রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতারণা স্বাস্থ্যখাতের ভয়ঙ্কর চিত্রই ফুটে উঠেছে

আপডেট: জুলাই ১০, ২০২০, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

সমাজে যোগ্য মানুষের ধারণাটাই ক্রমশই পাল্টৈ যাচ্ছে। মানুষের সততা, সদিচ্ছা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, কর্মনিষ্ঠাÑএসব কিছুই খুব একটা বিবেচ্য হচ্ছে না। ফলে দুর্নীতিবাজ, দুর্বৃত্তরাই সমাজের শীর্ষে উঠে আসতে পারছে। অর্থ- সম্পদই যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে উঠছে। অর্থ ও সম্পদ থাকলে সবাই তাকেই তোয়াজ করে। তার রাজনীতির পথ খোলা, এমপি-মন্ত্রী হওয়া যায়, টেন্ডারবাজি করা যায়, সরকারের শীর্ষ মহলে সখ্যতাও গড়ে উঠে। সচেতন মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় অস্বস্তি আর কী হতে পারে!
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর সমাজে দুর্বৃত্ত তোষণের, লালন-পালন আর আশ্রয়-প্রশ্রয়ের ধারার উত্থান ঘটে। আজ তা বিশাল মহীরূহে পরিণত হয়েছে। এই মহীরুহের পাদদেশে থেকেই রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদরা জন্ম নিচ্ছে।
র‌্যাব-এর দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ ‘প্রকৃতপক্ষে একজন ধুরন্ধর, অর্থ লিপ্সু এবং পাষণ্ড’। সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী সে একজন শীর্ষ পর্যায়ের জালিয়াত ও প্রতারক। নিকৃষ্ট এই মানুষই বিপুল পরিমাণ অর্থবিত্তের মালিক। তার সাথে শীর্ষ ব্যক্তিদের জানাশোনা-সখ্যতা। সংবাদ মাধ্যমে তথ্য অনযায়ী সাহেদ আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়েছেন। সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, সরকারি আমলাদের সঙ্গে তার ছবি এখন সোশাল মিডিয়ায় ঘুরছে। আবার এর আগে বিএনপির বিভিন্ন নেতার সঙ্গেও তার সখ্যের খবর পাওয়া যায়।
সংবাদ সূূত্রে উল্লেখ, লাইসেন্সের না থাকায় তিন বার অভিযান চালানো হয়েছিল রিজেন্ট হাসপাতালে, করা হয়েছিল জরিমানা। তা জেনেই কোভিড-১৯ রোগিদের চিকিৎসা দিতে বেসরকারি এই হাসপাতালটির সঙ্গে চুক্তি করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ২১ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে রিজেন্ট হাসপাতালের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদসহ ঊর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কীভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চুক্তি হলো- এ প্রশ্নই এখন জনমনে। তথ্যমতে, ২০১৪ সালে এ হাসপাতালের অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়েছিল। কিন্তু নবায়ন না করেই চিকিৎসা দেয়ার অভিযোগে ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে রাজধানীর উত্তরা শাখায় এবং ২০১৮ সালে মিরপুর শাখায় অভিযান চালায় র‌্যাব। তারপরেও কীভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ওই হাসপাতালের সাথে চুক্তি করে। তাও আবার স্পর্শকাতর কোভিড রোগিদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য! রিজেন্ট হাসপাতাল চুক্তিও মানে নি। চুক্তি অনুযায়ী করেনাভাইরাসের চিকিৎসা বিনামূল্যে দেয়ার কথা কিন্তু তারা বর্ধিত মূল্য আদায় করেছে। এবং ভুয়া সনদ বিক্রি করেছে। র‌্যাব কর্তৃক ধরা পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় হচ্ছে। এই ঘটনা শুধু দেশের মানুষের সাথে প্রতারণা নয়Ñ আন্তর্জাতিকভাবেই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
‘স্বাস্থ্যসেবার নামে অপকীর্তি, দুর্নীতি ও মানুষের জীবন নিয়ে অবহেলা এ দেশে নতুন কিছু নয়। দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগেরও শেষ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগ রিজেন্ট হাসপাতালের সাথে চুক্তি নিয়ে যতই ব্যাখ্যা দিক না কেন- তা কোনোভাবেই দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। সরকারি প্রতিষ্ঠানই যদি সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেÑ অন্যদের কাছ থেকে কীভাবেই তা প্রত্যাশা করা যায়। রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যানসহ যারাই প্রতরণার সাথে জড়িত তাদের শাস্তি যেমন প্রত্যাশিত ঠিক তেমনি রিজেন্ট হাসপাতালের সাথে চুক্তির বৈধতা নিয়ে যে প্রশ্ন সামনে এসেছে তারও উত্তর মেলা দরকার। শুধু রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতারণার মধ্য দিয়েই বিষয়টির শেষ হয়ে গেলে চলবে না। ওই চুক্তির সাথে যারা জড়িত আছেন তাদেরকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। তবেই তা জনমনে ন্যায্যতা পাবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ