রায়ে অসন্তুষ্ট সিফাতের পরিবার, সহপাঠীরা

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৭, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

রাবি প্রতিবেদক


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ওয়াহিদা সিফাত হত্যা মামলার রায়ে অসন্তোষ ও হতাশা প্রকাশ করেছে পরিবার ও বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলেও পরিবারে পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সিফাতের চাচা ও মামলার বাদি মিজানুর রহমান বলেন, ‘ময়নাতদন্তে সিফাতকে হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করা সত্ত্বেও আদালত এটিকে আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলা হিসেবে গণ্য করে রায় দিয়েছে। এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই।’
মিজানুর রহমান আরো বলেন, ‘যদি আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলা হিসেবেও ধরা হয়, তাতেও আসামিপক্ষ আত্মহত্যার পক্ষে কোনও যুক্তি দেখাতে পারেনি, সেক্ষেত্রে সিফাতের শ্বশুর-শাশুড়ি কীভাবে খালাস পায়?’ এ রায়ের বিরুদ্ধে শিগগিরই উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে বলেও জানান তিনি।
সিফাতের মা ফারজানা বানু মুঠোফোনে বলেন, ‘আসামিরা ছিলেন সবাই প্রভাবশালী। আমরা তাদের কাছে হেরে গেছি। এ রায়ে আমরা হতাশ। আমরা অবশ্যই উচ্চ আদালতে আপিল করবো।’
গতকাল সোমবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩ এর বিচারক সাঈদ আহম্মেদ দেশব্যাপি আলোচিত এ মামলাটির রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সিফতের স্বামী মো. আসিফ পিসলিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। মামলার অন্য তিন আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
সিফাতের মা বলেন, ‘আমার মেয়েকে হত্যার সব আলামত আছে। শরীরের জখম ছিল। ওরা আমার মেয়ের হাতটিও ভেঙে দিয়েছিল। প্রথম ময়নাতদন্তে সেগুলো প্রকাশ করা হয়নি। দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করে পরে সেগুলো প্রকাশ হয়েছে। আসামিরা বরাবরই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল। সব প্রমাণাদি আছে, নথি আছে। এরপরেও এমন রায়ে আমরা হতাশ।’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মাহবুব আলম বলেন, যেহেতু ময়নাতদন্ত রিপোর্টে এটি হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত, সেদিক থেকে আমাদের প্রত্যাশা ছিলো, দোষিরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে। কিন্তু হত্যাকারীকে যে সাজা দেয়া হয়েছে, তাতে আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে বলেন, ‘আমরা ময়নাতদন্ত রিপোর্টে দেখেছিলাম, তাকে (সিফাত) হত্যা করার বিষয়টি উঠে এসেছিল। কিন্তু রায়ে এর সঠিক বাস্তবায়ন হয়েছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি না। যেটুকু শুনেছি, তাতে সন্তুষ্ট হবার কোনও কারণ নেই। এছাড়া এই রায়ে একজন ময়নাতদন্ত চিকিৎসক পক্ষপাত করেও খালাস পেলেন, যা আমাদের বিচলিত করছে।’
সিফাতের সহপাঠী মেহেরুল সুজন বলেন, ‘আদালতের প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। তবে এই রায়ে আমরা পুরোপুরি সন্তোষ প্রকাশ করতে পারছি না। কারণ, যেখানে কয়েক দফা ময়নাতদন্তের পর মেডিক্যাল বোর্ডগুলো সিফাতকে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রতিবেদন দিয়েছিলো, সেখানে আমরা এমন রায়ে হতাশ।’
গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্টপক্ষ এবং আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য আজ দিন ধার্য করেন আদালত। মামলায় আসামি ছিলেন- সিফাতের স্বামী মো. আসিফ প্রিসলি, শ্বশুর মোহাম্মদ হোসেন রমজান, শাশুড়ি নাজমুন নাহার নাজলী ও সিফাতের মৃতদেহের প্রথম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জোবাইদুর রহমান।
প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ডা. জোবাইদুর রহমান বলেন, ‘সিফাত আত্মহত্যা করেছেন।’ কোনও প্রকার ভিসেরা রিপোর্ট ছাড়াই তিনি ওই প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে ২০১৫ সালের ২১ জুন কবর থেকে সিফাতের লাশ তুলে পুনরায় ময়নাতদন্ত করা হয়। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তিনজন চিকিৎসক পুনরায় ময়নাতদন্ত করে জানান সিফাতকে হত্যা করা হয়েছে।
এরপর গত বছর ২২ মার্চ নওগাঁ জেলা সিআইডি সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আহমেদ আলী আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। গত বছরের ১০ নভেম্বর আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় রাজশাহী মহানগরীর মহিষবাথান এলাকায় মোহাম্মদ হোসেন রমজানের বাড়িতে রহস্যজনক মৃত্যু হয় গৃহবধূ ওয়াহিদা সিফাতের। তার শরীরের বিভিন্নস্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিলো। ওই ঘটনায় ২০১৫ সালের ২ এপ্রিল মহানগরীর রাজপাড়া থানায় মামলা দায়ের করেন সিফাতের চাচা মিজানুর রহমান খন্দকার।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ