রিজভী ভাই স্মরণে

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

আকবারুল হাসান মিল্লাত:


দৈনিক সোনার দেশ। নির্বাহী সম্পদকের চেম্বার। আমি যেখানে বসে কাজ করি।
কাচের পার্টিশনে রাজশাহীর পাঁচ ভাষা সৈনিকের ছবি সাঁটানো আছে। সোনার দেশ পত্রিকার নবযাত্রার প্রথম সংখ্যা অর্থাৎ ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশ হয়েছিল । ওই সংখ্যায় আট কলামের রঙিন ছবি। প্রায় অর্ধেক পাতা ব্যাপিয়া। ইতোমধ্যেই ১০ বছর পেরিয়ে গেছে। ছবিটি এখনো ওই ভাবেই সাঁটানো আছে। আমার চেম্বারে ১০ বছরে যারাই গেছেন, ছবিটি প্রায় সকলেরই নজর কেড়েছে।
ছবির পাঁচ ভাষা সৈনিকের দুজন আর বেঁচে নেই অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক ও সাংবাদিক কলামিস্ট সাঈদ উদ্দিন আহমেদ। বেঁচে আছেন বর্তমান যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটার অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু, আবুল হোসেন ও মোশারফ হোসেন আখুঞ্জি। পাঁচ ভাষাসৈনিকের এক ফ্রেমের ছবি থেকে বামের দুজন ইতোমধ্যেই মারা গেছেন।
ওই ছবি বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর হামীম রিজভী বীরপ্রতিক এর নজর কাড়ে। ভীষণভাবে প্রভাবিত হন। তিনি ভাললাগার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন নি। ওই ছবি দেখে নতুন একটি ছবির প্লটও তিনি তৈরি করে বসেন। আর তা বাস্তবায়নের জন্য আমার প্রতি তাঁর বিন¤্র অনুরোধ ছিল, বারবার। রিজভী ভাইয়ের প্রত্যাশিত ছবিটির উদ্ভাবনী ছিল পাঁচ ভাষা সৈনিকের মতই মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর উত্তম বা বীর প্রতীকদের নিয়ে এ রকম একটি ছবি তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। আর এজন্য রিজভী ভাইয়ের কাছে আমিই ছিলাম উপযুক্ত ব্যক্তি যদিও আমি ফটোগ্রাফি জানিনা। দৈনিক পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে ও রকম একটি ছবি তোলার ব্যবস্থায় আমার উদ্যোগের প্রতি রিজভী ভাইয়ের অগাধ বিশ্বাস ছিল। কিন্তু কাজটা অত সহজ ছিল না। ৫-৬ জন ওই মাপের বীরমুক্তিযোদ্ধা একসঙ্গে পাওয়াটা সময় ও সুযোগের ব্যাপার ছিল।
রিজভী ভাইয়ের গুনের কথা রাজশাহীর সংস্কৃতি অঙ্গনের সকলেরই জানা। অত্যন্ত সজ্জন মানুষ হিসেবেই তিনি সকলের কাছে ‘প্রিয় রিজভী ভাই’ হিসেবেই পরিচিত। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত বিদ্রোহী কবিতার অংশ ‘এক হাতে মম বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতুর্য’। এ উক্তি রিজভী ভাইয়ের জন্য অত্যন্ত মানানসই। দেশ মাতৃকার জন্য তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। দেশকে স্বাধীন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে বীর প্রতীক উপাধি দিয়েছে। স্বাধীনতার পর তিনি জীবন-জীবিকার জন্য সঙ্গীতকেই বেছে নিলেন। তারপর থেকে আমৃত্যু তিনি সুরের মধ্যেই মগ্ন থেকেছেন। গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন, গান গেয়েছেন অন্যকে গান শিখিয়েছেন। তিনি বেতারের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন।
রিজভী ভাই যখনই আমার অফিসে আসতেন তখনই ওই উদ্যোগের কথা মনে করিয়ে দিতেন। কিন্তু এক সাথে রাজশাহীর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের একত্রিত করাটা মোটেও সহজসাধ্য কাজ ছিল না। ছবির ফ্রেমে কোন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আনতে হবে রিজভী ভাই সেটাও বলেছিলেন। তিনি নিজে তো আছেনই। সেই সাথে বদিউজ্জামান টুনু বীর প্রতীক, ড. শামসুল হক বীর প্রতীক ও সাঈদ খান বীর প্রতীক।

এই চারজনকে এক সাথে কোনো অনুষ্ঠানেই পাওয়া যায় নি। একটা সুযোগ এসেছিল ২০১২ সালে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা দেয়া হয়েছিল। দিনটি ছিল বিজয় দিবসের আগের দিন অর্থাৎ ১৫ ডিসেম্বর। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ে রাজশাহী জেলা প্রশাষনের যৌথ উদ্যোগে ওইদিন প্রায় তিনশো বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। ওই সংবর্ধনা সভায় প্রথান অথিথি ছিলেন তৎকালীন মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামার লিটন। সভাপতিত্ব করেছিলেন ওই সময়ের রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আব্দুল হান্নান। ওই সংবর্ধনার জন্য রাজশাহীর চার বীর প্রতীক যথাক্রমে বদিউজ্জামান টুনু, নূর হামীম রিজভী, অধ্যাপক শামসুল আলম ও সাঈদ খান।সংবর্ধনা স্থল ছিল নগর ভবনের গ্রিনপ্লাজা।
আমি ওইদিন প্রস্তুত ছিলাম রিজভী ভাইয়ের প্রত্যাশিত ছবি এবার নিশ্চিত ফ্রেমবন্দি করা যাবে। সেই মতে আমার অফিসের ফটো সাংবাদিককেও প্রস্তুত করে রেখেছিলাম। মূল অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে রিজভী ভাইকে ফোন দিলাম। বললাম. ‘রিজভী ভাই আপনি অনুষ্ঠানস্থলে গেছেন? নিশ্চয় আজ আপনার কাক্সিক্ষত ছবি তুলবো। আপনি প্রস্তুত হয়ে থাকেন।’
কিন্তু রিজভী ভাই আমাকে হতাশ করলেন। তিনি প্রতিউত্তরে জানালেন, ‘মিল্লাত ভাই আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জে আছি। এখানে আমাকে সম্মাননা দিচ্ছে। এটা আগের কর্মসূচি ছিল, তাই চলে এসেছি।’ কী আর করা! ওই দিন অনেক ছবি তোলা হয়েছিল কিন্তু রিজভি ভাই ছিলেন না, রিজভী ভাইয়ের কাক্সিক্ষত ছবি আর তোলাও হলো না, তোলাও হয়নি কোনোদিন।
আবার অপেক্ষার পালা। রিজভী ভাইয়ের আবদার বহাল থাকলো। অফিসে, রাস্তায় যেখানেই দেখা হয়েছে, অনেক কথার সাথে রিজভী ভাই ছবির কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
একদিন। সম্ভবত ২০১৬ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি কোনো একদিন। বীর প্রতীক বদিউজ্জামান টুনু ভাই ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। বলা যায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেও আসলেন। টুনু ভাইকে উদ্ধৃত করে রিজভী ভাই বললেন, ‘টুনু ভাই তো মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে আসলেন, আমি কিন্তু সে সময়ও পাবো না। ছবিটা দ্রুত তোলার ব্যবস্থা করেন।’
২০১৬ এর একুশে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সরকারি ছুটির দিন। সরকারি ছুটির দিন হলেও অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছি, করণীয় কাজ ছিল। বেলা ১২ টা হবে। হেঁটেই যাচ্ছি। রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মূল ফটকে দাঁড়িয়ে শিল্পীরা একুশের অনুষ্ঠান করছেন। দর্শক- শ্রোতাদের জটলা এড়িয়ে আমি বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। এমন সময় পিছন থেকে ডাক পেলাম ‘মিল্লাত ভাই, মিল্লাত ভাই।’ পিছন ফিরে দেখলাম হাস্যোজ্জ্বল রিজভী ভাই। সালাম দিলাম। তিনি সালাম গ্রহণ করে বললেন, ‘মিল্লাত ভাই ছবিটা কিন্তু তোলা হয় নি। আর হয়ত আমাকে পাবেন না। সেদিন কিন্তু পস্তাবেন।’ আমি হাসিমুখে রিজভী ভাইকে আশ্বস্ত করলাম এবং অফিসে আসলাম।
তখন বেলা দুটো হবে। একলা অফিসে কাজ করছি। এমন সময় ফোনকল এলো। রাজশাহীর অতিপরিচিত মুখ সংস্কৃতি কর্মী মনিরা রহমান মিঠির। তিনি আড়ষ্ট কণ্ঠে বললেন, ‘মিল্লাত ভাই শুনেছেন? রিজভী ভাই মারা গেছেন, এই কিছুক্ষণ আগে।’
মিঠির কণ্ঠের সমস্ত আড়ষ্টতা আমার শরীরের মধ্যে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়লো। বিশ্বাস হয় না। আমি মিঠিকে জিজ্ঞেস করেছি কোন রিজভী ভাই? মিঠি কাঁপাকণ্ঠে বললেন, ‘আমাদের মুক্তিযোদ্ধা রিজভী ভাই।’ ঘণ্টাদুয়েক আগের রিজভী ভাইয়ের কথাগুলো ভীষণভাবে আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুললো।
‘মিল্লাত ভাই ছবিটা কিন্তু তোলা হয় নি। আর হয়ত আমাকে পাবেন না। সেদিন কিন্তু পস্তাবেন।’
এমনও মৃত্যু হয়! বলে কয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়া। তাঁর কণ্ঠটা বারবার আমার কানে ধ্বনি- প্রতিধ্বনি তুলতে থাকলো। ভীষণ অস্থিরতা আমার মধ্যে। ছুটে চললাম রিজভী ভাইয়ে বাড়ির দিকে যেখানে এখন তিনি নিষ্প্রাণ শুয়ে আছেন।