএলএ), ক্যাপ্টেন শামছুল হক (মরহুম), জনাব মজিবুর রহমান অ্যাডভোকেট (প্রাক্তন চেয়ারম্যান, রাজশাহী পৌরসভা), জনাব হবিবর রহমান (ঢাকায় চাকরিরত), জনাব নূরুল ইসলাম (লাল মিয়া, ব্যবসায়ী) বামপন্থী জননেতা জনাব আতাউর রহমান (মরহুম), জনাব গোলাম আরিফ টিপু (অ্যাডভোকেট) ডা. মেসবাহুল হক বাচ্চু, জনাব সাঈদ উদ্দিন আহম্মদ (ব্যবসায়ী), জনাব মহসীন প্রামাণিক (অ্যাডভোকেট), জনাব ইয়াসীন আলী (মরহুম), জনাব আব্দুল গাফফার (ডাক্তার), বাবু প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী প্রাক্তন মন্ত্রী, বেঁচে নেই, আমি ও আরো অনেকে জড়িত ছিলাম। এতদিন পর সবার নাম আমার স্মরণে নেই- এজন্যে আমি দুঃখিত। নওগাঁ এসে আমি স্থানীয় ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও রাজনীতিকবৃন্দের সঙ্গে দেখা করি এবং নওগাঁ মাদ্রাসা ময়দানে এক ছাত্র জনসভার আয়োজন করা হয়। আমার যতটুকু মনে পড়ে বগুড়া আজিজুল হক কলেজের প্রাক্তন ছাত্রনেতা জনাব আবুল খায়ের (বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে প্রভাবশালী পাট ব্যবসায়ী) উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন। আমিই সভার প্রধান বক্তা ছিলাম। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে প্রস্তাব গৃহীত হয়। এছাড়া ২৯শে ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক ধর্মঘট ও প্রতিবাদ দিবস সফল করার আহ্বান জানানো হয়। এখানে আমার একটা মজার ব্যাপার হয়েছিল। সভা শেষে হঠাৎ করে মাঠে আমার আব্বার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। তিনিও সভাতে উপস্থিত ছিলেন, আমি জানতাম না। দেখা হওয়ায় আমাকে বললেন, ‘কাজটা ভাল, তবে সাধারণ ঘরের ছেলে, একটু সাবধানে চলবে। যাহোক, আমি তারপর আবার রাজশাহী ফিরে যাই। যেয়ে শুনি যে নাটোরে ভাল কাজ হচ্ছে না। ফলে আমাকে আবার রাজশাহী ছেড়ে নাটোর -নওগাঁর পথে বের হতে হয়। নাটোরে এসে একটা ছাত্র কর্মী সমাবেশ করি। তাঁদের আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে পুনরায় সভা করার জন্য নওগাঁর পথে রওয়ানা হই। ইতোমধ্যে সান্তাহারে এসেই খবর পেলাম ক’জন নেতা ও কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমার নামে গ্রেপ্তারি পরওয়ানা দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশে আমাকে আত্মগোপন করে আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। আমি সে মোতাবেক নওগাঁর মফস্বলে চলে আসি এবং আন্দোলনের কাজ করতে থাকি। ২১শে ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশে প্রতিবাদ দিবস ও ধর্মঘট পালিত হয়। কিন্তু ওই তারিখে ধিকৃত মুসলিম লীগ সরকারের নির্মম বুলেটে ঢাকায় প্রাণ দেয় মৃত্যুঞ্জয়ী শহিদান-সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউর ও জানা-অজানা আরো অনেকে। এর ফলে সারাদেশে দাউ দাউ করে আন্দোলন জ্বলে উঠে। ২২ ও ২৩ শে ফেব্রুয়ারি পালিত হয় হরতাল। অনুষ্ঠিত হয় গায়েবি জানাজা ও প্রতিবাদ সভা আর মিছিল। জানাজায় যোগদান করেন তৎকালীন অ্যাডভোকেট জেনারেল মরহুম শেরে বাংলা ফজলুল হক। কিন্তু জালেমশাহী চুপ থাকার কথা নয়। তারা কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দসহ সারা প্রদেশের বহু নেতা ও কর্মীকে কারাগারে নিক্ষেপ করে ও অত্যাচার চালায়। কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের যাঁরা বাইরে ছিলেন, তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে, ৫ই মার্চ শহিদ দিবস পালন করা হবে। ইতোমধ্যে সারা প্রদেশে স্কুল-কলেজ এমনকি কোথাও কোথাও ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্রে ধর্মঘট অব্যাহত থাকে। কিন্তু আকস্মিকভাবে সংগ্রাম পরিষদের ক’জন নেতৃবৃন্দ ৬ই মার্চ প্রদেশব্যাপি ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এরপর স্কুল কলেজ, হাট-বাজার সবই খুলে যায়। আমরাও আবার কলেজে ফিরে যাই। ইতোমধ্যে নেতৃবৃন্দ অনেকে জেল থেকে ছাড়া পান। কিছুদিন পর ২৭শে এপ্রিল ভবিষ্যৎ কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য ঢাকায় একটি প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা সম্মেলন আহুত হয়। এতে জনাব আতাউর রহমান খান (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটির আহ্বায়ক মনোনীত হন। একইভাবে ১লা জুলাই জনাব মাদার বখশ (মরহুম) গং এর আহ্বানে রাজশাহীতে জেলা রাষ্ট্রভাষা মম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি গৃহীত হয়। আন্দোলন ধীর পদক্ষেপে চলতে থাকে। এ সম্মেলন সংক্রান্ত একটি ছাপান পোস্ট কার্ড আমার কাছে এখনও রয়েছে।
(চলবে)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ